জলের ওপর একটি নৌকো। ছায়া সঙ্গী তার। দিগন্তে দেখা যাচ্ছে হলদে রঙের আলো। বই-এর প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে থাকি। হারিয়ে যেতে যেতে দেখি বই-এর নাম- ‘বিষাদ ও জন্মকথা’, লিখেছেন- কৃষ্ণা।
‘কবিতাকে’ উৎসর্গকৃত এই বইতে রয়েছে মোট ছত্রিশটি কবিতা। প্রথম নামকবিতাতেই দেখি কবি লিখছেন-- “কলমের মুখে বিষাদ অমৃতময় স্রষ্টা যদি/ জন্ম নেবে শ্রেষ্ঠ কবিতা।” বিষাদ এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম আশ্রয় তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষাদ এক অলৌকিক পৃথিবীর মায়া সৃজন করে আনন্দ উপহার দিতে পারে কিনা ভাবতে ভাবতে পড়তে থাকি কবিতাগুলি। ‘সুন্দরের ভিক্ষা’ কবিতার প্রথম স্তবকে গভীর অনুভব থেকে উঠে আসা উপলব্ধি ভাষারূপ পায় যেন- “ সুন্দর নিঃসংশয় ভিখারি/ নবনীতকোমল কিশোরী স্তনবৃন্তের কাছে/ দুইহাতে ভিক্ষাপাত্র প্রার্থনার মতো/ দ্রুত মূর্ছনায় সেতারের মধ্যযাম রাগিনীতে/ সুন্দর চিরভিখারি বেশে গাঢ়তর হয়”। এই কাব্যগ্রন্থে দু’একটি কবিতা বাদ দিলে প্রচলিত ছন্দে কবিতাগুলিকে ভাঙা যায় না। কিন্তু অন্তর্গত দীর্ঘশ্বাস নিজস্ব এক ছন্দে কথা বলে চলে। চোরাগতির টান পাঠক এড়াতে পারে না।
“ তোমার শব্দেরা ব্রহ্ম, ব্রহ্মাণ্ড হল
সন্ধ্যে অবকাশ
তোমার শব্দেরা অ্যান্ড্রোয়েডে,
গভীর আশ্বাস। ’’
‘সংগোপন’
কবিতার প্রথম ও শেষে এই লাইনগুলি ঘুরে ফিরে আসে। একরকম ঘোর তৈরি হয়।এই
কাব্যগ্রন্থে প্রেম এসেছে শিল্পের বোঝাপড়ায়- “ আমি অনেক কবিতার জন্মদাত্রী হতে
পারি/ যদি তোমার ওই দু’ চোখে/ বৈকালি ভ্রমণের সুযোগ পাই।’’ আমার ভ্রমণ তোমার
দু’চোখে থেমে যাবার কথা মনে হতে থাকে আমাদের। “বৃষ্টিভেজা এক দুপুরে প্যারিস
এঁকেছিলাম/ তোমার মায়াবী চোখের পাতায়।’’- ‘ক্যানভাস’ কবিতার এই লাইনটি মন ছুঁয়ে
যায়। কিন্তু প্রেমিক-প্রেমিকার যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। সরীসৃপ হয়ে বুকের ভেতর বিষ
জমিয়ে রাখাই কি নিয়তি? পলাতক স্বপ্নেরা একাকী জাগিয়ে রাখে কবিকে। চৈতন্যের ভেতরে
বৃক্ষের জন্ম হয়। যার বিবেক যত জাগ্রত, যন্ত্রণাও যে তত তীব্র। এই কবিতাগুলি থেকে
কবির চেতনালোকের আঁচ পাওয়া যেতে পারে। তাঁর কবিতাচর্চায় অনুশীলনের পরিচয় সুস্পষ্ট।
পূর্বতন কবিদের লেখার মেধাবী ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন প্রসঙ্গে। যাহোক, দ্বন্দ্বের কারণ যে ‘চিরন্তন পুরুষ’। ‘পেন্ডুলামের দোলকগতি/
জীবনভর্তি বিরোধ।’ তবু কিশোরী থেকে রাইকিশোরী হবার ইচ্ছে যায় না। ‘ও কি ঈশ্বর, জাদুকর,
কোন রঙে মাখে ছবি?/ সংশয় শুষ্ক অরণি, ও আমার কবি’ এই স্পষ্ট উচ্চারণে আমরা পেয়ে
যাই বিশ্বাসের চারণভূমিকে। বিষাদের ভেতর থেকে জ্বলে ওঠে আলো। চাঁদের শরীর বেয়ে
জ্যোৎস্না নামে। বাঁশি আর বর্ষাভিসারের যুগলবন্দী সেই আরাধিকার কথা স্মরণ করায়।
শিল্পকলা আর প্রেমকলা একসঙ্গে ক্যানভাসে এঁকে চলে আলোর গন্ধ।
“ শীতের বিকেল
বড় তাড়াতাড়ি মরে যায়
হিমের ভিতর
সাঁঝের আঁধারে ডোবে
মায়াবী আমার গ্রাম।
..........
ঘোলাটে হলুদ আলো
সামনে জ্বলছে হ্যারিকেন ’’
একসময় মধুর অন্ধকারে ঢাকা ছিল বাংলার গ্রাম। জাদুকর যেন রূপকথার ছবি আঁকত। বিজলিবাতির আলো সেই নিভৃত পরিসরকে কেড়ে নিয়েছে কি? হলদে আলোর গল্পে এক অদ্ভুত মনখারাপ থাকে। হ্যারিকেনের আলোয় কত কত মুখ ভেসে আসে। স্মৃতির সরণী বেয়ে। ছবির পর ছবি জুড়ে তৈরি হয়েছে ‘নস্ট্যালজিয়া’-র কবিতা। গ্রাম আর শহরের বদলে যাওয়া সন্ধ্যেগুলির বর্ণনার মধ্যে কবির নিভৃত অন্তর্লোকের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। এই কবিতাটির পরেই রাখা হয়েছে ‘ অ- পূর্ণ নাগরিক’ কবিতাটি। কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতায় কৃষ্ণা লিখছেন- “ আমি পূর্ণ নাগরিক হতেই পারি না/ আমি হব গোধূলির রং ছুঁয়ে থাকা স্বতন্ত্র জীবন।’’ নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা মানুষকে কীভাবে স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে দেয়, জানি আমরা। জানি কবির পূর্ণ নাগরিক হতে না চাওয়ার মধ্যে কাজ করে চলে প্রবল বিদ্রোহ। স্বতন্ত্র জীবনের খোঁজ গোধূলির রঙে কৃষ্ণাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় যে সমস্ত কবিতা, তা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে জন্ম নিতে থাকে নিজের মত এক জীবনের ইচ্ছে। ইচ্ছেদের ডাকনামে জন্ম নেয় আশ্চর্য কুহক। সব কিছু বোঝানো যায়না। অনিবার্য বিষাদ লেপ্টে থাকে দিগন্তের গায়ে। পরম সুন্দর। কবিতার মতো।
..................
বিষাদ ও জন্মকথা
কৃষ্ণা
উবুদশ, কোলকাতা
প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০১৭
প্রচ্ছদ- সোমনাথ চৌধুরী
বিনিময়- ৮০ টাকা