Saturday, 25 March 2017

এই শহরের রাখাল : কবির চোখে কবি


এই শহরের রাখালের কথা আমরা জানি। যিনি শব্দের ঝর্নায় স্নান করে হয়েছিলেন অনন্যমনা। কবিতায়- জীবনে চিরবিস্ময় তিনি- শক্তি চট্টোপাধ্যায়। বসন্ত এলেই তাঁর মৃত্যুদিন মনে পড়ে যায়। তাঁর কবিতা আর তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতা মিলে তৈরি হতে থাকে এক নতুন পাঠ। এই যেমন ‘জয়ের শক্তি’ বইটি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা কীভাবে ধরা দেয় জয় গোস্বামীর কাছে, সেই অনুভবের সঙ্গেই এই বই- এর প্রথম পর্বে রয়েছে শক্তিকে নিয়ে লেখা সাতটি কবিতা। ‘কবি কাহিনি’ কবিতাটি থেকে উদ্ধৃত করছি--

“ মদে ডোবা লোক, কবি।

           মাথা ভাসছে পিপের ওপর।

 পিপেটি সমুদ্র যাত্রী—

            যাও, ওকে পরাও টোপর।

                     ......

ফসকে পড়া শব্দ ধরে

       মদ থেকে ভেসে ওঠে লোক।

পিপেদ্বীপ। তার ওপর সে বসে কবিতা লিখছে...

        হে সমুদ্র, এই দৃশ্য ফ্রিজ করা হোক! ’’

মধ্যরাতে কোলকাতা শাসন করা শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে জয় দেখেননি, দেখেছেন কেবল শব্দের ভেতর দিয়ে-- ‘কেন না, লিখিত শব্দই, লেখকের, প্রথম ও শেষ পরিচয়।’ কবিকে নিয়ে গড়ে ওঠা এত কাহিনির বাইরে কবিকে পড়ছেন। সমুদ্র প্রসঙ্গ আবার চলে আসছে ‘দিগন্তের ধারে’ কবিতাতে--

“ আমার মাথায় গাঁথা চতুর্থীর একফালি চাঁদ

  তা নিয়ে তখনও আমি এরকমই পাগল- পাগল করতাম

  তাঁর সমুদ্রের অন্য পারে!’’

সকলেই কবি নয়, জানি আমরা। জানি সকলেই সহৃদয় পাঠক হতে পারেন না। তবে কোনও একজন কবি যখন পড়েন আরেক কবিকে, কিংবা লিখে ফেলেন কবিতা পাঠকের অনুভবের- এক আশ্চর্য ভালোলাগা তৈরি হয়। আর সাহিত্যে ভালোলাগা মন্দ লাগা যে শেষ কথা এমনটি বোধহয় একজন কবির পক্ষেই ভাবা সম্ভব! ‘কফির নামটি আইরিশ’ কাব্যগ্রন্থে শ্রীজাত- পদ্যসমগ্র শীর্ষক চার লাইনের কবিতা আছে-- “বাতাসকে দিই হালকা ধমক রোজ/ আলতো টোকায় ছাই ঝাড়ি সূর্যের/ আকাশ যখন পদ্যসমগ্র—/ আমরা সবাই শক্তি চাটুজ্যে !”

শক্তি কবিতার বদলে পদ্য বলতেই ভালোবাসতেন তাঁর পদ্যসমগ্র নামটি উঠে এল তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতার শিরোনামে আমাদের প্রত্যেকেই যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই সম্ভাবনা উসকে দেবার মধ্য দিয়ে প্রাণের প্রসারণ ঘটে গেল বইকি

এবার আমিই/ এই শহরের রাখালশঙ্খ ঘোষের কবিতায় যুবার মুখে এই উচ্চারণ মনে আছে আমাদের এই শহরের রাখাল শীর্ষক গদ্যগ্রন্থে  নিজেকে নিয়ে শক্তি নামে একটি অসামান্য লেখা আছে শঙ্খ ঘোষের শক্তির স্বীকারোক্তির সাহস, নিজেকে নিরাবৃতভাবে মেলে ধরবার চেষ্টার কথা বলার শঙ্খ লিখছেন-- “সংসারের মধ্যে, প্রকৃতির মধ্যে, তাঁর নিজস্ব ঈশ্বরের মধ্যে নিজেকে খুঁজে বেড়ানোই তবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা ’’ আত্মজীবনের মধ্যে সামাজিক সময়কে ছুঁতে পাবার এক পথ আবিষ্কার করছেন কবি শঙ্খ ঘোষ শক্তির লেখার মধ্যে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার কথা আমাদের মনে পড়ছে সুনীলের কৃত্তিবাস কবিতায় পাই শক্তির দুর্দান্তপনা’- র কথা শক্তির মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ভোরবেলার উপহার কাব্যগ্রন্থে পাই শক্তি নামের কবিতা রাত বারোটা কি দেড়টায় কবিতার খাতা খুলতেই সুনীল বাইরে তিনবার নাম ধরে ডাকার আওয়াজ পান গলা চিনতে ভুল হবার কথা নয়’ ‘… এই তো তার আসবার সময়’, কিন্তু বিভ্রম কেটে যায় শক্তি যে আর ফিরে আসবেন না এই জানাটুকু অস্তিত্বের মূল ধরে নাড়িয়ে দেয়, কবিতার কাছে ফিরে আসেন সুনীল; লিখে ফেলেন--

  শক্তিনেই, কবেকার সেই দুজনে মিলে লেখা লেখার খেলা

                হঠাৎ শেষ হয়ে গেল

   আমি চুপ করে বসে থাকি, রাত্রি ঝরে পড়ে, যেন উড়ছে

             আমাদের লেখাগুলির ছিন্ন পাতা

   আমি চুপ করে বসে থাকি, সাদা দেওয়াল, কানে তালা

              লাগিয়ে দিচ্ছে স্তব্ধতার বাজনা

   খাকি প্যান্ট ও কালো জামা, সাদা চুল, মুঠোয় সিগারেট ধরা

              শক্তি একটু একটু দুলছে… ’’

এই দোলার সামনে আমাদের চুপ করে থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই বাংলা সাহিত্যে অভিন্নহৃদয় কবি-বন্ধু বলতে এই দুজনের নাম যে উচ্চারিত হয় একসঙ্গে মধ্যরাতের নিঃসঙ্গতা ফিরিয়ে দিচ্ছে অতীতের মায়াবি উষ্ণতাকে ঘোর ভেঙে গেলে শোক থেকে জন্ম নিচ্ছে শ্লোক- কবির শক্তি’! ‘শক্তির সঙ্গে একটি দিন’, ‘টিলার ওপর থেকে শক্তিকে ডানা মেলে উড়তে দেখেছি’, ‘শক্তির কবিতা’, ‘খেলাচ্ছলে দিনগুলি’ – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই গদ্যগুলি পাওয়া যাবে আমার জীবনানন্দ আবিষ্কার ও অন্যান্য বই- পাঠক এই লেখাগুলি থেকে পেতে পারেন এক অফুরান প্রাণের শক্তিকে

পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা’ কবিতায় সমবেত যাপনের সূত্রে এসেছে শক্তির কথা- ‘হিমালয় থেকে গড়াতে গড়াতে/ প্রকান্ড বোল্ডারের মতো জেগে উঠল শক্তি।’ এই কবিতাগুলি পড়া মানে এক অভিজ্ঞতা। তারাপদ রায়ের ‘আই শক্তি চ্যাটার্জী’ কবিতার শেষ স্তবক উদ্ধৃত করছি--

জোর বাতাস আসছে শালবনের দিক থেকে,

মোমবাতিটা দপদপ করছে।

বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে, রাত বাড়ছে।

আপনি দেখলেন?

আপনি ওদিকে কোথাও দেখলেন?

কেউ বলছে,

          শক্তি, আমি শক্তি, আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়

            আই শক্তি চ্যাটার্জী স্পিকিং।’

আমরা আমাদের আলোচনায় কবিদের চোখে কবি শক্তিকে প্রত্যক্ষ করলাম। এই লেখা ও দেখা চলছেই। কবির জন্মের শেষ নেই। ‘খোলা বুকে স্বেচ্ছাচারী ভাষা’ গদ্যে পিনাকী ঠাকুর শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে বলতে গিয়ে খুব সঙ্গতভাবেই তাই  বলেন-- “যিশুর মতো কবিরও হয় রেজারেকশন। নতুন যুগে কবি- পাঠকের চেতনায় জাগ্রত হয়ে ওঠেন কবি। বারবার।”

Friday, 3 February 2017

টেলিফোন

বুথ বলতে ভোট, আর টেলিফোন। আমাদের ল্যান্ডলাইন ছিল না। তুষার কাকুদের ছিল। তারাই আমাদের ডেকে দিত। ছুট ছুট। ডিমের কুসুম পাতে। হলদে হাতে কলতলা পেরিয়ে, আমবাগানের মুকুল গন্ধে সেই বাড়ি। রিসিভার ধরে থাকলে সেই ডাক আর দশ মিনিট পরে করবে সেই ডাক আলাদা করতে পারতাম। ফোন রিসিভ করা যায় কিন্তু....ফোন করতে বাধোবাধো ঠেকতো। চলার পথে এগরোলের মতোই গজিয়ে উঠলো মুস্কিল আসান টেলিফোন বুথ। ঘরের মধ্যে ঘর বলতে মশারি আর এই বুথ। রাত ন টার পর লম্বা লাইন। একজন তিনটের বেশি ফোন করতে পারবেন না একবারে এই সময়ে। বেশি লাইন হলে সময় বরাদ্দ হতো। কাচের বাক্সে মানুষটি। মিটার উঠছে। আমাদের শহরে ট্যাক্সি ছিল না। মিটার বলতে ইলেকট্রিকের আর ফোনের। আমাদের এস টি ডি, আই এস ডি- র পুরোটা মুখস্থ ছিল। প্রশ্নমঞ্চের প্রশ্ন থাকতো যে!
আমার এক বন্ধুর কথা মনে আছে, যার জন্য মালিক আলাদা একটা চেম্বারের ব্যবস্থা করেছিল। সারা দুপুর ওরা কথা বলতো। মোবাইল আসার আগেই মিসকল শুরু হয়ে গেছে। আমাদের কেউ কেউ কি বুথে ফোন রিসিভ করিনি? বুথমালিকের বিরক্তি গোফের ফাকে হাসি হয়ে গলে যায়নি কখনও?
সেই বুথটি এখন উঠে গেছে। খটাং খটাং ইন্ডিকমকেও টাটা দেখিয়েছি আমরা। বুকের মাঝে মোবাইল ফোন অনেক অপেক্ষা আর বিস্ময়কে বালিশের নিচে চাপা দিয়েছে। কাচের বাক্সগুলোয় ধুলোর পাহাড়। মাঝের লাল দাগটি অনেক রক্তক্ষরণের সাক্ষী।
ধুলোর বুকে নামের যোগচিহ্নে সেই বন্ধু আর বন্ধুনী এখন কেমন আছে কে জানে!

মনভোলা...

আমরা যাকে বলে কাঠবাঙাল। পুরো বাইশ ক্যারেট। মা সিলেট, বাবা রংপুর। রংপুরের রান্না নিয়ে অন্যদিন বলবো। আজ বরং গন্ধ বিধুর সমীরণে শুটকি মাছের কথা বলি।
অসহিষ্ণুতা নিয়ে যদি কথা ওঠে, এই মাছ বাদ যাবে কেন? পক্ষ আর বিপক্ষ বাদ দিয়ে এই বিষয়ে তৃতীয় পক্ষ খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল। এক দল শুটকির নাম শুনলেই একরাশ বিরক্তিতে মুখ ভেটকায়, অন্যদল ঠিক ততটাই আনন্দে পরবর্তী কর্মপন্থা স্থির করে।
মাসতুতো দাদার বিয়ে মিটলে বাড়ির একজন বললেন অনেকদিন মাছ মাংস খেয়ে অরুচি হয়েছে। দুপুর বেলা সেদিন চালকুমড়ো পাতায় মুড়ে শুটকি মাছ হলো। জিভ ফিরে এল স্বমহিমায়।
তেজপুরে মামাবাড়িতে খেয়েছিলাম সিদল শুটকি। বহু সাধনা করে তবে সে জিনিস জোটে। যে জানে সে জানে।
সন্তোষপুরের মেসে মালিক শুটকি রান্না করতে বারণ করতেন। আমরা ওভেনের পাশে একটা মোম জ্বেলে রাখতাম। সেভাবে গন্ধ উপস্থিতি জানান দিতো না।
সাদা ভাত, মুসুর ডাল আর পাতের কোণে লোটে মাছের চাটনি। হলদে বালবের আলো মেখে মাটিতে বাবু হয়ে বসে একদল মেসশাবক খেয়ে চলেছে একমনে.... প্রতি রবিবারে মাংস না খাওয়ার দু:খ তাদের ছিল না। কেবল তারা ভাবতো এরপর দিন আলু কম দিয়ে মাছ টা বেশি দিতে হবে।

স্মৃতি যেন জোনাকি

হাগু আর হিসু কবে থেকে টয়লেট হলো, সে এক গবেষণার বিষয়। ছোটবেলায় আমাদের কিছু পেলে আঙুল দেখিয়েই বোঝাতাম। আর এই অছিলায় ক্লাস ফাঁকি দেয়নি, এমন কেউ হয়তো নেই। স্কুল থেকে বহুমূত্র আমাদের সঙ্গী হয়ে গেলো।
প্যান্টে হাগু হয়ে গেছে, সারা করিডর জুড়ে মাছি ভ্যানভ্যানাচ্ছে, এমন সত্যি দেখাকে গল্পে আনবো না। বরং মনে করিয়ে দি, আমাদের শোবার ঘরের মিনিমাম একশো মিটার দূরে বড় বাথরুমের কথা। যেখানে যাওয়াটা ছিল অভিযান বিশেষ। বর্ষাকালে পেট মোচড় দিয়েছে, এদিকে কারেন্ট নেই, কলাগাছের পাতা এমনভাবে রয়েছে যে.... আমাদের ভুতেরা রান্নাঘর থেকে মাছ খেতো যেমন, আবার বাশঝাড়ের ভেতর ঘাড় ও মটকাতো। ঐসব সেরে হাত পা ঠিক মতো না ধুলে কী কী অনিবার্য আমরা জানতাম।
যেমন জানতাম কোথাকার জল কোথায় মেশে। খাটা পায়খানার সিঁড়ি হতো কাঠের তক্তা কিংবা সুপুরি গাছ কেটে। তিনধাপ উঠে তারপর বসে সহজেই দেখতে পাওয়া যেতো.... এটুকুতেই থেমে যাই।
ইদানীং হাচি দিয়েও সরি বলে অনেকেই। তাদের আর বলি না নস্যি নেওয়া দেখেছে কিনা। ঔচিত্যবোধ যে কালে কালে বদলায়, সে তো জানা। কেবল ভাবি এক ছাদের নিচে বসার ঘর, শোবার ঘর, রান্না ঘর, ঠাকুর ঘর ইত্যাদিকে কীভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছে সময়। সবার আলাদা আলাদা আত্মপরিচয় খন্ডিত। ঠাকুমার ঘর, বাবার ঘর নামগুলো আর নেই।
এই সব দেখে আমার এক দিদা খুব খেপে যেতেন। তারপর হয়তো বলতেন - বাংগির খুপড়ি বানাইছে সব, এক ঘরে ফুস করলে অন্যঘরে ঘন্টা বাজবো।
পুনশ্চ - জোনাকিরা আর কোনোদিন অতিথিকে বাড়ির জানান দেবে না।

স্মৃতি লেখা

আমরা তাকে ব্যোমপুলিশ বলতাম, ঠিক সাড়ে তিনটের সময় আইসক্রিমের গাড়ি নিয়ে সে হাজির হতো। কাঁচাপাকা দাড়ি। পাগলাটে। বিড়বিড় করতো কী যেন। ভাঙা আইসক্রিম এক টাকায় তিনটে। ভাগাভাগি করে জিভ লাল আমাদের। আরেক জন জেঠু ছিলেন, হোমিওপ্যাথির গুলি দিতেন। আমরা উন্মুখ হয়ে হাত পাততাম। বাবুল নিতাই কুলপি মালাই রাস্তা দিয়ে গেলে আমাদের সে কী দৌড়। বরফ শেষ। কাঠির থেকে রোয়া উঠে আসছে, আমরা মাইকের কথাগুলো বলতে বলতে পাড়ার সীমানায়। আমাদের খেলাগুলো যখন তখন স্টপ, যখন তখন স্টার্ট। ফিল্ডিং দিয়ে ব্যাটিং না পাওয়ার দু:খের চেয়ে বড়ো কিছু নেই। বল হারিয়ে গেলে নি:স্ব মনে হতো। খুঁজে পেলে হোক কলরব।
স্কুলের ব্যাগে বন্ধুরা আরেক সেট জামা রাখতো কেউ কেউ। পুকুরে সাঁতার কেটে, কিংবা সিনেমা দেখে বাড়ি। আমাদের নাইন টেন একটি পরোটায় তিনবার ফ্রি তরকারিতেই খুশি ছিল। চোঙা প্যান্ট আর ম্যায় হু না ব্যাগের সে সব দিন। সাইকেল সাইকেল। বাড়ি বাড়ি ক্রিং ক্রিং। মোবাইল আসেনি। বন্ধু খুঁজতে যার বাড়ি যাওয়া সেও বন্ধু হয়ে যেতো।
ফুচকাওয়ালার হাতের বুড়ো আঙুলের চিন্তা আমাদের ছিল না। আচার খেতে খেতে অনায়াসেই কাগজের একটা স্তর উঠে যেতো জিভে। স্বাদের ভাগ হয় এটাই জানতাম। স্কুলের দরজার পাল্লায় কাচামিঠে আম রেখে ভাগ বাঁটোয়ারার সেই সব দিন মনে পড়ে।
কমলা লেবুর খোসা হাতে আবার স্কুল করিডরে ফিরতে ইচ্ছে করে। সত্যি চোখের জলেও কত আনন্দ মিশে থাকে!

প্রাক্তন

আমাদের গলিরাস্তা, ছোট মাঠ, ভাঙা পাঁচিল, নয়ানজুলি, কচুবন আর কলমি গাছের ভেতর বল হারিয়ে যেত। খেলার বল। বালিশের পাশে নতুন বল নিয়ে ঘুমোতাম। রবার ডিউস বলের থেকে লাল রং উঠতো। বল যত পুরনো হবে তত যেন মায়া ফুটে বেরোবে। এক একদিন বল খুঁজতে গিয়ে পেয়ে যেতাম অন্য কোনও বল। যা হারিয়ে গিয়েছিল তা মেনে নিয়েছি। হঠাৎ একদিন ফিরে পেলে কেমন একটা হয়। সেটা দিয়ে তখনই খেলা যায় না, আবার ফেলে দেব সেটার সাধ্য নেই। সন্ধে বেলায় ফিরে পাওয়া বলটিকে আলাদা করে খাটের পায়ার নিচে ইটের আড়ালে রেখে দিতাম। ভালো লাগতো হঠাৎ- দেখায়। কষ্ট হতো হঠাৎ পাওয়ায়। সেদিন বলটি হারিয়ে গিয়েছিল বলে আমি সারা বিকেল ফিল্ডিং করেও ব্যাটিং পাইনি।

আমি কেবল ভাবি বল তাও হারিয়ে যেতে পারতো, কিন্তু ব্যাট? ব্যাটের বুকের ক্ষত ঢেকে আমরা লটারি করতাম। মাটির ওপর সেই দাগগুলো থেকে যায়। আবার সেই দাগের পাশে অন্য দাগ। লটারি, খেলা। বেলাশেষে বৃষ্টি না নামা অব্দি সে দাগগুলো থাকতো। আমরা ভাবতাম আবার হয়তো কোনও পুরনো পিং পং বল ভেসে উঠবে। আবার... আবার...
নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণায় হৃদয়ে কাটা দাগের কথা বলা হয়নি। আয়নার গায়ে লেগে থাকা টিপগুলো তারা... কান্না পাহারা দেয় সম্পর্কের সর্বনাম।
দুঃখেরা কেবল নিজেকে ভালবাসে। মানুষ দুঃখ ভালবাসে।

ডাকনাম


বড়মামা আমার ডাকনাম দিয়েছিলেন ডোডো। শান্ত, নিরীহ ডোডোপাখির কথা আপনারা জানেন। আগে ছিল তারা, এখন আর নেই। ডোডো থেকে কালে কালে আমার নাম হয়ে গেল ডুডু। প্রাইমারি স্কুলে ডুডুমার জলপ্রপাত বলে একটা লেখা পড়তে হতো। আমাকে খ্যাপাত সবাই। খুব একটা খারাপ লাগতো না। বরং...
ভালোনাম মুখস্থ করি, ডাকনাম মনে থেকে যায়। নিজেকে মানুষ কী নামে ডাকে? ডাকনামের শৈশব বাবু হয়ে বসে হা-ডুডু খেলে। সঙ্গীরা কাঁচপোকা চিনতে শেখায়। পকেটে রাখা কাগজে ডাকনামের এগারো। অক্ষর সংখ্যা বাইশ পেরোয় না সাকুল্যে। সাদা বাদবাকি অংশ জুড়ে রান জমতে থাকে। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ ডাকনামের!
বয়স বাড়ছে। ডাকনামে ডাকার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। জন্মদিনে উপহার পাওয়া বইয়ের প্রথম পাতা আর হাতে তৈরি করা নববর্ষের কার্ড মনে পড়ে। নামের সূত্রে আসলে জীবন মনে পড়ে। যে জীবন আদরের, বিস্ময়ের, মৌখিক পরীক্ষা দিতে দিতে জানলা দিয়ে রেলগাড়ি দেখার...
যা হারিয়ে যায় তাকে আগলে বসে থাকব কতদিন?
মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে যে তার হারানো মুখের কথা নাকি...
দিগন্তের দিকে যে পাখি উড়ে যায় আমি তাকে ডাকনামে ডাকি!