রৌদ্র নিয়ে বৃষ্টি নিয়ে, প্রতি বছর
সবার চোখ আড়াল
দিয়ে, প্রতি বছর
কে জন্মায়, হে
বৈশাখ,
কে জন্মায়?
কবি জয় গোস্বামীর লেখা ‘নিজের
রবীন্দ্রনাথ’ বই নিয়েই আমাদের এবারের সহজপাঠ। আলোচ্য বইটি দুটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে রয়েছে
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা পাঁচটি কবিতা। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে দুটি গদ্য। ভূমিকায়
লেখক জানিয়েছেন-- “আমার নিজের কাছে কীভাবে এলেন রবীন্দ্রনাথ, আমার বালকবয়সে—কীভাবে
একটা সম্পর্ক হল তাঁর সঙ্গে—তারপর কৈশোর তারুণ্য পার হয়ে মধ্যজীবনে পৌঁছোতে কেমন
দাঁড়াল সেই সম্পর্কের চেহারা—এখনও নিজের কবিতা লিখতে গেলে কীভাবে উদ্দীপনা পাই
রবীন্দ্রনাথের গান নাটক ছবি থেকে—এসবেরই কিছু কিছু স্মৃতি বিবরণ নিয়ে এই বই।’’ এই
বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথের নবীন সাধক রাহুল মিত্রকে।’
‘কে
জন্মায়, হে বৈশাখ’ কবিতা পাওয়া যাবে এই বই-এর শুরুতেই। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো এই
কবিতাটি পাওয়া যায় ‘ পাগলী, তোমার সঙ্গে’ কাব্যগ্রন্থে। এই বই-এর আরেকটি কবিতা
গৃহীত হয়েছে- ‘ঋণ’। ‘পাতার পোশাক’ কাব্যগ্রন্থের ‘শ্রাবণ মেঘের আধেক দুয়ার’, ‘আলো’
কবিতার সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে ‘তোমার সুরের ধারা’ কবিতাটি। এছাড়াও জয়ের আরো অনেক
কবিতাই আছে যেখানে রবীন্দ্রনাথ আছেন ভীষণভাবে, সেই কবিতাগুলি এই বই-এ স্থান পেতে
পারতো কিনা এই কথায় না গিয়ে আমরা বরং একটি কবিতার অংশবিশেষ পড়ি--
যে মেঘ তোমার কাছে সূর্যাস্ত চেয়েছে
সত্যি তুমি জানো তার মন? ’’
...
তোমার কী মেঘ দেখেও মনে পড়ল না
আজ ছিল বাইশে শ্রাবণ ?
‘শ্রাবণ মেঘের আধেক দুয়ার’ কবিতায় এক বিকেলে দুঃখ আসার কথা
বলছেন কবি। আর ‘পাগল যে তুই’ নামে অসামান্য গদ্যে লিখছেন-- “ রবীন্দ্রনাথের কাছে
যেতে হলে কষ্টের ভেতর দিয়ে যাওয়া ছাড়া পথ নেই।” অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির ওপর কবির
নিরুপায় নির্ভরতার কথা জয় ব্যক্ত করেছিলেন ‘ নিজের জীবন, বীজের জীবন’ গদ্যে।
অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়েই জয়ের নিজের রবীন্দ্রনাথ। স্মৃতির পিঠে এসে যায় বাবা, মা,
পারিবারিক জীবন। অভাবের সংসারে ‘আনন্দে কষ্টে’ মিশে থাকা ‘পরিবারের একজন’ যেন
রবীন্দ্রনাথ! ‘ নিজের রবীন্দ্রনাথ’ গদ্যে অকালপ্রয়াত বাবার কথা আসে, সোনার তরী
কবিতাটি পাঠকের কাছে নিয়ে আসে এক অনন্য অর্থ- “ প্রায় কালো হয়ে আসা আকাশের নীচে,
গাছপালা যখন সারা দিনের বৃষ্টিতে ভেজা, তখন সেই কবিতার শেষ লাইনগুলো শুনতে শুনতে
আমার মনে হয়েছিল, এই কবিতাটি আমার বাবার মৃত্যু নিয়েই লেখা। শ্রাবণ গগন ঘিরে / ঘন
মেঘ ঘুরে ফিরে/ শূন্য নদীর তীরে / রহিনু পড়ি/ যাহা ছিল নিয়ে গেল/ সোনার তরী! ’’
আমাদের প্রত্যেক পাঠকের স্মৃতির সিন্দুকে লাগে টান। সন্ধেবেলা, মফস্সল,
গলিরাস্তায় ভেসে আসে কিশোরীর গান। ভাঙা হারমোনিয়ামকে ছাপিয়ে সেই সব অপরাজিত সুর।
এই যে মনে থেকে যাওয়া কোনো মানুষ দেখা-না দেখায় মেশা, তার মূলে যে রবীন্দ্রনাথ- “
...আমার মতো শুকনো মানুষের মধ্যেও যে ভালোবাসা একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি—সে
রবীন্দ্রনাথের জন্যই। তাঁর গান আমাকে স্পর্শ করা মাত্রই তা বুঝতে পারি আজও।’’
আত্মমগ্ন উচ্চারণে নিতান্ত ব্যক্তিগত কথা বলতে বলতেই কবির
গদ্যে নতুন আলো এসে পড়ে। রবীন্দ্রনাথকে দেখার, পড়ার প্রচলিত পথের বাইরে জয়ের
চলাচল। শঙ্খ ঘোষের ‘ এ আমির আবরণ’ এবং ‘
নির্মাণ আর সৃষ্টি’ বইদুটি ধর্ম গ্রন্থের মর্যাদা নিয়ে উচ্চারিত হয় তাঁর গদ্যে। আর
কবিজীবনে বুদ্ধদেব বসুর প্রভাবের কথা জয় বহুবার বলেছেন। রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করতে গিয়ে এঁদের
সশ্রদ্ধ উল্লেখ জয়ের ভাবনা বুঝতে সাহায্য করতে পারে। ‘পাগল যে তুই’ লেখায় জয়
লিখছেন- “ গানে কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বারবার পাগলকে ডাকেন। ... সে-পাগল গান গায়।
সে-পাগল ভালবাসে। সে পাগল শিল্পী। ... সেই পাগলের রবীন্দ্রনাথ আছেন। রবীন্দ্রনাথ
তাকে বলেছেন- তুই যে পাগল সেটাই তুই জানিয়ে দিবি। ব্যস্।
আজ ও কেউ কেউ পাগল থাকতে সাহস পায়, সে রবীন্দ্রনাথের জন্য।”
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা দু’ একটি কবিতার কাছে ফিরে আসি আবার সৃজনছন্দে। ‘আলো’
কবিতার ‘ তিন’ সংখ্যক কবিতার প্রথমেই লেখা হয়েছে রক্তকরবীর কিশোরের উক্তি-- “ ওদের
মারের মুখের উপর দিয়ে রোজ তোমাকে ফুল এনে দেব।’’ এরপর কবিতার শেষ স্তবক উদ্ধৃত
করছি- “ সামলে চলো সামলে চলো/ বার্তা দিচ্ছে প্রহরীজন/ সামলে চলার প্রশ্নই নেই/
প্রেমের কাছে শাসন তুচ্ছ/ এনে দিচ্ছি প্রহরীদের / মারের মুখের ওপর দিয়ে/ তোমাকে এই
ফুলের গুচ্ছ!’’ রবীন্দ্রনাটকের কোনো একটি চরিত্রের সংলাপ জন্ম দিল নতুন একটি
কবিতার। ‘আলো’-র বারো সংখ্যক কবিতায় প্রথমেই এসেছে নন্দিনী, বিশু পাগলের সংলাপ।
কবিতার শেষটুকু উল্লেখ করছি--“ সেই যে রত্নাকর ছিল, দস্যুতা জীবিকা ছিল তার।/ আমার
জীবিকা শব্দ। ‘প্রেম’ ছাড়া শব্দ আছে আর?/ সে-প্রেমে দু-চার পংক্তি-এর বেশি অন্যায়
করিনি।/ রঞ্জন তোমার, জানি, এ-লেখাও তোমারই, নন্দিনী!’ এরপর মুগ্ধতা গ্রাস করে
আমাদের। কবিতা এখানে কবিপ্রণাম।
শুভেচ্ছা, অপরাজিত আলো
ভোর এসে জানলায় দাঁড়াল
...
দেহ পেতে রেখেছে খোয়াই
ঘাটে ঘাটে আঙুল ছোঁয়াই
শরীর আনন্দে পুড়ে খাক্
কাল ভোরে পঁচিশে বৈশাখ
এই কবিতার প্রাণ আমাকে প্রচণ্ড টানে। প্রাণবন্ত হয় কবিজন্ম।
জয় ‘আপন আর অজানা’ নিয়ে নিজের রবীন্দ্রনাথের কথা লিখে চলেন কবিতায়, গদ্যে। তার
মধ্যে আমরা নিজেকে পেয়ে যাই। মনে হয় এ যে আমাদের মনের কথা। মনের মানুষ হয়ে থাকেন
প্রাণের ঠাকুর। শুধু একটি কথাই সবিনয়ে মনে করিয়ে দেবার, আমরা যেন মনে রাখি ‘নিজের
রবীন্দ্রনাথ’ বইটি লিখছেন কবি জয় গোস্বামী। আমাদের প্রত্যেকের অনুভবের রবীন্দ্রনাথ
আছেন এটা খুব সত্য, কিন্তু সে পাঠ প্রতিক্রিয়া নিজেই শিল্প হয়ে না সবসময়।
রবীন্দ্রনাথকে নিজের করে তোলবার যে মন, অনুশীলন তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি থাকুক
আমাদের। আর সেই শক্তি আমরা পাব রবীন্দ্রনাথ থেকেই। শেষ করছি জয় গোস্বামীর ‘পাগল যে
তুই’ গদ্যের অব্যর্থ উচ্চারণ দিয়ে-- “আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ চিরকালীন সেই গাছেরই
মতো। যতদিন সভ্যতা থাকবে- থাকবেন রবীন্দ্রনাথ।’’
.........
নিজের রবীন্দ্রনাথ
জয় গোস্বামী
প্রতিভাস
প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০০৮
মূল্য- ৫০
টাকা