Thursday, 30 March 2017

বিষাদ ও জন্মকথা : কৃষ্ণার কবিতা

জলের ওপর একটি নৌকো। ছায়া সঙ্গী তার। দিগন্তে দেখা যাচ্ছে হলদে রঙের আলো। বই-এর প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে থাকি। হারিয়ে যেতে যেতে দেখি বই-এর নাম- ‘বিষাদ ও জন্মকথা’, লিখেছেন- কৃষ্ণা।

‘কবিতাকে’ উৎসর্গকৃত এই বইতে রয়েছে মোট ছত্রিশটি কবিতা। প্রথম নামকবিতাতেই দেখি কবি লিখছেন-- “কলমের মুখে বিষাদ অমৃতময় স্রষ্টা যদি/ জন্ম নেবে শ্রেষ্ঠ কবিতা।” বিষাদ এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম আশ্রয় তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষাদ এক অলৌকিক পৃথিবীর মায়া সৃজন করে আনন্দ উপহার দিতে পারে কিনা ভাবতে ভাবতে পড়তে থাকি কবিতাগুলি। ‘সুন্দরের ভিক্ষা’ কবিতার প্রথম স্তবকে গভীর অনুভব থেকে উঠে আসা উপলব্ধি ভাষারূপ পায় যেন- “ সুন্দর নিঃসংশয় ভিখারি/ নবনীতকোমল কিশোরী স্তনবৃন্তের কাছে/ দুইহাতে ভিক্ষাপাত্র প্রার্থনার মতো/ দ্রুত মূর্ছনায় সেতারের মধ্যযাম রাগিনীতে/ সুন্দর চিরভিখারি বেশে গাঢ়তর হয়”। এই কাব্যগ্রন্থে দু’একটি কবিতা বাদ দিলে প্রচলিত ছন্দে কবিতাগুলিকে ভাঙা যায় না। কিন্তু অন্তর্গত দীর্ঘশ্বাস নিজস্ব এক ছন্দে কথা বলে চলে। চোরাগতির টান পাঠক এড়াতে পারে না।

 “ তোমার শব্দেরা ব্রহ্ম, ব্রহ্মাণ্ড হল

  সন্ধ্যে অবকাশ

  তোমার শব্দেরা অ্যান্ড্রোয়েডে, গভীর আশ্বাস। ’’

‘সংগোপন’ কবিতার প্রথম ও শেষে এই লাইনগুলি ঘুরে ফিরে আসে। একরকম ঘোর তৈরি হয়।এই কাব্যগ্রন্থে প্রেম এসেছে শিল্পের বোঝাপড়ায়- “ আমি অনেক কবিতার জন্মদাত্রী হতে পারি/ যদি তোমার ওই দু’ চোখে/ বৈকালি ভ্রমণের সুযোগ পাই।’’ আমার ভ্রমণ তোমার দু’চোখে থেমে যাবার কথা মনে হতে থাকে আমাদের। “বৃষ্টিভেজা এক দুপুরে প্যারিস এঁকেছিলাম/ তোমার মায়াবী চোখের পাতায়।’’- ‘ক্যানভাস’ কবিতার এই লাইনটি মন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু প্রেমিক-প্রেমিকার যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। সরীসৃপ হয়ে বুকের ভেতর বিষ জমিয়ে রাখাই কি নিয়তি? পলাতক স্বপ্নেরা একাকী জাগিয়ে রাখে কবিকে। চৈতন্যের ভেতরে বৃক্ষের জন্ম হয়। যার বিবেক যত জাগ্রত, যন্ত্রণাও যে তত তীব্র। এই কবিতাগুলি থেকে কবির চেতনালোকের আঁচ পাওয়া যেতে পারে। তাঁর কবিতাচর্চায় অনুশীলনের পরিচয় সুস্পষ্ট। পূর্বতন কবিদের লেখার মেধাবী ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন প্রসঙ্গে।  যাহোক, দ্বন্দ্বের কারণ যে ‘চিরন্তন পুরুষ’। ‘পেন্ডুলামের দোলকগতি/ জীবনভর্তি বিরোধ।’ তবু কিশোরী থেকে রাইকিশোরী হবার ইচ্ছে যায় না। ‘ও কি ঈশ্বর, জাদুকর, কোন রঙে মাখে ছবি?/ সংশয় শুষ্ক অরণি, ও আমার কবি’ এই স্পষ্ট উচ্চারণে আমরা পেয়ে যাই বিশ্বাসের চারণভূমিকে। বিষাদের ভেতর থেকে জ্বলে ওঠে আলো। চাঁদের শরীর বেয়ে জ্যোৎস্না নামে। বাঁশি আর বর্ষাভিসারের যুগলবন্দী সেই আরাধিকার কথা স্মরণ করায়। শিল্পকলা আর প্রেমকলা একসঙ্গে ক্যানভাসে এঁকে চলে আলোর গন্ধ।

“ শীতের বিকেল

  বড় তাড়াতাড়ি মরে যায়

                     হিমের ভিতর

  সাঁঝের আঁধারে ডোবে

           মায়াবী আমার গ্রাম।

            ..........

ঘোলাটে হলুদ আলো

সামনে জ্বলছে হ্যারিকেন ’’

একসময় মধুর অন্ধকারে ঢাকা ছিল বাংলার গ্রাম। জাদুকর যেন রূপকথার ছবি আঁকত। বিজলিবাতির আলো সেই নিভৃত পরিসরকে কেড়ে নিয়েছে কি? হলদে আলোর গল্পে এক অদ্ভুত মনখারাপ থাকে। হ্যারিকেনের আলোয় কত কত মুখ ভেসে আসে। স্মৃতির সরণী বেয়ে। ছবির পর ছবি জুড়ে তৈরি হয়েছে ‘নস্ট্যালজিয়া’-র কবিতা। গ্রাম আর শহরের বদলে যাওয়া সন্ধ্যেগুলির বর্ণনার মধ্যে কবির নিভৃত অন্তর্লোকের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। এই কবিতাটির পরেই রাখা হয়েছে ‘ অ- পূর্ণ নাগরিক’ কবিতাটি। কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতায় কৃষ্ণা লিখছেন- “ আমি পূর্ণ নাগরিক হতেই পারি না/ আমি হব গোধূলির রং ছুঁয়ে থাকা স্বতন্ত্র জীবন।’’ নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা মানুষকে কীভাবে স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে দেয়, জানি আমরা। জানি কবির পূর্ণ নাগরিক হতে না চাওয়ার মধ্যে কাজ করে চলে প্রবল বিদ্রোহ। স্বতন্ত্র জীবনের খোঁজ গোধূলির রঙে কৃষ্ণাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় যে সমস্ত কবিতা, তা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে জন্ম নিতে থাকে নিজের মত এক জীবনের ইচ্ছে। ইচ্ছেদের ডাকনামে জন্ম নেয় আশ্চর্য কুহক। সব কিছু বোঝানো যায়না। অনিবার্য বিষাদ লেপ্টে থাকে দিগন্তের গায়ে। পরম সুন্দর। কবিতার মতো।

..................

বিষাদ ও জন্মকথা

কৃষ্ণা

উবুদশ, কোলকাতা

প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০১৭

প্রচ্ছদ- সোমনাথ চৌধুরী

বিনিময়- ৮০ টাকা 

Saturday, 25 March 2017

এই শহরের রাখাল : কবির চোখে কবি


এই শহরের রাখালের কথা আমরা জানি। যিনি শব্দের ঝর্নায় স্নান করে হয়েছিলেন অনন্যমনা। কবিতায়- জীবনে চিরবিস্ময় তিনি- শক্তি চট্টোপাধ্যায়। বসন্ত এলেই তাঁর মৃত্যুদিন মনে পড়ে যায়। তাঁর কবিতা আর তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতা মিলে তৈরি হতে থাকে এক নতুন পাঠ। এই যেমন ‘জয়ের শক্তি’ বইটি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা কীভাবে ধরা দেয় জয় গোস্বামীর কাছে, সেই অনুভবের সঙ্গেই এই বই- এর প্রথম পর্বে রয়েছে শক্তিকে নিয়ে লেখা সাতটি কবিতা। ‘কবি কাহিনি’ কবিতাটি থেকে উদ্ধৃত করছি--

“ মদে ডোবা লোক, কবি।

           মাথা ভাসছে পিপের ওপর।

 পিপেটি সমুদ্র যাত্রী—

            যাও, ওকে পরাও টোপর।

                     ......

ফসকে পড়া শব্দ ধরে

       মদ থেকে ভেসে ওঠে লোক।

পিপেদ্বীপ। তার ওপর সে বসে কবিতা লিখছে...

        হে সমুদ্র, এই দৃশ্য ফ্রিজ করা হোক! ’’

মধ্যরাতে কোলকাতা শাসন করা শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে জয় দেখেননি, দেখেছেন কেবল শব্দের ভেতর দিয়ে-- ‘কেন না, লিখিত শব্দই, লেখকের, প্রথম ও শেষ পরিচয়।’ কবিকে নিয়ে গড়ে ওঠা এত কাহিনির বাইরে কবিকে পড়ছেন। সমুদ্র প্রসঙ্গ আবার চলে আসছে ‘দিগন্তের ধারে’ কবিতাতে--

“ আমার মাথায় গাঁথা চতুর্থীর একফালি চাঁদ

  তা নিয়ে তখনও আমি এরকমই পাগল- পাগল করতাম

  তাঁর সমুদ্রের অন্য পারে!’’

সকলেই কবি নয়, জানি আমরা। জানি সকলেই সহৃদয় পাঠক হতে পারেন না। তবে কোনও একজন কবি যখন পড়েন আরেক কবিকে, কিংবা লিখে ফেলেন কবিতা পাঠকের অনুভবের- এক আশ্চর্য ভালোলাগা তৈরি হয়। আর সাহিত্যে ভালোলাগা মন্দ লাগা যে শেষ কথা এমনটি বোধহয় একজন কবির পক্ষেই ভাবা সম্ভব! ‘কফির নামটি আইরিশ’ কাব্যগ্রন্থে শ্রীজাত- পদ্যসমগ্র শীর্ষক চার লাইনের কবিতা আছে-- “বাতাসকে দিই হালকা ধমক রোজ/ আলতো টোকায় ছাই ঝাড়ি সূর্যের/ আকাশ যখন পদ্যসমগ্র—/ আমরা সবাই শক্তি চাটুজ্যে !”

শক্তি কবিতার বদলে পদ্য বলতেই ভালোবাসতেন তাঁর পদ্যসমগ্র নামটি উঠে এল তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতার শিরোনামে আমাদের প্রত্যেকেই যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই সম্ভাবনা উসকে দেবার মধ্য দিয়ে প্রাণের প্রসারণ ঘটে গেল বইকি

এবার আমিই/ এই শহরের রাখালশঙ্খ ঘোষের কবিতায় যুবার মুখে এই উচ্চারণ মনে আছে আমাদের এই শহরের রাখাল শীর্ষক গদ্যগ্রন্থে  নিজেকে নিয়ে শক্তি নামে একটি অসামান্য লেখা আছে শঙ্খ ঘোষের শক্তির স্বীকারোক্তির সাহস, নিজেকে নিরাবৃতভাবে মেলে ধরবার চেষ্টার কথা বলার শঙ্খ লিখছেন-- “সংসারের মধ্যে, প্রকৃতির মধ্যে, তাঁর নিজস্ব ঈশ্বরের মধ্যে নিজেকে খুঁজে বেড়ানোই তবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা ’’ আত্মজীবনের মধ্যে সামাজিক সময়কে ছুঁতে পাবার এক পথ আবিষ্কার করছেন কবি শঙ্খ ঘোষ শক্তির লেখার মধ্যে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার কথা আমাদের মনে পড়ছে সুনীলের কৃত্তিবাস কবিতায় পাই শক্তির দুর্দান্তপনা’- র কথা শক্তির মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ভোরবেলার উপহার কাব্যগ্রন্থে পাই শক্তি নামের কবিতা রাত বারোটা কি দেড়টায় কবিতার খাতা খুলতেই সুনীল বাইরে তিনবার নাম ধরে ডাকার আওয়াজ পান গলা চিনতে ভুল হবার কথা নয়’ ‘… এই তো তার আসবার সময়’, কিন্তু বিভ্রম কেটে যায় শক্তি যে আর ফিরে আসবেন না এই জানাটুকু অস্তিত্বের মূল ধরে নাড়িয়ে দেয়, কবিতার কাছে ফিরে আসেন সুনীল; লিখে ফেলেন--

  শক্তিনেই, কবেকার সেই দুজনে মিলে লেখা লেখার খেলা

                হঠাৎ শেষ হয়ে গেল

   আমি চুপ করে বসে থাকি, রাত্রি ঝরে পড়ে, যেন উড়ছে

             আমাদের লেখাগুলির ছিন্ন পাতা

   আমি চুপ করে বসে থাকি, সাদা দেওয়াল, কানে তালা

              লাগিয়ে দিচ্ছে স্তব্ধতার বাজনা

   খাকি প্যান্ট ও কালো জামা, সাদা চুল, মুঠোয় সিগারেট ধরা

              শক্তি একটু একটু দুলছে… ’’

এই দোলার সামনে আমাদের চুপ করে থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই বাংলা সাহিত্যে অভিন্নহৃদয় কবি-বন্ধু বলতে এই দুজনের নাম যে উচ্চারিত হয় একসঙ্গে মধ্যরাতের নিঃসঙ্গতা ফিরিয়ে দিচ্ছে অতীতের মায়াবি উষ্ণতাকে ঘোর ভেঙে গেলে শোক থেকে জন্ম নিচ্ছে শ্লোক- কবির শক্তি’! ‘শক্তির সঙ্গে একটি দিন’, ‘টিলার ওপর থেকে শক্তিকে ডানা মেলে উড়তে দেখেছি’, ‘শক্তির কবিতা’, ‘খেলাচ্ছলে দিনগুলি’ – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই গদ্যগুলি পাওয়া যাবে আমার জীবনানন্দ আবিষ্কার ও অন্যান্য বই- পাঠক এই লেখাগুলি থেকে পেতে পারেন এক অফুরান প্রাণের শক্তিকে

পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা’ কবিতায় সমবেত যাপনের সূত্রে এসেছে শক্তির কথা- ‘হিমালয় থেকে গড়াতে গড়াতে/ প্রকান্ড বোল্ডারের মতো জেগে উঠল শক্তি।’ এই কবিতাগুলি পড়া মানে এক অভিজ্ঞতা। তারাপদ রায়ের ‘আই শক্তি চ্যাটার্জী’ কবিতার শেষ স্তবক উদ্ধৃত করছি--

জোর বাতাস আসছে শালবনের দিক থেকে,

মোমবাতিটা দপদপ করছে।

বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে, রাত বাড়ছে।

আপনি দেখলেন?

আপনি ওদিকে কোথাও দেখলেন?

কেউ বলছে,

          শক্তি, আমি শক্তি, আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়

            আই শক্তি চ্যাটার্জী স্পিকিং।’

আমরা আমাদের আলোচনায় কবিদের চোখে কবি শক্তিকে প্রত্যক্ষ করলাম। এই লেখা ও দেখা চলছেই। কবির জন্মের শেষ নেই। ‘খোলা বুকে স্বেচ্ছাচারী ভাষা’ গদ্যে পিনাকী ঠাকুর শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে বলতে গিয়ে খুব সঙ্গতভাবেই তাই  বলেন-- “যিশুর মতো কবিরও হয় রেজারেকশন। নতুন যুগে কবি- পাঠকের চেতনায় জাগ্রত হয়ে ওঠেন কবি। বারবার।”