Sunday, 29 December 2024

‘জলের দাগ মনের দেওয়ালে সাবলীল ওয়ালপেপার’

 


সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কবি উদয় সাহার লেখা ‘ছাই ও ছায়ার পরবর্তী’। এই কবিতাপুস্তিকাটির প্রকাশক— ‘মুজনাই সাহিত্য সংস্থা’। মূল্য ৫০ টাকা।

        বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখালেখি করেন উদয় সাহা। পূর্ববর্তী কাব্যগ্রন্থ ‘পেজমার্ক’-এ মূলত তাঁর রোমান্টিক মনের পরিচয় পাওয়া যায়। মনে পড়ে তাঁর লেখা  ‘অধিক্ষেপ’ কবিতার শেষাংশ—“ওহে সাধুখাঁ, এটাই তো সময়/ আরো শক্ত করে হাতটা ধরবার/ আমাদের দুঃখগুলো জানালার সিট পাবেই।”

        ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখবোধ শিল্পের আঙিনায় কীভাবে ছাপ রেখে যায়, আলোচ্য পুস্তিকায় তার প্রমাণ মেলে। ‘দোস্তানা’ কবিতাটি শুরু হচ্ছে এইভাবে—‘তুমি আছো আর তুমি নেই এর দূরত্ব কতটা?’; আর কবিতার শেষে পাচ্ছি—“নতুন ফুলকপি জিতছে/সকালের লাল চা জিতছে/ কবিতা হারছে, বাবা’।

        ‘ছাই ও ছায়ার পরবর্তী’ কবিতাটি ‘একটি বুকভাঙা উদাসীন পথ’-এর কথা বলে। বিষণ্ণতার জ্যামিতি আঁকার মধ্যে কত দ্বিধা, কত দ্বন্দ্ব, কত বিভ্রম-- ‘নিজস্ব ঘুমে মশগুল হলে দেখি ভারমুক্ত স্বপ্নপথে ভেসে যায় চিতাকাঠ—’। সময়ের সরণী বেয়ে শোকের অনুষঙ্গে এক মহাজীবনের গল্প আঁকা হতে থাকে। সেখানে আছে ঘাসফুল, জলের দাগ, পুজোর ধূপকাঠি, রাত্রির বিস্ময় আরো কত কী! বাবাকে হারানোর পর কবির লেখায় যে মূলগত পরিবর্তন এসেছে, এই পুস্তিকা থেকে তা আন্দাজ করা যায়। সেইসঙ্গে এটাও বলার, ব্যক্তিগত শোকের প্রকাশকে শিল্পে উত্তীর্ণ করতে পেরেছেন কবি।

        এই অক্ষরপ্রয়াসে ছোটোবেলা আসে খুব স্বাভাবিক ভাবেই। ‘ধূলির সরগমে আঁকা’ কবিতায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে কবির নিজস্ব মেজাজ— ‘ভেবে দেখো কতটা গভীরে প্রোথিত হয়েছে স্মৃতিবৃষ্টির টুপটাপ—চুমুর আগে কাঙাল প্রেমিক, চুমুর পরে গ্রামদেশ…’।

         দশটি কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে ফর্মের ক্ষেত্রে পরীক্ষানিরীক্ষা ঈষৎ আরোপিত। যেখানে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশে জোর দিয়েছেন, সেখানে তিনি অসাধারণ সিদ্ধির অধিকারী। কবি উদয় সাহার পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থের অপেক্ষায় রইলাম। শেষ করছি ‘ছাই ও ছায়ার পরবর্তী’র উৎসর্গপত্র উদ্ধৃত করে—

        আমরা কীরকমভাবে বেঁচে আছি

        অনির্বাণ জানে


        ছোট ছোট গল্পের গাদাগাদি

        রূপকথার মতন সুন্দর লাগে

 

        অসুখ হলে প্রত্যেকের সামনে একটা আয়না…

                             

                               সেই সব অসুখদের

Thursday, 24 October 2024

যাপনচিত্র

 



মাঠের ঢাল বেয়ে বল চলে যেত পুকুরের কাছে, বসন্তের দুপুর গড়ানো বিকেল পেলব হতে দেখি ট্রেনের জানলা থেকে। কোথাও কোনো বিরক্তি নেই । সাদা কালো ইউনিফর্মে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছে ছেলেরা। এই রঙ আমার স্কুল। ওড়না সামলে গাছের আড়ালে হেটে হেটে যাচ্ছে যে মেয়েটি, তার বাড়ি জানা হবে না কোনোদিন। আমরা জানলার পাশে বসে চলে যাওয়া দেখি।

কচুরিপানার ওপর কনে দেখা আলো। গোল পোস্টের ভেতর সূর্য ঢুকে যাচ্ছে বুঝি। পলাশ দেখলে আমার আগুন খিদের কথা মনে পড়ে। একের পর এক স্টেশন যায়, আমি ভাবি কখন পৌঁছুব, ভাবতে ভাবতে দেখি ট্রেন বাঁক নিচ্ছে, সে বাঁক আর শেষ হচ্ছে না...

নদীর ওপর ট্রেন গেলে ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করে। হাওয়া আসে। ইচ্ছেরা সম্বল খোঁজে। পায় কিংবা পায় না। বসন্তের বিকেল কেটে যায় ফেরার ট্রেনে, কিন্তু ফেরা হয়ে ওঠে না। কেবল আমার কামরায় রোজ এক অন্ধ গায়ক গাইতে থাকেন-- পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি!

ফেরা

 



ভাইফোঁটার পরেই স্কুল খুলে যেত সারাদিন হুল্লোড়ের পর মনে পড়ত- পুজোর ছুটির হোমটাস্ক কিছুই হয়নি যে! সব ভুলে আনন্দ করবার সেই দিনগুলো খুব মিস করি এই যে উৎসবের মরশুম আপাতত শেষ হচ্ছে, এই নিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের মনখারাপ হচ্ছে কাফিদা একদিন ক্লাসে বলেছিলেনস্থিতাবস্থা বিঘ্নিত হলে মনখারাপ হয়   

অবিরত উৎসবেও ক্লান্ত লাগে এত আলো, এত আয়োজনের ভেতর নতুনভাবে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করি প্রতিদিনের জীবনে যে দূরত্ব, ঈর্ষা, আড়চোখের চাউনিকে সহ্য করে নেওয়া যায়, উৎসবের দিনে তা বেশি করে ফুটে উঠলে অসহায় বোধ হয় তবে কি রুটিনমাফিক জীবনেই মুক্তি? সারা সপ্তাহ দশ ঘন্টা দৌড়ে শনিবারের কলেজ স্ট্রিটেই মোক্ষপ্রাপ্তি? কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না নিজেকেও না

এত ভিড়, শব্দ, ছবির থেকে দূরে আলপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে যে ঢাকি, ইচ্ছে হয় তাঁর সঙ্গে যাই ঘরে ফেরা দেখি পাড়ার কুকুরের ল্যাজ নাড়ানো দেখি ভ্যানরিক্সার গায়ে নায়ক-নায়িকাদের ছবি থেকে আলো ছলকে পড়ছে মাটির উঠোনে আবার তারা ঘুরতে বেরোবে আগের মতো অভ্যস্ত প্রিয় জীবন! 

বক্তব্য


ফ্যান চালানোর দ্বিধা নিয়ে দাঁড়িয়ে একা হেমন্ত। তুমি মনখারাপের কারণ ও ফলাফল। মনে করা আর মনে পড়ার মধ্যে কত অদেখা অনশন।

লুকিয়ে থাকতেই ভালোলাগে আজকাল। বলতে না দেওয়াটাই যখন দস্তুর, শব্দের প্রয়োজন ফুরিয়েছে বুঝি। সোজাসুজি বলতে বিচার চাই।

প্রত্যাশার থেকে পালিয়ে গেলেই শান্তিনিকেতন, জানি। মানি একার পক্ষে সম্ভব নয় সকল সর্বনাশ সামাল দেওয়া। তবু চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে— তুমি আমার হলে না কেন? তুমি তো আমার হতেই পারতে। পেরেক দিয়ে আটকে সাধের মালা পরাতাম!

হারাই হারাই সদা হয় ভয়

 


(১)

শুনেছি আমার ঠাকুরদা দেশ ছেড়ে এসে আসামে চা-বাগানে চাকরি নিয়েছিলেন। তারপর চলে আসেন কোচবিহারে। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর যোগাড়। স্কুলে করণিকের কাজ জুটিয়ে কোনোক্রমে দিন কাটানো। ঠাকুরদা যেদিন মারা যান, সেদিন রাতে কচুর লতি খেয়েছিলেন। আর হ্যাঁ, সিন্দুক থেকে বেরিয়েছিল প্রচুর লটারির টিকিট। কোনো নম্বর মেলেনি কখনোই...

(২)

বাবা ছিল বড়ো ছেলে। দীর্ঘদিন যৌথ পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও আমাদের ছাড়তে হল বাড়ি। পুকুর লাগোয়া যেখানে আমরা ভাড়া থাকতাম, মা ভয় পেত খুব। একমাত্র ছেলে যদি হাঁস চলার পথ ধরে জলে গিয়ে পড়ে...

ভাড়াবাড়ি পাল্টে যায়। পাল্টে যায় ঠিকানা। নতুন জায়গায় গেলে প্রথম প্রথম খেলা নিতে চায় না। পরে ভাব হয়ে যায় কিন্তু ভাড়াটিয়া পরিচয় আর মোছে না। চাঁদার রসিদে ওরা নিজের মতো ভাড়াটিয়া কথাটি লিখে রাখে। আমরা খারাপ পাই না। সব অভ্যেস। শুধু পূর্ণিমা রাতে জ্যোৎস্না দেখতে দেখতে মনে হয় এই আকাশটা আমাদের নয়। এই বারান্দা আমাদের নয়। আমাদের শুধু বাড়িওয়ালার মুখে ‘আর রাখব না’ বলার ভয়।

(৩)

আসামে আমার মামাবাড়ি। স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও সর্বদেহেমনে অস্বস্তি। যেন ভুল জায়গায় থেকে যাওয়া কিছু মানুষ। অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে করতে ভালোবাসার বর্ণমালা ভুলে যাবার যোগাড়। এখন আবার অতীত খুঁড়ে কাগজ বের করতে হবে। সবাই প্রমাণ চায়। বেঁচে থাকার কষ্টের প্রমাণ অনন্ত নীরবতা।

(৪)

কলকাতায় পড়তে এসেছি। মেসে থাকি। মাসি না এলে হোটেলে লাইন দিতে হয়। শীতের কুয়াশার মধ্যে দেখি ভাত ফুটছে তো ফুটছেই। মায়ের কথা মনে পড়ে খুব। বুঝে গেছি আর কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারব না। আমার ঠাকুরদা আর বাবার আলাদা দেশে বাড়ি—আমার অবশ্য তা নয়। কিন্তু আমার মেয়ে যে আমার ছেলেবেলার উঠোন দেখতেই পারবে না। ফ্ল্যাট হয়ে গেছে যে!

(৫)

বরানগরে পুরোনো দিনের এক স্কুল দেখেছিলাম, যার সামনে ঝরা পাতার পাহাড়। শীতের রোদ খেলা করছে ভাঙা সিঁড়িতে। খোঁজ নিয়ে দেখলাম এই অসামান্য দ্বিতল প্রাসাদ কোনো এককালে বাংলা মাধ্যমের স্কুল ছিল। গল্পের মতো ইস্কুলবাড়ি... ভাষা আর বাসা যে বড়ো কাছাকাছি!

(৬)

এ বড়ো সুখের সময় নয়। শাসকের বিরুদ্ধে মানুষ নেমে পড়েছে রাস্তায়।

এদিকে পোড়া বাসের সামনে ফুলের শরীরের ছবি চোখ থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কি শুধু অভিধানেই মানায়? জানিনা। আমরা কেউ কারো কথা শুনিনা। বহুস্বর আশ্রয় পাবে কোথায়?

(৭)

হ্যাঁ প্রতিদিন ভয় পাই। ভাষা হারানোর। ভালোবাসা হারানোর। পূর্বপুরুষের দেশ ছাড়ার ট্রমা এখনও আমাকে ছেড়ে যায়নি। অবচেতনে এমনভাবে বসে আছে যে স্বপ্নে ফিরে ফিরে আসে। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। সবকিছু স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে ঈশ্বর জানেন। নিজের মনেই হাসি। উদ্বাস্তুর আবার ঈশ্বর থাকে নাকি? সেও তো পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়!

Wednesday, 23 October 2024

বিকেলের গন্ধ

বিকেলের সকাল তখন। চায়ের দোকান খুলেছে কেবল। আগুন জ্বলেনি। দুপুরের ঘুম শুরু হলেই টাইমকলে জল আসে।

বিকেলের দুপুরে মেয়েরা টিউশনের পথে। ফিরে ফিরে বিনুনি সামলানোর ব্যস্ততা।
সুপুরিগাছের মাথার ওপর দিয়ে যেসব পাখি উড়ে যেত ধানখেতের দিকে, তারা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। যে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে পুরাতন মানুষ, প্রমোটারের প্ল্যান আর নিয়তির প্রতিরোধ এড়িয়ে তার সামনে টহল দিচ্ছি ভাঙা সাইকেলে...
বিকেল সন্ধে হয়ে নামছে বিকেলে!



Monday, 21 October 2024

ভাঙাগড়ার খেলা

 


ভেঙে যাচ্ছি রোজ রোজ। হাড় থেকে মাংস খুলে আসা ভালো, মন থেকে বিশ্বাস চলে যাওয়ার চেয়ে। দাবি আদায়ের আন্দোলন ব্যক্তিগত পরিসরে এতটাই প্রবল যে অস্মিতা ধুলোখেলা করে। সাপেদের হিসহিস নিয়ে সম্পর্কেরা ফলিত জ্ঞান ঝাড়ে।

জানি প্রত্যাশারা বাজে। তবু এটি যে বাঁচিয়ে রাখে প্রাণ। আনচান করে খালি। চায়ের দোকান থেকে ভাঙা কাপ মিশে যায় ট্রেনের চাকায়। চুরমুর মাটির গল্পে আঙুল ছোঁয়া গল্পেরা ফরেন লিকার। নায়াগ্রায় ঘুরতে যায় বঙ্গলক্ষীরা। বেকার কবি পাগলী তোমার সঙ্গে ভেবে পাঁচিল ভেঙে মরে যায়। বার্লিন নেমে আসে বারান্দায়।

ঘুম কিনতে গেলেও টাকা লাগে। দুঃখ ভোলার নেশা আরো ঋণী করে তোলে। সমাজ কুকুরের ঘায়ের মত ত্যাজ্য করে ব্যর্থ মনোরথ। মানুষ এরপরও বাঁচে। পৃথিবী ধংস হবে ভেবেও যেভাবে আমরা অমর হতে চাই, তেমনই ঠিক ভাবি কেউ বুঝবে। বুঝবেই। ভেঙে যাওয়া আর ফুরিয়ে যাওয়া এক নয়!