Saturday, 3 June 2017

পারমাণবিক বীজতলা : সৈয়দ কওসর জামাল

 

এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা, যখন প্রতিদিন শাসকের রক্তচক্ষু তীব্রতর হয়ে আমাদের সহজ জীবনধর্মকে নষ্ট করে দিচ্ছে। কুৎসা, অপবাদ, ভয়ের বাতাবরণে ধর্মের সর্বংসহা ধারণ ক্ষমতার কথা বিস্মৃত হতে বাধ্য হচ্ছি আমরা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা পদবন্ধটি কেবলমাত্র সংবিধানেই আছে বোধ হচ্ছে, মিছিল যে মানুষের মুখ,  শাসক হয়তো ভুলে যাচ্ছেন সে কথা! এমন সময় হাতে যদি এসে যায় এমন এক কবিতার বই যেখানে পেয়ে যাই সময়ের স্বর, সংকটের স্বরূপ এবং উত্তরণের পথ, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে- হ্যাঁ, কবিতা পারে। অনেক কিছু পারে। শিল্প এবং শিল্পীর ওপরে ক্রমাগত আঘাতের মধ্যেই এ উচ্চারণ মানায়- ‘ আমাদের শিল্প তবে ধর্ম হয়ে উঠুক এবার!’ কবি- সৈয়দ কওসর জামাল। কবিতার বই- ‘পারমাণবিক বীজতলা’।

‘পারমাণবিক বীজতলা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা- ‘বেদনার গান’। আমরা জানি আমাদের প্রিয় যত গান সব ‘বেদনাসঞ্জাত’। এই ধারণাটিকে নিয়েই কবিতার হয়ে ওঠা। কবি লিখছেন--“ প্রিয় গান বেদনাবিধৃত বলে বেদনামাত্রই / গান হয়ে ওঠে না কখনও’’ ; আসলে বেদনা চায় নিভৃতি। শেষে বলছেন--

“যে মানুষ আনন্দের গান গেয়ে যায়

 তা নিজের নয়, অন্যের বেদনাজাত,

 ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া দিগন্তরেখায়

 নিজেকেই খুঁজে চলে একাকী, অজ্ঞাত।’’

আমাদের মনে হয়েছে প্রথম কবিতার মধ্য দিয়ে কবির দর্শনের খোঁজ কিছুটা পাওয়া সম্ভব। সমগ্রের স্বাদ একটি কবিতা থেকে পাব, এটা নিছকই কষ্টকল্পনা তবু কবির মনকে ছুঁতে চেয়ে দু’ একটি কবিতার দিকে বিশেষ পক্ষপাত থাকতেই পারে। ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া দিগন্তরেখায় নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে কবি এসে বসেন সাদা পাতার সামনে। যে সাদা পাতা আপাত সরলতার আড়ালে তৈরি করে প্রবল প্রতিরোধ। ‘ সাদা পাতা’ কবিতায় ‘কলমের খোলা মুখ’ শব্দটির মধ্যে যৌন আবেদন কাজ করে চলে বলা বাহুল্য, ‘ সফল কবিতা এক পতাকার মতো ওড়ে পর্বতচূড়ায়’- শেষ পংক্তিতে পৌঁছে আমাদের মনে যে ছবি ভেসে ওঠে, সেখানে কবিকে মনে হয় এক অভিযাত্রী। সারা গায়ে ফ্রস্টবাইটের দাগ, শ্বাসরোধকারী প্রতিবেশের মধ্যেই জন্ম নিতে থাকেন বিজয়ী। ‘নীলকণ্ঠ’ নামে এই কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতায় কবি লিখছেন- “ নামছি অজস্র পাহাড় ঘুরে/ ঝর্ণার পাশে হাইড্রো- ইলেকট্রিক প্লুতস্বর!/ সভ্যতা এগোয় যত/ মাইন, মেশিনগান, যুদ্ধবিমানের শব্দ আরও ঘন হয়।’’ তথাকথিত প্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। প্রতিদিন প্রকৃতির মধ্যে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছি আমরা, আকাশ যেন সব প্ররোচনা বুঝেই নিজেকে নীল রঙে ঢেকে ফেলেছে। জানি অভিমানের রং নীল। এক আকাশ অভিমানে কী কবি লিখে ফেলেন- “ মানুষ বিষণ্ণ হলে আকাশে আকাশে নীল/ নীলকণ্ঠ পাখি ডাকে…’’

‘পারমাণবিক বীজতলা’ কাব্যগ্রন্থটিতে পাঠক সৈয়দ কওসর জামালকে বারেবারে খুঁজে পাওয়া যায়। এ পাঠ যেমন বিশ্বকবিতার, তেমনি এ পড়া তাঁর নিজের সৃষ্টিকেও। ‘আমিও পাঠকমাত্র এই কবিতার’ লেখাটিতে কবির বিভ্রম আর পাঠকের শ্বাস যেন অপরাহ্ণবেলায় মিশে যায়। ইতিহাস, পুরাণ মিশে থাকে এই বই-এর মর্মে মর্মে। মেধার ভিতরে আলো খেলা করে। হ্যাঁ এবং না, অতীত এবং বর্তমান, ‘আলো- অন্ধকার- অশ্রু- হিম পেরিয়ে’ কবি বিশ্বাস করেন মাঝখানে অন্য পরিসর আছে। এই পরিসরটুকু চিনিয়ে দেওয়ার কথা আমরা বলার চেষ্টা করেছিলাম আমাদের আলোচনার প্রথমদিকে। পিয়ানোর ভাঙা রিড চঞ্চল হওয়ার চিত্রকল্পে ‘পরিসর’ কবিতাটি এক অসীম সম্ভাবনার দ্যোতক হয়ে ওঠে। স্মরণযোগ্যতা যদি কবিতার অন্যতম মাপকাঠি হয়, তবে কিছু কিছু পংক্তি উদ্ধৃত করবার লোভ সামলানো যায় না। যেমন-

“ভেঙেই পড়েছিলাম, যদি না হরিণী

 হাত ধরে টেনে আনত তার এই ঝরনাটির কাছে

 নীচে বয়ে চলা শান্ত জল...

 

 জল নয়, আমি শুধু তৃষ্ণাটুকু দুঠোঁটে ধরেছি।’’ ( তৃষ্ণা)

 “যে বিষাদ মরে যায়, তারও কি এলিজি লেখা হবে/ তোমার ও মুখে? ’’

                                                ( যে বিষাদ মরে যায়)

 “ আহত মুখের দিকে/ অনন্ত মুগ্ধতাবোধ স্থির চেয়ে আছে। ’’

                                             (আর য়ু লোনসাম টু নাইট?)

 “... নশ্বর মানুষ কবে তার/ নশ্বরতা মনে রেখে স্থাণু বসে ছিল?’’ ( নশ্বরতা)

কবিতা এক অর্থে কবির আত্মজীবনী। সচেতন কবি ‘দ্বিখন্ডের আমি’ কে নিয়ে দ্ব্যর্থ ব্যঞ্জনায় লিখে চলেন দিনলিপি। শূন্যতায় ভরে উঠে নিঃস্ব হয়ে চলে যাওয়ার মধ্যে যে বোধ কাজ করে, কবি হিসেবে অন্তরিন্দ্রিয়ের খোঁজে এক সাধকের সন্ধান  পাওয়া যায়। একটি বিষয় জোর দিয়ে বলার, সৈয়দ কওসর জামালের কবিতা অভিজাত মননের অধিকারী। এ আভিজাত্য ভাবের এবং প্রকাশেরও বটে! ফরাসি সাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় তাঁর কবিতাকে অন্যমাত্রা দিয়েছে সন্দেহ নেই। নির্জন সাঁকোর দিকে একাকী জলের কাছে যে হেঁটে যায় শান্ত পায়ে, তাঁর মনের অতল রহস্য মনোরম, অগম্য। ‘অসম্পূর্ণ’ কবিতার শেষ স্তবকটি উদ্ধৃত করছি--

“লেখা অসম্পূর্ণ রেখে গেলে

 অশরীরী কোনও হাত তুলে নেয় লেখার কলম

 পাতার বাকিটা ভরে যায়...

 লেখা আর আমার থাকে না।’’

এর পর বলা বারণ। অসম্পূর্ণতা হয়ে উঠুক অনন্য অভিজ্ঞান। কোত্থেকে যেন ভেসে আসছে ছাতিম ফুলের গন্ধ!

                                 ..................

পারমাণবিক বীজতলা

সৈয়দ কওসর জামাল

প্রচ্ছদ- সৌমিত্র সেনগুপ্ত

ক্যানেস্তারা

মূল্য- ৬০ টাকা