সে ছিল এক বহুরূপী দিন। চৈত্র মাসে চড়ক পুজোর দল বাড়ি বাড়ি ঘুরতো। সংক্রান্তির ঠিক আগের দিন উৎসব যেন। বহুরূপীদের পেছন পেছন বাচ্চাদের খুশির ছুট। সারি বেঁধে হেঁটে চলা জ্যোৎস্নার পথ। হ্যাজাকের আলোয় বিশিষ্ট কোনো বাড়িতে জমাটি রূপানুরাগ। শিব-পার্বতী। পার্বতীর সস্তা পাউডার উপচে ভেসে উঠতো দাঁড়ির রেখা। বগলতলা ছিঁড়ে গেছে রঙিন নেট জামার। পাড়ার রাখাল যে জন্মাষ্টমীতে গোপাল সাজতো, কালীপূজার আগে জিভ বের করে জয় মা কালী। সারা গায়ে রং - ছাপ। গ্রামীণ পরবে অনিবার্য ছিল রূপের বৈভব। শহরেও দেখা যেত বহুরূপীদের। হনুমানের লেজের পেছন পেছন বাচ্চারা ছুটছে। পোয়াল দিয়ে লেজ বানানোর খেলা আমরাও যে খেলেছি। ঘুড়ির লেজ মনে পড়ে। রাফ খাতা ছিঁড়ে সাদা ভাত টিপে টিপে সে এক আকাশ উড়ান। জয় হনুমান সিরিয়াল হত তখন। এদিকে আমাদের কাছের হনুমান লঙ্কায় আগুন লাগানোর বদলে শ্যামল বিড়িতে দিচ্ছে এক টান। তারপর গদা হাতে বাজারে। তান্ডব নয়, হাত পেতে দিন গুজরানের আশায়। পৌরাণিক চরিত্রগুলির মূর্ত রূপের এক নিদর্শন হল বহুরূপীরা। আমরা তাঁদের শিল্পী বলিনি কোনোদিন। আমরা তাঁদের বলিনি এক অঙ্গে এত রূপ কীভাবে ধরতে পারতেন তাঁরা?
ট্রেনের কামরায় কামরায় এখনও দেখা মেলে স্কুলছুট নন্দলালাদের। খালি পা। হাতে বাঁশি। ঝলমলে পোশাকের ভেতরে ভেতরে এক ক্ষুধার্ত হৃদয়। কামরায় লজেন্সের হকার উঠলে চোখ চলে যায় প্লাস্টিকে। ভুলে যায় থেকে থেকে সে আসলে রাখাল রাজা। বহুরূপীরা কেন হারিয়ে যাচ্ছে? আসলে আমাদের বিস্ময়ের পরিধি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, মুগ্ধতারা সর্বহারা। আমাদের পোকেমন শৈশব ছোটাভিমের কার্টুন দেখেই সন্তুষ্ট থাকে। তাদের অভিভাবকরা বহুরূপীদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চায় না আর। বিশ্বায়ন আমাদের বিনোদনের স্বরূপ পাল্টে দিয়েছে। আর জীবন যেখানে জি বাংলা, বহুরূপীরা সেখানে বিলীয়মান সংস্কৃতির স্মারক হয়ে থাকবে-- এটাই স্বাভাবিক। তবে শেষ কথা বলে হয়তো কিছু হয় না। প্রতিটা মানুষ যখন এক অর্থে বহুরূপী, তখন এই আলোর রূপের মানুষদের মুখ বেশি বেশি দেখতে ইচ্ছে করে। ভাবতে ভালো লাগে আমাদের ভারতবর্ষে শ্রীরাম সাজছেন যিনি তাঁর আসল নাম মহম্মদ!

No comments:
Post a Comment