Thursday, 22 February 2018

উত্তরজনপদবৃত্তান্ত : লোকায়ত চিরকালীন জীবন

 “মাইল মাইল দিগন্তের ভিতর, দিগন্ত পেরিয়ে আরো আরো দিগন্তের ভিতর, নদীঘেরা মানুষঘেরা অরণ্যঘেরা গানঘেরা বাজনাঘেরা জীবনের অনন্ততা ছুঁয়ে কোথাও কি যাবার থাকে মানুষের! প্রশ্ন নয়, প্রত্যাশাহীন সংশয় হয়ে কবে কার কতকালের জীবন যেন মায়াকুহকময়তায় জীবনেরই বন্দনাগান।... আবহমানের আবহমানতায় চিরসত্য হয়ে জীবন যেন নুড়িভাষা নদীর অঞ্চলকথার অত্যাশ্চর্য চোরাটান।’’- কবি সুবীর সরকারের সাম্প্রতিক গদ্যের বই ‘উত্তরজনপদবৃত্তান্ত’ পড়তে গিয়ে শুরুতেই উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করল লেখকের ‘টরেয়া’ শীর্ষক একটি লেখার অংশ। কবির গদ্য পড়তে হলে কিছু কবিতা অনিবার্যভাবেই চলে আসে অনুভবের উঠোনে। যেমন- ‘বৃত্তান্ত’

                         বৃত্তান্তে যাবো না বরং গন্তব্যে

                                   পৌঁছই

                         ফের নীরবতা।

                         উনুনে গুঁজে দেব

                                  টুপি

‘দোয়েল’ নামের একটি কবিতা পড়ছি পড়ার আনন্দেই-

                    ভাঙা দেওয়ালে পা। দেওয়ালে দোয়েল বসে

                                        থাকে

                    কত কত জন্মের পুলক!

                    ভরসন্ধ্যেয় পালকি এসে

                              থামে

আমরা জানি নব্বই দশকের কবি সুবীর সরকার জীবনে ও যাপনে ছুঁয়ে থাকেন উত্তরজনপদ। আঞ্চলিক ইতিহাস, লোককথা থেকে তুলে আনতে চান অন্তহীন বাঁচার রসদ। যে বাঁচা নাগরিক মধ্যবিত্তের নয়। যেকোনো একরৈখিক ধারণাকে নস্যাৎ করে বহুমাত্রিক অনুভবেই তিনি খুঁজতে চান বাতাসের ভেতর আরোগ্য। স্বপ্ন দেখেন সাদা ঘোড়া, কবিতাগ্রাম এবং রবিশস্যে ভরা খামারবাড়ির। ‘কত কত জন্মের পুলক’- কে পেতে হলে এক জীবনে কী করতে হবে মানুষকে?

মধ্য হেমন্তের নরম রোদের মধ্য দিয়ে কইকান্তের হন্তদন্ত হেঁটে আসার সূত্র ধরে আখ্যান শুরু হয়। রাধাকান্ত, কইকান্ত, ফণিমোহনের বন্ধুত্ব- পরবর্তী প্রজন্মে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে আত্মীয়তা পাতাবার তাগিদ আমাদের আখ্যানের সময়কে নিজের মত করে গড়ে নেয়। সন তারিখ দিয়ে এই সময় বোঝা যায় না। বিহান বেলার রোদে আলস্য মাখতে মাখতে আমরা পাই কইকান্তের গৃহিণী নন্দরাণীর কথা। উত্তরাঞ্চলের এক ভরা সংসারের কর্ত্রীর কাজের ফাঁকে নিজের আসামের বাড়ির কথা মনে পড়ে। আসে আবহমান হাতিমাহুতের গান -  “ ও মোর গণেশ হাতির মাহুত রে/ মোক নিয়া যান বাপ ভাইয়ার দেশে।’’ স্মৃতি থেকে ‘সংসারের বাস্তবতার দৈনন্দিনতায়’ ফিরতে হয় তাকে। এই ফেরা না ফেরার সূত্রে পাই রাধাকান্ত কিংবা সোমেশ্বরীকে। পুরোনো দেশকালের গল্প জুড়ে বিষণ্ণ সন্ধে নামার প্রসঙ্গে সচেতন পাঠক লক্ষ্য করতেই পারেন সময়ের চলনকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধে—চরিত্রেরা পাল্টে যায়। প্রসারিত হতে থাকে দীর্ঘশ্বাসের ডালপালা—“ হালকা কুয়াশায় স্মৃতির স্তরে স্তরে ফেলে আসা সময়ের মহার্ঘ্য টুকরোগুলি কিছুতেই কিন্তু জোড়া লাগে না।’’  

সোমেশ্বরীর বাবা হরমোহন ছিলেন জোতদার। সোমেশ্বরী বাল্যস্মৃতির কাছে আকুল হয়ে পেতে চায় আশ্রয়। কিন্তু... সে জানে তাকে ফিরতে হবেই মাছের ঝাঁকের কাছে- “ হায় রে জীবন! আদিগন্ত এক মানব জীবন।’’ বদলে যাওয়া জীবনের অসহায়তার কথা বারেবারেই তুলে আনেন লেখক। বাতাসের ভেতর আরোগ্য খুঁজতে চেয়ে হয়তো গাড়িয়াল গান তোলে চরাচরের বুকে। যেখানে গদ্য থেমে যায়, গান আসে সেখানে। কিংবা যেখানে গান থামে, সেখানে নিস্তব্ধতা নামে। একটা নিম কাঠের দোতরা চোখের শূন্যতার মিশে যেতে থাকবার ছবিতে বুঝতে পারি এই গদ্য কেবল একজন কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব। কুশাণের পালা, মঞ্চ জুড়ে বহুবর্ণিল গীতিময়তার মধ্য থেকেই মানুষ খুঁজে নিতে থাকে হয়তো জীবনের রসদ- “ ঘরবাড়ি বিভ্রমের শিশিরেই ভিজে যায়। রাধাকান্তরা জীবনের পরতে পরতে এইভাবে কেবল উৎসব সাজিয়ে যায়।’’ হাটের দিনে পাগলের গল্পে জমতে থাকে কুয়াশার মিথ। গদ্যকার বলেন- “ এক একটা হাট তো তাকে এক এক জন্মের স্বাদ এনে দেয়।’’ এই বই কাহিনিসর্বস্ব হয়ে উঠতে চায়নি কোথাও। ফলে ঘটনা খুব একটা থাকে না। যা থাকে তা হল উত্তরজনপদের চিরায়ত জীবন ইতিহাস। গানে-গল্পে-স্মৃতিতে-যাপনে।

কুদ্দুস, ইয়াসিন, নাসিরুদ্দীন ব্যাপারী, গজেন বর্মণ, বান্ধে ওরাউ, হীরামতি নার্জিনারী, আব্রাহাম রাভা – সবাই মিলে তৈরি করে উত্তরের আত্মপরিচয়। শেকড়ের সন্ধানে ঢুকে পড়তে হয় বহমান জীবনের গভীরে- “সোমেশ্বরীর পাকঘর থেকে মুসুরির ডালের গন্ধ আর প্রাচীনা আবোর মজাগুয়ার মিশ্রণে উত্তরের বিলপুকুরের হাঁসগুলি তাদের চলাচলের ভেতর দিয়ে আবহমানের সব গল্পকথাগুলিকেই হাহাকারের মতন সাজিয়ে দিতে থাকে, একধরনের বাধ্যবাধকতাতেই হয়তো উত্তরকথার খুব খুব ভেতরেই।’’ এই সেজে ওঠা ফুরোয় না কখনো। লেখা যেখানে থেমে যায়, হাওয়া চলে আসে। আবাড় জমতে থাকে উত্তরের কথকতা...

বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবি উত্তম দত্তকে। কৌশিক আচার্যের অসামান্য ছবি গ্রন্থের প্রচ্ছদকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। চিত্রাঙ্গী যত্ন করে প্রকাশ করেছে এই বই। উত্তরজনপদ নিয়ে আরো লিখুন গদ্যকার- এমন দাবি করা যেতেই পারে।      

....................

             

উত্তরজনপদবৃত্তান্ত

সুবীর সরকার

চিত্রাঙ্গী

প্রথম প্রকাশ- নভেম্বর, ২০১৭

মূল্য- ১২০ টাকা।

Sunday, 7 January 2018

জলজ্যোৎস্নার মেয়ে : প্রেম পদাবলি


“ প্রেমের কবিতা বা বিচ্ছেদের কবিতা।

     কখন যে নিজের অজান্তেই প্রেম পেয়ে বসেছে, টের পাইনি। তারপর তা ক্রমে বিচ্ছেদের মতো স্বর্গীয় ভোগের দিকে চলে যায়’’-- কবি মানিক সাহার ‘জলজ্যোৎস্নার মেয়ে’ কাব্যগ্রন্থের ‘ভূমিকা’ শুরু হয়েছে এভাবেই। প্রেমের চেয়ে বিচ্ছেদের মাদকতা বেশি বলে মনে হয়েছে কবির- সৃজনের অনুপ্রেরণা হয়ে বিরহ হয়তো নিয়ে যেতে পারে শুদ্ধতম সত্যের দিকে। কবিতা সেখানে আত্মার পরিশুদ্ধি। চলুন এবারে কবিতা পড়া যাক। কোনো বই হাতে নিয়েই নামকবিতার দিকে আমাদের চোখ চলে যায় অজান্তেই-

 

জলজ্যোৎস্নার মেয়ে

 

স্নান সেরে এসে তুমি পোশাক উড়িয়ে দিলে

আর চমৎকার চুম্বনে ভরে উঠলো

বাগান ও আকাশ থেকে ঝুলতে থাকা

দুধের মতো টলটলে চাঁদ

 

আজ মধুচন্দ্রিমা

তোমার মুখের কাছে নতুন পুরুষের মুখ নামছে

অথচ চোখ বন্ধ করে তুমি ভাবছো

ফেলে রেখে যাওয়া এই প্রেমিকের কথা!

জল মানে জীবন। জ্যোৎস্না সম্ভোগ পদার্থ। জলের ওপর জ্যোৎস্না এসে পড়লে এক মায়া পৃথিবীর সৃষ্টি হয়। একজন পুরুষের মনে মধুচন্দ্রিমার যে স্বপ্ন থাকে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়ে সেই ভাবনার পরিমণ্ডল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। পাঠের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছি পুরুষ পছন্দের নারীটির সঙ্গে মিলিত হতে পারেনি। সে আটকাতে পারেনি তার সাধের নারীটির চলে যাওয়া। এইবার সে মনে করছে- যখন অবাঞ্ছিত নতুন পুরুষের মুখ নামছে প্রিয়ার মুখের কাছে , উত্তেজনার সে মুহুর্তে চোখ বুজে নারী যেন ভাবছে ‘ফেলে রেখে যাওয়া এই প্রেমিকের কথা!’ - এই বিস্ময়বোধক চিহ্নটি ভারি মজার। নারীটি সত্যি ভেবেছিল কিনা পুরুষটির কথা আমরা জানি না, আর এই প্রশ্নও সুসঙ্গত নয়। আচ্ছা, এই ভাবনার মধ্যে কি একরকমের ইচ্ছেপূরণের গল্প নেই? কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘বালিতে আঁকা নাভি’ শেষ হচ্ছে এইভাবে-- “... ফুলসজ্জার রাতে চাঁদ ঠিকরে পড়ছে/ তোমার ও তোমার স্বামীর অলৌকিক ছায়ায়।’’ ফুলশয্যা, চাঁদ যে শব্দগুলো সম্ভোগের সূত্রে ব্যবহৃত হয়, তাই হয়ে উঠছে আরেকজনের কাছে দুঃখের, যন্ত্রণার। আমরা জানি বিপ্রলম্ভ-শৃঙ্গার অধম প্রকৃতির নায়ক নায়িকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাদের কাছে সম্ভোগ- শৃঙ্গারই শৃঙ্গারের একমাত্র রূপ। বিচ্ছেদের মধ্যে প্রেম খুঁজে পাওয়া উত্তম প্রকৃতির মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এ কথাগুলো একারণেই বলা, বর্তমান বিশ্বায়িত সমাজে প্রেমের সঙ্গে শরীরের যত যোগ প্রচারিত হয়, আন্তরিক স্মৃতির যোগ ততটা প্রাধান্য পায় না। ব্রেক আপ আর বিচ্ছেদ যে সমার্থবোধক নয়। এবং বিরহ মানে যে বিশেষ ভাবে থাকা! যেদিন থেকে সব শূন্য মনে হওয়া শর্তসাপেক্ষে, সেদিন থেকেই তো প্রেম।

‘প্রেম’ কবিতার শেষে কবি লিখছেন- “কত জন্ম আগেকার কথা/ কত জন্ম পার হয়ে এসে/ সেই সব পোড়া দাগ এই তো সেদিন বলে মনে হয়।’’ বুঝতে পারি সময়ের ব্যবধানেও সম্পর্কের আগুন মলিন হয়নি। পুড়িয়ে দেওয়া জুড়িয়ে দেওয়া ক্ষত বুঝি বিষাক্ত সম্পদ। কবির বুঁদ হয়ে থাকা বুঝি বিগত সময়কে আগলে রেখেই প্রাণপণে “... আমার প্রতিটি শব্দ/ হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি সময় ছুঁয়ে থাকে।’’ (গান) এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি পড়লে সম্পর্কের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। ‘সম্পর্ক’ কবিতার সূচনায় বলা হচ্ছে একটি গাছের কথা, যে ক্রমশ বৃক্ষ হয়ে উঠছে। পথিক এসে গুনে দেখছে ফলের রং, পাখি আর তার চিকন সন্তান মেতে উঠছে রং মিলান্তিতে। এদিকে সকলের অগোচরে মানব মানবীর ‘পরিচয়’ ক্রমশ গড়িয়ে যাচ্ছে সম্পর্কে। কেউ জানলই না! গোপনীয়তা শিল্পের অন্যতম শর্ত, সম্পর্কেরও। তবে আলোর মত ছড়িয়ে পড়াও থাকে বইকি। ‘ঝুলবারান্দা’ কবিতায় লেখা হয়- “একটি ঝুলবারান্দায় পড়ে থাকা বিকেলের রোদ/ তাতে তোমার চুলের গন্ধ লেগে আছে’’। “তুমি প্রতিদিন আড়ালে বসে বাদাম ভাঙছো/ তার গন্ধে বড় উঠছে তোমার অভিমান’’ (অভিমান) ফ্রেমে আটকে যাওয়া কিছু ছবি পাঠককে নিয়ে যেতে পারে স্মৃতির সরণীতে। স্মরণযোগ্যতা যদি কবিতার মাপকাঠি হয়, মানিক সাহা সসম্মানে উত্তীর্ণ হতেই পারেন- “ মুগ্ধ হই, যতটুকু মুগ্ধ হলে/ কান্না থেমে যায়...’’ কিংবা “... ভালো প্রেমিক হওয়া বড় কঠিন কাজ/ বরং দুষ্টু দেবতা হওয়া তার চেয়ে কিছুটা সহজ।’’  

‘অভিশপ্ত’, ‘দেবতার অভিশপ্ত ছায়া’, ‘ভাঙা ডানা’, ‘মেঘ ও মৃত্যু বিষয়ক’, ‘আত্মহত্যার পর যা যা লিখব ভেবেছি’, ‘নির্বাণ’- কবিতার নামগুলিকে এইভাবে সাজালে কবিমনের আরেকটি পরিচয় ফুটে ওঠে- “মুচলেকা লিখে রেখে/ বেঁচে থাকা বড় অভিমানী/ স্নায়ু জুড়ে ব্যভিচার, শেষ চিঠি/ স্বীকারোক্তিঃ কবি আজ/ আত্মহত্যাকামী।’’ প্রেমের সঙ্গে মৃত্যুর যোগের কথা আমরা জানি। হাসিকান্না হীরাপান্না। নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। এর থেকে পরিত্রাণ নেই। আধুনিক মানুষের অন্যতম অভিজ্ঞান যে দ্বন্দ্ব! আরেকটি কথা বলার, বিপ্রলম্ভের মধ্যে মিশে থাকে বঞ্চনা। এই বঞ্চনা হতে পারে বিভিন্নভাবে- প্রতিশ্রুতি দিয়ে পালন না করবার মধ্যে, বিবাদের মধ্যে কিংবা দৈবের কারণে। প্রেমিক কখনও এই বঞ্চনা ভুলতে পারে না। এবং তা ফিরিয়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়। সে কেবল অসহায়ভাবে বলতে পারে- “ এতসব... এতকিছু দিয়ে/ আমাকে রিক্ত করার এত প্রয়োজন ছিল!’’ (অবসান) নিঃস্বতার যে আত্মঅহংকার তাই হয়ত মূর্ত হয়ে ওঠে কথায় ছবিতে কবিতায়।

তরুণ কবি ও প্রকাশক অরুণাভ রাহারায় উত্তর শিলালিপির পক্ষ থেকে যত্ন করে বইটি পাঠকের দরবারে এনেছেন। সুন্দর প্রচ্ছদ, মুদ্রণ – ঝকঝকে, নির্ভুল। কবিতার বিন্যাসের ক্ষেত্রে আরেকটু মনোযোগী হওয়াই যেত। কবির ‘ভূমিকা’ দিয়েই শুরু হয়েছিল আমাদের লেখা, থেমে যাবার আগে মনে হচ্ছে ‘জলজ্যোৎস্নার মেয়ে’ ভূমিকাবিহীন হলে ভালো হত আরো।  

                             .................................

জলজ্যোৎস্নার মেয়ে

মানিক সাহা

উত্তর শিলালিপি

প্রথম প্রকাশ- ২০১৭

মূল্য- ৮০ টাকা