অনুবাদে কবিতার রস অক্ষুণ্ণ থাকে কিনা এ নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। তবে সাহিত্যের রসজ্ঞ পাঠকেরা সার্থক অনুবাদের জন্য যে অপেক্ষা করে থাকেন তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘র্যাঁবো উন্মাদ সৌরকণা’ বইটি কয়েকদিন ধরে পড়ছিলাম। র্যাঁবোর কবিতার অনুবাদ করেছেন গৌতম গুহ রায়। জানিয়ে রাখা ভালো অনুবাদক নিজেও একজন কবি।
১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ২০ অক্টোবর ফ্রান্সের এক
সীমান্ত শহর শার্লভিলে জাঁ আর্তুর র্যাঁবো জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর
ক্যাপ্টেন। মা গ্রামের কৃষককন্যা। শৈশব থেকে রূঢ় বাস্তবের সম্মুখীন হতে হয়েছিল
তাঁকে। ‘জাঁ আর্তুর র্যাঁবোঃ উন্মাদ সৌরকণা’ ও ‘জীবনপঞ্জী’ শীর্ষক দুটি লেখা এই
বই-এর কবিতাগুলির শেষে যুক্ত হয়েছে, কবির জীবনচরিতে প্রবেশের
পক্ষে এই লেখাদুটি সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এই সূত্রেই বলে রাখি, র্যাঁবোর জন্মের শতবর্ষে লোকনাথ ভট্টাচার্যের অনুবাদে ‘নরকে এক ঋতু’
প্রকাশিত হয়েছিল। র্যাঁবোর সম্পূর্ণ গ্রন্থের অনুবাদ বাংলায় সেই প্রথম। এই বইটির
সশ্রদ্ধ উল্লেখ বারেবারেই পাই গৌতম গুহ রায়ের লেখায়। কবিতার ইতিহাসের সঙ্গে
অনুবাদের পরম্পরাকে একবার দেখে নিতে পারলে লাভ হয় বইকি। যাহোক, লোকনাথ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন
তাঁর অনূদিত বই-এর ভূমিকায়- “ কে এই র্যাঁবো? এক কথায় এ-
প্রশ্নের উত্তর দিতে বিদগ্ধ ফরাসীরাই বিপন্ন বোধ করবেন, আমি
তো কোন ছার! তাঁকে কেউ বা বলবেন দানব, কেউ বা বলবেন দেবদূত,
কেউ বা সকল গলা ছাপিয়ে নিজের গলাটিকে শুনিয়ে বলবেন—দানবও নন,
দেবদূতও নন, মর- জগতের একজন মানুষ মাত্র। ” র্যাঁবোকে
বুঝতে হলে ফরাসি সিম্বলিস্ট কাব্য, ভেরলেনের সঙ্গে তাঁর
বন্ধুত্বকে জানতে হবে বলে জানিয়েছিলেন লোকনাথ ভট্টাচার্য। ‘নরকে
এক ঋতু’ বইটি বুদ্ধদেব বসুকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। বুদ্ধদেব বসুর কবিতার ওপর র্যাঁবোর
প্রভাব নিয়ে অনেক সমালোচক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বাংলা কবিতায় র্যাঁবোর প্রভাব
দুর্লক্ষ্য নয়। আমাদের মনে পড়তে পারে কবি অরুণেশ ঘোষের কথা। এবারে ফিরি কবিতায়।
‘নরকে এক ঋতু’ বইতে দেখি কবি বলছেন- “ বার করেছি স্বরবর্ণের রং—আ কৃষ্ণ, অ শ্বেত, ই রক্ত, ও নীল, উ সবুজ- নিরূপণ করেছি প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের গতি-প্রকৃতি। আর সহজাত প্রেরণার ছন্দেই আজ আবার লালায়িত হয়েছি কাব্যিক এমন একটি সুগম ক্রিয়াপদ আবিষ্কার করতে যা একদিন-না-একদিন প্রযোজ্য হ’তে পারবে সমস্ত অর্থে। এই আমি অনুবাদের সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ক’রে রাখলাম।’’ এই কথাগুলির সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারি আমাদের আলোচ্য বই-এ গৌতম গুহ রায়ের অনুবাদে ‘স্বরবর্ণ’ কবিতাটি- “ স্বরবর্ণগুলো যেমন--/ এ- কালো, আই-লাল, ও-নীল, সবুজ-ইউ-সাদা-ই/ তোমাদের শব্দ উৎসের গোপন ঝর্নার খোঁজ ফাঁস করে দেবো এবার:’’, আবার শব্দের রসায়ন আমাদের টেনে নিয়ে যায় ‘ অভিসার’ –এ, যেখানে কবি লিখছেন- “ সেই সন্ধ্যায়—দারুণ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আবার দেখা খালাসিটোলায়/ নেশার টানে, ভাঙন বুকে এক ফাঁকেতে তাড়ির গ্লাসে সফেন চুমু/ হারিয়ে যাও সেই কিশোরের রুদ্ধবাক্ স্মৃতির ফাঁকে/ সবুজ ঘাসে, বাতাবিলেবুর গন্ধমাখা সন্ধ্যারাতে”। এই কবিতাগুলির সঙ্গেই গ্রথিত হয়েছে মূল ফরাসি কবিতা। অনুবাদক ‘খালাসিটোলা’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে বাঙালির কবিতাযাপনের এক সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরলেন। যেহেতু আমি নিজে ফরাসি জানি না, অনুবাদ কতটা মূলানুগ হয়েছে আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে ফরাসি থেকে বাংলায় রূপান্তরিত হবার পর পাঠক কবিতাগুলির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সমর্থ হবেন নিঃসন্দেহে, এটুকু সবিনয়ে জানাতে পারি। কবিতা পড়তে পড়তে কল্পজগৎ ও বাস্তবের সীমারেখা হারিয়ে যেতে থাকে। ‘শীতের স্বপ্ন’ কবিতার মত পাগল পোকাটিকে খোঁজার পালা শুরু হয় ‘দিনরাত যেটা আমাদের ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে!’’
সংকেতবাদী কবিতার ক্ষেত্রে স্বপ্ন এক বিশেষ বিষয়। চেতনার বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যে পবিত্রতাকে র্যাঁবো খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন সেখানে কালের ভূমিকা অপরিসীম। মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছা থেকে মুক্ত হয়ে সোজা উঠে দাঁড়াবার প্রত্যয়ে তিনি তাই বলেন- “ আবারও পেয়ে গেছি সেই/ কালচক্র/ সূর্য ও সমুদ্র,/ এ যেন যুগলের গোপন অভিসার।’’ (কালচক্র) সমাজের প্রচলিত বিধির সঙ্গে মানিয়ে না নেওয়া এবং বিদ্রোহের মধ্যে দুঃখকে বরণ করে নেবার যে মানসিকতা আধুনিকতার অভিজ্ঞান, র্যাঁবোর জীবন যেন তারই সাধনা। আদ্যন্ত আধুনিক হতে চেয়েছিলেন তিনি। জাদুকরের সোনার কাঠির মত যিনি ছুঁতে চেয়েছিলেন পরম সংবেদনকে, তাঁকে অনুভব করা এক জীবনের কাজ নয়। ভাষাগত দূরত্ব পেরিয়ে র্যাঁবোর ভাবনাভুবনের সঙ্গে অনেকটা পরিচয় সম্ভব হল গৌতম গুহ রায়ের সৌজন্যে, এজন্য তিনি ধন্যবাদার্হ। কবি ও কাব্যকৃতিকে বোঝার সহায়ক হয়েছে তাঁর কবিতা নির্বাচন।
“ তোমার উদ্দেশ্যে এই নাও জীবনের অভিশপ্ত পৃষ্ঠাগুলোর থেকে
কয়েকটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে দিচ্ছি,
হাত পাতো, নাও ’’- ( নরকে এক ঋতু)
সুন্দরকে নমস্কার করতে শিখিয়েছিলেন যিনি তাঁর কবিতার অনুবাদ সুন্দর না হয়ে
পারে!
…
গৌতম গুহ রায়
প্রচ্ছদ- সঞ্জীব চৌধুরী
উত্তর শিলালিপি, আলিপুরদুয়ার
মূল্য- ১০০টাকা