“ প্রেমের কবিতা বা বিচ্ছেদের কবিতা।
কখন যে নিজের অজান্তেই প্রেম পেয়ে বসেছে, টের পাইনি। তারপর তা ক্রমে বিচ্ছেদের মতো স্বর্গীয় ভোগের দিকে চলে যায়’’-- কবি মানিক সাহার ‘জলজ্যোৎস্নার মেয়ে’ কাব্যগ্রন্থের ‘ভূমিকা’ শুরু হয়েছে এভাবেই। প্রেমের চেয়ে বিচ্ছেদের মাদকতা বেশি বলে মনে হয়েছে কবির- সৃজনের অনুপ্রেরণা হয়ে বিরহ হয়তো নিয়ে যেতে পারে শুদ্ধতম সত্যের দিকে। কবিতা সেখানে আত্মার পরিশুদ্ধি। চলুন এবারে কবিতা পড়া যাক। কোনো বই হাতে নিয়েই নামকবিতার দিকে আমাদের চোখ চলে যায় অজান্তেই-
জলজ্যোৎস্নার মেয়ে
স্নান সেরে এসে তুমি পোশাক উড়িয়ে দিলে
আর চমৎকার চুম্বনে ভরে উঠলো
বাগান ও আকাশ থেকে ঝুলতে থাকা
দুধের মতো টলটলে চাঁদ
আজ মধুচন্দ্রিমা
তোমার মুখের কাছে নতুন পুরুষের মুখ নামছে
অথচ চোখ বন্ধ করে তুমি ভাবছো
ফেলে রেখে যাওয়া এই প্রেমিকের কথা!
জল মানে জীবন। জ্যোৎস্না সম্ভোগ পদার্থ। জলের ওপর জ্যোৎস্না এসে পড়লে এক মায়া পৃথিবীর সৃষ্টি হয়। একজন পুরুষের মনে মধুচন্দ্রিমার যে স্বপ্ন থাকে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়ে সেই ভাবনার পরিমণ্ডল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। পাঠের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছি পুরুষ পছন্দের নারীটির সঙ্গে মিলিত হতে পারেনি। সে আটকাতে পারেনি তার সাধের নারীটির চলে যাওয়া। এইবার সে মনে করছে- যখন অবাঞ্ছিত নতুন পুরুষের মুখ নামছে প্রিয়ার মুখের কাছে , উত্তেজনার সে মুহুর্তে চোখ বুজে নারী যেন ভাবছে ‘ফেলে রেখে যাওয়া এই প্রেমিকের কথা!’ - এই বিস্ময়বোধক চিহ্নটি ভারি মজার। নারীটি সত্যি ভেবেছিল কিনা পুরুষটির কথা আমরা জানি না, আর এই প্রশ্নও সুসঙ্গত নয়। আচ্ছা, এই ভাবনার মধ্যে কি একরকমের ইচ্ছেপূরণের গল্প নেই? কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘বালিতে আঁকা নাভি’ শেষ হচ্ছে এইভাবে-- “... ফুলসজ্জার রাতে চাঁদ ঠিকরে পড়ছে/ তোমার ও তোমার স্বামীর অলৌকিক ছায়ায়।’’ ফুলশয্যা, চাঁদ যে শব্দগুলো সম্ভোগের সূত্রে ব্যবহৃত হয়, তাই হয়ে উঠছে আরেকজনের কাছে দুঃখের, যন্ত্রণার। আমরা জানি বিপ্রলম্ভ-শৃঙ্গার অধম প্রকৃতির নায়ক নায়িকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাদের কাছে সম্ভোগ- শৃঙ্গারই শৃঙ্গারের একমাত্র রূপ। বিচ্ছেদের মধ্যে প্রেম খুঁজে পাওয়া উত্তম প্রকৃতির মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এ কথাগুলো একারণেই বলা, বর্তমান বিশ্বায়িত সমাজে প্রেমের সঙ্গে শরীরের যত যোগ প্রচারিত হয়, আন্তরিক স্মৃতির যোগ ততটা প্রাধান্য পায় না। ব্রেক আপ আর বিচ্ছেদ যে সমার্থবোধক নয়। এবং বিরহ মানে যে বিশেষ ভাবে থাকা! যেদিন থেকে সব শূন্য মনে হওয়া শর্তসাপেক্ষে, সেদিন থেকেই তো প্রেম।
‘প্রেম’ কবিতার শেষে কবি লিখছেন- “কত জন্ম আগেকার কথা/ কত জন্ম পার হয়ে এসে/ সেই সব পোড়া দাগ এই তো সেদিন বলে মনে হয়।’’ বুঝতে পারি সময়ের ব্যবধানেও সম্পর্কের আগুন মলিন হয়নি। পুড়িয়ে দেওয়া জুড়িয়ে দেওয়া ক্ষত বুঝি বিষাক্ত সম্পদ। কবির বুঁদ হয়ে থাকা বুঝি বিগত সময়কে আগলে রেখেই প্রাণপণে “... আমার প্রতিটি শব্দ/ হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি সময় ছুঁয়ে থাকে।’’ (গান) এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি পড়লে সম্পর্কের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। ‘সম্পর্ক’ কবিতার সূচনায় বলা হচ্ছে একটি গাছের কথা, যে ক্রমশ বৃক্ষ হয়ে উঠছে। পথিক এসে গুনে দেখছে ফলের রং, পাখি আর তার চিকন সন্তান মেতে উঠছে রং মিলান্তিতে। এদিকে সকলের অগোচরে মানব মানবীর ‘পরিচয়’ ক্রমশ গড়িয়ে যাচ্ছে সম্পর্কে। কেউ জানলই না! গোপনীয়তা শিল্পের অন্যতম শর্ত, সম্পর্কেরও। তবে আলোর মত ছড়িয়ে পড়াও থাকে বইকি। ‘ঝুলবারান্দা’ কবিতায় লেখা হয়- “একটি ঝুলবারান্দায় পড়ে থাকা বিকেলের রোদ/ তাতে তোমার চুলের গন্ধ লেগে আছে’’। “তুমি প্রতিদিন আড়ালে বসে বাদাম ভাঙছো/ তার গন্ধে বড় উঠছে তোমার অভিমান’’ (অভিমান) ফ্রেমে আটকে যাওয়া কিছু ছবি পাঠককে নিয়ে যেতে পারে স্মৃতির সরণীতে। স্মরণযোগ্যতা যদি কবিতার মাপকাঠি হয়, মানিক সাহা সসম্মানে উত্তীর্ণ হতেই পারেন- “ মুগ্ধ হই, যতটুকু মুগ্ধ হলে/ কান্না থেমে যায়...’’ কিংবা “... ভালো প্রেমিক হওয়া বড় কঠিন কাজ/ বরং দুষ্টু দেবতা হওয়া তার চেয়ে কিছুটা সহজ।’’
‘অভিশপ্ত’, ‘দেবতার অভিশপ্ত ছায়া’, ‘ভাঙা ডানা’, ‘মেঘ ও মৃত্যু বিষয়ক’, ‘আত্মহত্যার পর যা যা লিখব ভেবেছি’, ‘নির্বাণ’- কবিতার নামগুলিকে এইভাবে সাজালে কবিমনের আরেকটি পরিচয় ফুটে ওঠে- “মুচলেকা লিখে রেখে/ বেঁচে থাকা বড় অভিমানী/ স্নায়ু জুড়ে ব্যভিচার, শেষ চিঠি/ স্বীকারোক্তিঃ কবি আজ/ আত্মহত্যাকামী।’’ প্রেমের সঙ্গে মৃত্যুর যোগের কথা আমরা জানি। হাসিকান্না হীরাপান্না। নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। এর থেকে পরিত্রাণ নেই। আধুনিক মানুষের অন্যতম অভিজ্ঞান যে দ্বন্দ্ব! আরেকটি কথা বলার, বিপ্রলম্ভের মধ্যে মিশে থাকে বঞ্চনা। এই বঞ্চনা হতে পারে বিভিন্নভাবে- প্রতিশ্রুতি দিয়ে পালন না করবার মধ্যে, বিবাদের মধ্যে কিংবা দৈবের কারণে। প্রেমিক কখনও এই বঞ্চনা ভুলতে পারে না। এবং তা ফিরিয়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়। সে কেবল অসহায়ভাবে বলতে পারে- “ এতসব... এতকিছু দিয়ে/ আমাকে রিক্ত করার এত প্রয়োজন ছিল!’’ (অবসান) নিঃস্বতার যে আত্মঅহংকার তাই হয়ত মূর্ত হয়ে ওঠে কথায় ছবিতে কবিতায়।
তরুণ কবি ও প্রকাশক অরুণাভ রাহারায় উত্তর শিলালিপির পক্ষ থেকে যত্ন করে বইটি পাঠকের দরবারে এনেছেন। সুন্দর প্রচ্ছদ, মুদ্রণ – ঝকঝকে, নির্ভুল। কবিতার বিন্যাসের ক্ষেত্রে আরেকটু মনোযোগী হওয়াই যেত। কবির ‘ভূমিকা’ দিয়েই শুরু হয়েছিল আমাদের লেখা, থেমে যাবার আগে মনে হচ্ছে ‘জলজ্যোৎস্নার মেয়ে’ ভূমিকাবিহীন হলে ভালো হত আরো।
..............................
জলজ্যোৎস্নার মেয়ে
মানিক সাহা
উত্তর শিলালিপি
প্রথম প্রকাশ- ২০১৭
মূল্য- ৮০ টাকা
