এই শহরের রাখালের কথা আমরা জানি। যিনি শব্দের
ঝর্নায় স্নান করে হয়েছিলেন অনন্যমনা। কবিতায়- জীবনে চিরবিস্ময় তিনি- শক্তি
চট্টোপাধ্যায়। বসন্ত এলেই তাঁর মৃত্যুদিন মনে পড়ে যায়। তাঁর কবিতা আর তাঁকে নিয়ে
লেখা কবিতা মিলে তৈরি হতে থাকে এক নতুন পাঠ। এই যেমন ‘জয়ের শক্তি’ বইটি। শক্তি
চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা কীভাবে ধরা দেয় জয় গোস্বামীর কাছে, সেই অনুভবের সঙ্গেই এই বই-
এর প্রথম পর্বে রয়েছে শক্তিকে নিয়ে লেখা সাতটি কবিতা। ‘কবি কাহিনি’ কবিতাটি থেকে
উদ্ধৃত করছি--
“ মদে ডোবা লোক, কবি।
মাথা ভাসছে পিপের ওপর।
পিপেটি সমুদ্র যাত্রী—
যাও, ওকে
পরাও টোপর।
......
ফসকে পড়া শব্দ ধরে
মদ থেকে ভেসে ওঠে লোক।
পিপেদ্বীপ। তার ওপর সে বসে কবিতা লিখছে...
হে সমুদ্র, এই দৃশ্য ফ্রিজ করা হোক! ’’
মধ্যরাতে কোলকাতা শাসন করা শক্তি
চট্টোপাধ্যায়কে জয় দেখেননি,
দেখেছেন কেবল শব্দের ভেতর দিয়ে-- ‘কেন না, লিখিত
শব্দই, লেখকের, প্রথম ও শেষ পরিচয়।’
কবিকে নিয়ে গড়ে ওঠা এত কাহিনির বাইরে কবিকে পড়ছেন। সমুদ্র প্রসঙ্গ আবার চলে আসছে
‘দিগন্তের ধারে’ কবিতাতে--
“ আমার মাথায় গাঁথা চতুর্থীর একফালি চাঁদ
তা নিয়ে তখনও আমি এরকমই পাগল-
পাগল করতাম
তাঁর সমুদ্রের অন্য পারে!’’
সকলেই কবি নয়, জানি আমরা। জানি সকলেই সহৃদয়
পাঠক হতে পারেন না। তবে কোনও একজন কবি যখন পড়েন আরেক কবিকে, কিংবা
লিখে ফেলেন কবিতা পাঠকের অনুভবের- এক আশ্চর্য ভালোলাগা তৈরি হয়। আর সাহিত্যে
ভালোলাগা মন্দ লাগা যে শেষ কথা এমনটি বোধহয় একজন কবির পক্ষেই ভাবা সম্ভব! ‘কফির
নামটি আইরিশ’ কাব্যগ্রন্থে শ্রীজাত-র ‘পদ্যসমগ্র’ শীর্ষক চার লাইনের কবিতা আছে-- “বাতাসকে দিই হালকা ধমক রোজ/ আলতো
টোকায় ছাই ঝাড়ি সূর্যের/ আকাশ যখন পদ্যসমগ্র—/ আমরা সবাই শক্তি চাটুজ্যে !”
শক্তি কবিতার বদলে পদ্য বলতেই ভালোবাসতেন। তাঁর ‘পদ্যসমগ্র’ নামটি উঠে এল তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতার শিরোনামে। আমাদের প্রত্যেকেই যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই সম্ভাবনা উসকে দেবার মধ্য দিয়ে প্রাণের প্রসারণ ঘটে গেল বইকি।
‘এবার আমিই/ এই শহরের রাখাল’ শঙ্খ ঘোষের কবিতায় যুবার মুখে এই উচ্চারণ মনে আছে আমাদের। ‘এই শহরের রাখাল’ শীর্ষক গদ্যগ্রন্থে ‘নিজেকে নিয়ে শক্তি’ নামে একটি অসামান্য লেখা আছে শঙ্খ ঘোষের। শক্তির স্বীকারোক্তির সাহস, নিজেকে ‘নিরাবৃতভাবে’ মেলে ধরবার চেষ্টার কথা বলার শঙ্খ লিখছেন-- “সংসারের মধ্যে, প্রকৃতির মধ্যে, তাঁর নিজস্ব ঈশ্বরের মধ্যে নিজেকে খুঁজে বেড়ানোই তবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা। ’’ আত্মজীবনের মধ্যে সামাজিক সময়কে ছুঁতে পাবার এক পথ আবিষ্কার করছেন কবি শঙ্খ ঘোষ শক্তির লেখার মধ্যে। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার কথা আমাদের মনে পড়ছে। সুনীলের ‘কৃত্তিবাস’ কবিতায় পাই ‘শক্তির দুর্দান্তপনা’- র কথা। শক্তির মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ‘ভোরবেলার উপহার’ কাব্যগ্রন্থে পাই ‘শক্তি’ নামের কবিতা। রাত বারোটা কি দেড়টায় কবিতার খাতা খুলতেই সুনীল বাইরে তিনবার নাম ধরে ডাকার আওয়াজ পান। ‘গলা চিনতে ভুল হবার কথা নয়’ ‘… এই তো তার আসবার সময়’, কিন্তু বিভ্রম কেটে যায়। শক্তি যে আর ফিরে আসবেন না এই জানাটুকু অস্তিত্বের মূল ধরে নাড়িয়ে দেয়, কবিতার কাছে ফিরে আসেন সুনীল; লিখে ফেলেন--
“ শক্তিনেই, কবেকার সেই দুজনে মিলে
লেখা লেখার খেলা
হঠাৎ শেষ হয়ে গেল
আমি চুপ করে বসে থাকি, রাত্রি ঝরে পড়ে, যেন উড়ছে
আমাদের লেখাগুলির ছিন্ন পাতা
আমি চুপ করে বসে থাকি, সাদা দেওয়াল, কানে তালা
লাগিয়ে দিচ্ছে স্তব্ধতার
বাজনা
খাকি প্যান্ট ও কালো জামা, সাদা চুল, মুঠোয় সিগারেট ধরা
শক্তি একটু একটু দুলছে… ’’
এই দোলার সামনে আমাদের চুপ করে থাকা ছাড়া
কোনও উপায় নেই। বাংলা
সাহিত্যে অভিন্নহৃদয় কবি-বন্ধু বলতে এই দুজনের নাম যে উচ্চারিত হয়
একসঙ্গে। মধ্যরাতের
নিঃসঙ্গতা ফিরিয়ে দিচ্ছে অতীতের মায়াবি উষ্ণতাকে। ঘোর ভেঙে গেলে শোক থেকে
জন্ম নিচ্ছে শ্লোক- কবির ‘শক্তি’! ‘শক্তির সঙ্গে একটি দিন’, ‘টিলার ওপর থেকে শক্তিকে
ডানা মেলে উড়তে দেখেছি’, ‘শক্তির কবিতা’, ‘খেলাচ্ছলে দিনগুলি’ – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই
গদ্যগুলি পাওয়া যাবে ‘আমার জীবনানন্দ আবিষ্কার ও অন্যান্য’ বই-এ। পাঠক এই লেখাগুলি থেকে পেতে পারেন এক অফুরান
প্রাণের শক্তিকে।
পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা’ কবিতায় সমবেত যাপনের সূত্রে এসেছে শক্তির কথা- ‘হিমালয় থেকে গড়াতে গড়াতে/ প্রকান্ড বোল্ডারের মতো জেগে উঠল শক্তি।’ এই কবিতাগুলি পড়া মানে এক অভিজ্ঞতা। তারাপদ রায়ের ‘আই শক্তি চ্যাটার্জী’ কবিতার শেষ স্তবক উদ্ধৃত করছি--
জোর বাতাস আসছে শালবনের দিক থেকে,
মোমবাতিটা দপদপ করছে।
বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে, রাত বাড়ছে।
আপনি দেখলেন?
আপনি ওদিকে কোথাও দেখলেন?
কেউ বলছে,
‘শক্তি, আমি শক্তি, আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়
আই শক্তি চ্যাটার্জী
স্পিকিং।’
আমরা আমাদের আলোচনায় কবিদের চোখে কবি শক্তিকে
প্রত্যক্ষ করলাম। এই লেখা ও দেখা চলছেই। কবির জন্মের শেষ নেই। ‘খোলা বুকে
স্বেচ্ছাচারী ভাষা’ গদ্যে পিনাকী ঠাকুর শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে বলতে গিয়ে খুব
সঙ্গতভাবেই তাই বলেন-- “যিশুর মতো কবিরও হয় রেজারেকশন। নতুন যুগে
কবি- পাঠকের চেতনায় জাগ্রত হয়ে ওঠেন কবি। বারবার।”