‘অদৃশ্যে নিজেকে রেখে যেন রেওয়াজে বসেছ।’- তারেক কাজীর
‘বিপন্ন মেঘের দল’ কাব্যগ্রন্থের ‘বসন্ত’
কবিতার এই উচ্চারণকে তাঁর কবিতা সম্বন্ধেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। ‘সুখের
মুহূর্তগুলি’ কবিতার বই-এর প্রথম কবিতা ‘শ্রাবণ’, শেষ হচ্ছে এই ভাবে- “আরও একটা
বরষা শুরু হল, মাঠে মাঠে লাঙল পড়ল... ধান ছাড়া রোয়া হল...কালসিটে মানুষগুলো বগলে
সন্তান আঁকড়ে দেখতে শুরু করল ডালভাতের স্বপ্ন... ’’ কালসিটে শব্দটির ব্যবহার নিয়ে
ভাবতে ভাবতেই মনে হতে থাকে যে, এই সামান্য ডালভাতের স্বপ্নই বুঝি অসামান্য।
চিরন্তন। বাংলা কবিতার ভূগোলে গ্রামজীবনের ছবি আরও বেশি করে উঠে আসা দরকার। যেমন
দরকার সংখ্যালঘু মানুষের দিনযাপনের সঙ্গে আন্তরিক পরিচয়। ‘আহাদ্’ কবিতায় কবি
বলছেন- ‘হাদিস বর্ণিত নির্মম দোজখ কিংবা খুশবুময় জান্নাত- দুটিই আমার কাছে পাহাড়
চূড়ায় ফুটে থাকা বসন্তের অচেনা ফুলের মতো।... জানতে ইচ্ছে করে কোন রহস্যে এখনও ওই
আট জান্নাত এবং সাতদোজখের মাঝে আমাদের ছেড়ে দিয়ে নির্বিকার তুমি... ’’ এই পৃথিবীর
দিনযাপনের আনন্দই জান্নাত, আর দারুণ যন্ত্রণারা দোজখের আযাবের মতো- এই ভাবনা তার
ভেতরে ভেতরে এক অন্য জীবনের খোঁজ করতে থাকে। “খোদার মর্জির খামখেয়ালি রূপের কথা
ভাতে ভাবতে এঁটো থালাবাটি জড়ো করি। ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করি লাবণ্যময়ী কার্পেট আর
দিল- কলবেতে লেগে থাকা দাগ... ’’ কবিতার নাম ‘দলছুট’। কবিও এক অর্থে তাই।
“কত রাত্রি পার হল, জমা কথা শেষ হয়ে এল। তোমাদের আজকাল আর
একত্রে দেখা যায় না। তোমাদের ভিতর এখন বাক্যালাপ তেমন কিছু হয় না। তোমরা দুজন
নিজেদের মতো একই চালার নীচে গড়ে নিয়েছ ভিন্ন ভিন্ন পৃথিবী।... অনিদ্রায় শীতের
পাহাড় রাত্রি কাবার হয়ে যায়। মনের ভিতর
আবার আশ্রয় নিতে চায় প্রাচীন, প্রাচীন খেলাধূলা। দেহ নড়েচড়ে সাড়া দিয়ে ওঠে।
নিজেকে সামলে নিতে নিতে দু-একটা উপদেশ দাও। ঘ্যাগ ঘ্যাগ করে কাশো- ছেলেবউ বিরক্ত
হয়... ’’ শেষের লাইনটি পড়ে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ঘ্যাগ ঘ্যাগ শব্দের
বিরক্তির মধ্যে এত মায়া ভর্তি হয়ে থাকে, পাঠক হিসেবে ভাবতে থাকি। জীবনের দিকে মুখ
ফেরাই। এক পুরুষের চোখ দিয়ে দাম্পত্য দেখা এবং দেখানোর অভিনবত্ব মন কেড়ে নেয়।
এতক্ষণ ধরে আমরা বিভিন্ন কবিতার থেকে যে অংশগুলি উদ্ধৃত করছি, তা থেকে কিছুটা হলেও
কাব্যভাষা নিয়ে ধারণা জন্মেছে। এই কাব্যগ্রন্থের সব কবিতাই গদ্যে। ছন্দ কি নেই এর
মধ্যে কোথাও? আছে। তবে প্রচলিত ছন্দকাঠামোয় তাকে ধরা মুশকিল। এই যেমন-- “ এখন
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় সম্মুখে নেই। এখন আঘাত সহ্য করা ছাড়া আর কিছু করণীয়
নেই।... তোমার অব্যক্ত মননের ওই ভাষা, রেশমী সুতোর গিঁট। একান্ত যাপন... সামান্য
হলেও আমি বুঝি। যেমন গাছেরা বোঝে গাছের ইশারা। পাখিরা পাখির...’’ ( হেমন্ত) কবির
কারও প্রতি উচ্চকিত অভিযোগ নেই। বেদনার ভারে স্মরণ করা কেবল মাত্র। কবি নিজের
সঙ্গে নিজেই কথা বলে চলেন। ভেতরের দিকে মুখ ফেরানো এই কবিতারা দহনের মধ্য দিয়ে
শুদ্ধ হয়ে ওঠার কথা বলে। আঘাত উপেক্ষা করে সকলের ভালো চায়। ব্যক্তিগত ঈশ্বরের
সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে সান্ত্বনা দিতে থাকেন নিজেই নিজেকে-- “ একটু ধৈর্য ধরো,
ওই উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকাও, ওই দৃশ্যের কাছে তোমার হু- হুতাশ বড় বেশি বেমানান।
’’
শিল্প যদি বেঁচে থাকাকে আরেকটু সহনীয় করে তোলে, জীবনকে
সমস্ত অপ্রাপ্তির উর্দ্ধে নতুন ইতিবাচক এক অর্থ দান করে; তবে মানবজাতির ঋণ বেড়ে
যায় স্রষ্টার প্রতি। ‘স্বপ্ন’, ‘বিরহ’, ‘বার্ধক্য’, ‘পরামর্শ’, ‘দ্বন্দ্ব’, ‘স্বীকারোক্তি’,
‘জবাবদিহি’, ‘অনুতাপ’, ‘অবসাদ’,’সান্ত্বনা’, ‘অহিংসা’- কবিতার নামগুলিকে যদি
অনুধাবন করি, প্রতিটি কবিতাকে বিচ্ছিন্ন একক বলে মনে হয় না আর। মনে হয় আসলে একটি দীর্ঘ
কবিতাকেই কবি খন্ডে খন্ডে লিখছেন। আর সেই কবিতা ‘যাযাবর’- এর- “ আমার ঢাল নেই,
তরোয়ালও নেই, তবুও বারবার রণাঙ্গনে গেছি... ’’
‘সুখের মুহূর্তগুলি’ কাব্যগ্রন্থে পেয়ে যাই কিছু কিছু চরিত্রের হদিশ। যেমন ‘অনার
কিলিং’ কবিতার মাধবকাকা যিনি একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন। ছেলের নাম রাজু। ‘হাসিনা
প্রেমিক ছিল তার’। ফেরি পারাপার করতে থাকা যাত্রীদের দিকে চেয়ে থাকেন আর বিড়বিড় করেন।
ছেলের খুনিকে কোনোদিন চিহ্নিত করতে পারবেন কি? কবিতার নামটির মধ্যেই আখ্যানের খোঁজ
পাই আমরা। ‘বঙ্গবাসী’ কবিতায় পাই দুখুদাদুর কথা। যিনি এক কালে পালাগান গাইতেন। নিঃসন্তান
রেবানানী গত হওয়ার পর দুখু দাদুর জীবন পাল্টে গেছে। এর ওর কাছে হাত পেতে নিরাশ্রয় জীবন
অশত্থতলায়। গাছ ডালপালা নাড়ে। মশামাছি যেন না বসে- “যেন দুখুদাদু তাঁকে ছেড়ে কোনওদিন
কোথাও না চলে যায়।’’ কবির সুখ দুঃখের সাথী মানুষগুলোর কথা পড়তে পড়তে উৎপলকুমার বসুর
কবিতা মনে পড়ে। ‘অহিংসা’ কবিতার বুড়োর কোনো নাম নেই। যিনি বলতে পারেন- “ কবিতা পড়ি
না আমরা। আর তার কোনও প্রয়োজন নেই। … আমাদের
জীবনযাপনই তোমাদের এক একটা স্বয়ং সম্পূর্ণ কবিতা।’’ ভোর বেলা যার প্রথম লাইন শুরু।
কবিতাটি লেখা হতে থাকে জীবন যাপনের পরিচয় দিয়ে। দিন আনি দিন খাই এই মানুষ কাজ না জুটলে
ছিপ হাতে মাছের সন্ধান করেন। কবিতাটি বুড়োর জবানিতে এই ভাবে শেষ হচ্ছে- “যদি কিছু মিলে
যায় ভালো, তবে কোনোদিন দোষারোপ করিনি ঈশ্বরকে…’’ বুড়োর সংলাপে কবির স্বর চিনে নিতে
অসুবিধা হয় না আমাদের। পারস্পরিক বিদ্বেষ যখন আমাদের জীবনের অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠেছে,
তখন যেকোনো সঙ্কীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে উদার অনুভব, সহিষ্ণুতার শিক্ষা প্রাসঙ্গিক হয়ে
ওঠে। নিরাভরণ, শান্ত, নম্র, আত্মগত উচ্চারণে তারেক কাজী যে সুখের মুহূর্তগুলি লিখে
ফেলেন, তা আসলে কবিতার মুহূর্ত। দুঃখ যেখানে কাছের সম্বল। কান্না হাসির দোল দোলানো
জীবন আরেকবার কবিতার কাছে এসে জীবিত হয়- “ বলো বন্ধু বলো- সুখের মুহূর্তগুলি বলো- সেগুলি
তো আজও ক্ষণস্থায়ী বড়…’’
…………………
সুখের মুহূর্তগুলি
তারেক কাজী
প্রচ্ছদ- শোভন পাত্র
ছোঁয়া
প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০১৭
মূল্য- একশো টাকা