বৈশাখ
বৈশাখী নামে
যত মেয়ে দেখেছি তারা খুবই শান্তশিষ্ট গোছের। বৈশাখ বললেই রুদ্র তোমার দারুণ দীপ্তি
ব্যাপারটা তাদের নেই। না থাকারই কথা। কেননা বৈশাখ মানে তো শুধু রোদ নয়, রবি ঠাকুর। রিকশা সারা
সন্ধ্যে ভাড়া রয়েছে, শিল্পীরা
একখানে গান গেয়েই... সহশিল্পীদের অনুষ্ঠান উপভোগ করেন না। ভাবখানা এমন তিনি তো
শুনছেন! ধুতি পরার সহজ উপায় এসে গেছে। গলিয়ে নিলেই হল। হুক্কাহুয়া বাঙালির পয়লা
মানে একলা বৈশাখ। ব্রেড-বাটার ছেড়ে গরম লুচি। পিৎজা ছেড়ে সর্ষে ইলিশ। ওয়াও মোমোর জায়গায়
মাটন। সন্ধেবেলা সংস্কৃতি। রাতে অ্যান্টাসিড। পঞ্জিকা বিছানার লাগোয়া টেবিলে।
আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে বড় করুন, ছোটো করুন। পেটে চর্বি, মনে হিংসা, চুলে টাক, জিভে খিদে, চোখে লাজ, তলপেটে ব্যথা-- সব নিয়ে
বছর শুরু। হাতে লাঠি মানে সমবেত নিজস্বীর জন্য। আরেকটা কথা বৈশাখীদের কথা ভুলেও ভাববেন
না, যা দেখা যায় তা সবসময়
সত্যি হয় না। মেগাসিরিয়ালের মতো।
জ্যৈষ্ঠ
জ্যৈষ্ঠ বললেই জ্যেষ্ঠ জ্যেষ্ঠ ভাব। আমার বাবা বাড়ির বড় ছেলে এই মাসে জন্মেছেন।
আমার ধারণা হয়েছিল সব বড় ছেলেরাই জ্যৈষ্ঠ মাসে জন্মায়। ভুল ডাহা ভুল। এ মাসে
জামাইরা জন্মায়। মানে অস্তিত্ব জানান দিতে বাধ্য হয় আরকি। সিল্কের পাঞ্জাবি ভিজে
আমাকে দেখুন অবস্থা, কপালে
চুল চেপ্টে আছে। অবিরাম টেনশন। শালা- শালিদের অ্যাটেনশন, শ্বশুরের অমৃতবাণী, শাশুড়ির আঁচলবাতাস, বউ-এর নিজের ‘ঘরের মাঠে দ্যাখ কেমন
লাগে’ গোছের মনোভাব সহ্য করেও
প্রতিবার যেতে হয়। আম পাকে, লিচু পাকে, কাঁঠাল পাকে, পাখার বিজ্ঞাপন বারেবারে দেখানো হয় টিভিতে, কেননা দাম্পত্যে হাওয়া
খুব জরুরি। গায়ের কাপড় ঘাম মুছতে ব্যবহার করা হয় বলে লজ্জা নিবারণের জন্য অন্য
কিছুর কথা ভাবতে হয়। সরকার কোনও বার এই সময় গরমের ছুটি দেয় না। সামার ভ্যাকেশন যখন
খাতায় কলমে,
পাতে খিচুড়ি
কেননা বর্ষা এসে গেছে!
আষাঢ়
আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর আর পেলে সবসময় উলটো কথা বলে। আষাঢ়ের শুরুতে তেমন
ঝুমঝুম বৃষ্টি হয় না। নয়ানজুলি যৌবনে নয়, শৈশবেই আটকে থাকে। প্রেমিক প্রেমিকা ভিজবে বলে আকাশের দিকে
তাকিয়ে । ছাতার ওপর পাখির পটি শুকিয়ে যায়। পার্কে যায় পচা জলে বোটিং করতে। বাঁশি
বাজার আগেই চকাস। রাস্তায় একা ষাঁড় হেলেদুলে চলতে থাকে। রথযাত্রা আসন্ন। লটকা ঢিল
দিয়ে দেখে নেওয়া হয় বল বল খেলায় কার কতখানি দক্ষতা। রথ আর উল্টোরথে নিয়ম করে
বৃষ্টি হয়। সে বৃষ্টিতে প্যাচপ্যাচে দশা, দাগ আচ্ছা হ্যায় ভেবে সাদা জামা কালো প্যান্টে কাদার জ্যামিতি।
টিউশনের পথে অল্প স্বল্প গল্প হয়। সে হলুদ আলোর গল্পের বিষয় জানি না, সাজানো ঘটনা হতেই পারে; নিরাপদবাবু হয়ে বলা যায়
সবই ‘আষাঢ়ে গল্প’!
শ্রাবণ
শ্রাবণ মানে ভোলেবাবা পার করেগা। গ্যালন গ্যালন দুধ বাবার মাথায়।
বৃষ্টি আসে। নায়িকাদের মনখারাপ। কেননা ফাস্টফুডের দোকানগুলি অনিয়মিত বসে। লোডশেডিং-এর
উপদ্রব। ফোনে চার্জ না থাকায় চিত্ত অবসন্ন। নেতা নেত্রীদের এই সময় জনসভা না থাকায়
তারা ইউরোপে যায়। কেউ বলে আবার শিল্প আনতে গিয়েছে। স্কুলে যাবার সময় বৃষ্টি আসে না
বলে ছাত্রদের মনখারাপ। বিকেলে ওই মনখারাপ ছাড়া পায় মাঠে, পায়ে পায়ে আনন্দ ফুটবল। কাদা মাখে
শৈশব। পুকুরগুলো ভরাট হয়ে গেছে প্রায় সব। কাগজের নৌকো ভাসানোর উঠোনগুলিও যে
কংক্রিটের! রিকশা টুংটাং করে চলে কিছু। টোটো এসে গেছে তবুও যেতে যেতে পিছু ফেরার
মত রূপকথার রিক্সারা। প্রেমিক প্রেমিকা ঘনিষ্ঠ হয়ে ত্রিপলের পর্দা টেনে দিতে থাকে।
এদিক ওদিক করে জল ঠিক ভিজিয়েই দেয়। জামা কাপড় শুকোতে চায় না। ডিও-র বিক্রি বেড়ে
যায়। ছাতা হারানোর গল্পে মাথারা ঠিক মেঘ বিদ্যুৎ ভর্তি খাতা!
ভাদ্র
ভাদ্র মাসে সারমেয়রা মনোযোগ আদায় করে নেয়। ছক হিসেবে এই মাসটি শরতের
দলে কিন্তু এ মাসে বর্ষার যাই যাই ভাব তবু আছে। প্রতিবছর প্রায় বন্যা হয় এসময়। মন্ত্রীরা
বিদেশ থেকে ফিরে আকাশপথে বন্যা পরিদর্শনে বের হন। ফটোগ্রাফাররা রাজপথে ভেলা নিয়ে
কিশোরের ছবি তোলে। বাঁধ মেরামতের জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকে কিন্তু কোনও বার পুরো কাজ
হয় না। বাঁধের ওপর মানুষ গবাদি পশু নিয়ে অস্থায়ী আবাস বানায়। কুমারটুলিতে ঠাকুর
বানানোর অসুবিধা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ভাদ্র মাসে নাকি তাল পাকে। বেতাল
পঞ্চবিংশতি পড়া হয় নতুনভাবে। জন্মাস্টমী আসে। বাড়ির গোপাল স্বপ্ন দেখাতে থাকে।
শেষের দিকে আকাশ খুশি হলে ঘুড়ি ওড়ে। লাটাই এর ঘুড়ি হবার শখ নিয়ে দিন কেটে যায়।
আশ্বিন
শরৎকালে অকালবোধন করেছিলেন রামচন্দ্র। ভাগ্যিস অকালেই করেছিলেন। নাহলে বসন্ত
অব্দি ওয়েট করতে হত। যাইহোক আন্ডাবাচ্চা, সওয়া তেইশ থেকে সাড়ে চুয়াত্তর- সকলে নেত্য করে দুর্গাপূজা
ভাবতে থাকে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় দুর্গা বলার নিয়ম কিঞ্চিৎ শিথিল হয়। মহালয়ার
সকালে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র শুনতে হয়, নাহলে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। ঘুম থেকে উঠে দেখি টিভিতে দুর্গা
হিসেবে টলি নায়িকাদের। যারা প্রতিবছর পাল্টে যান। প্রণাম করতে ইচ্ছে করে না। লোভ হয়
যদি মহিষাসুর হতাম… মরতে
হলে এরকম পায়ের নিচে মরাই ভালো। রাগ করলে মেয়েদের এমনি যে ভালো লাগে তা আমরা সবাই
জানি। জাম্বো সাইজের শারদ সংখ্যাগুলো বের হতে থাকে। শিউলি, নীলাকাশ, পেঁজা তুলোর মত মেঘ, সাবঅল্টার্ন ঢাকি কাকু
ফিরে ফিরে আসে। চাঁদা আদায়কারীদের প্রতি দুচ্ছাই ভুলে যাই থেকে থেকে বারোয়ারির
মানে। কৃপণ ধনী বেড়ে চলে। মহাষ্টমীতে অঞ্জলি দিয়ে পাঞ্জাবির হাত গুটিয়ে পেটপুরে
খিচুড়ি খেতে হয়। নবমীতে আরতি। দশমীতে ভাংরা। টালমাটাল। আবার এসো মা। বাৎসরিক
দুর্গাকেত্তনের পর ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কাশফুল হালকা হতে থাকে। উৎসবের আলস্যের
মধ্যেই এসো মা লক্ষ্মী। টাকা দে মা। বউ প্যাচাল পারার চেয়ে একদিন যেন পাঁচালি পড়ে।
চাঁদের আলোয় পৃথিবীকে সব পেয়েছির দেশ বলে মনে হয়।
কার্তিক
তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ। কালীকে নিয়ে এই লাইনগুলো লেখা।
সরি কৃষ্ণকলি। ঘোর অমাবস্যা। শ্রীকান্তের অন্ধকার বর্ণনা মনে পড়ে। ইদানীং মহিলা
পরিচালিত কালীপূজার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদিকে কারণবারির জন্য সরকার ঢালাও
লাইসেন্স দিচ্ছে। আতসবাজি, রোশনাই, আর অতি অবশ্যই বুড়িমার চকলেট ব্যোম- আনন্দ ধরে না। টুনির মায়ের
পোয়া বারো। ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা… গিফট্ প্রাপ্তি। প্রেমিক প্রেমিকারাও এখন ভাইফোঁটায় সামিল
হচ্ছে। মুন্নাভাই বলে কথা! কার্তিক মাসে হিমের ছোঁয়াচ নিমের পাতায়। উৎসবের ক্ষণিক
বিরতি। ডেকোরেটার্সের জিনিস ধোয়ামোছা হয়। রেড কার্পেট গলিতে রোদ মাখে। সুন্দর
ক্রিকেট পিচ। নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে রাজনৈতিক দলগুলি এ মাসে বনধ্ ডেকে দেয়।
অগ্রহায়ণ
আগে এ মাস থেকে বছর গোনা হত। এখন বিয়ের তারিখ। ক্যাটারারের ব্যস্ততা
শুরু। সুন্দরী মেয়েদের কিছু লাগবে বলতে বেশ লাগে। কিন্তু প্রজাপতিরা কিছুই মুখে দিয়ে
উঠতে পারে না। সাধের লিপস্টিক। এ মাসেই নবান্ন। নতুন ধান্যে করি নবান্ন বলে চালকলা
খেয়ে জীবনানন্দের কবিতা। চালের দামে হেরফের হয় না তেমন। শীত আসছে শীত আসছে হালকা
ঠাণ্ডায় কাঁথামুড়ি। ঝালমুড়ি চলতেই পারে। বাড়ির ফ্যানে কাপড় জড়িয়ে রাখা। ধুলো লাগবে
যে। ধনধান্যে পুষ্পে ভরা এ মাসের থিম সং।
পৌষ
কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ। তবে এটা জানা যে ক্রিসমাস পৌষ মাসেই হয়।
বড়দিনে চা,
মুড়ি আর
কেক। বড়দিন থেকেই ইংরেজি নববর্ষের দিন গোনা শুরু, ফলে বাংলা তারিখ অত মনে থাকে না।
দেবেন্দ্রনাথের কল্যাণে পৌষমেলা, শান্তিনিকেতন। দেহতত্ত্বের গান শুনতে শুনতে ভাবে বউ যদি ঠিকমত
সাধনসঙ্গিনী হতে পারত, তবে...
তবে কী ‘মাসিমা মালপোয়া খামু’ বলে ভানুর প্রবেশ। অবশ্য
এখন মাসিমা বলার চল নেই তেমন, বউদি নয় কাকিমা। বনভোজন মরশুম শুরু হতে থাকে। বন্যেরা বনে
সুন্দর। এদিকে পাড়ায় পাড়ায় যে মাইক বাজিয়ে পিকনিক, তার আবর্জনা বাঁশি বাজিয়ে গাড়ি
নিয়ে যায় বলে কুকুরদের খাদ্য সমস্যা। যাহোক এ মাসে কারও প্রতি রাগ পুষে রাখতে নেই।
নিউ ইয়ার মস্তি পুরো জমে ক্ষীর!
মাঘ
মাঘের শীতে নাকি বাঘে কাঁপে। লেপের বদলে কেউ কেউ বাঘমার্কা কম্বল গায়ে
দেয়। যেমন স্লিম, তেমন
সেক্সি। ঠাণ্ডা জাঁকিয়ে পড়ায় চায়ের দোকানে বিক্রি বেড়ে যায়। ট্রেনে মোজার গন্ধে করিডরে
হাঁটা যায় না রাত্রে। স্নান করা নিয়ে প্রচুর মানসিক প্রস্তুতি নেবার পর এক মগ জলে
এক জীবনের স্নান সম্পূর্ণ হয়। মেয়েদের যে ঠাণ্ডা লাগে না সরস্বতী পুজোর দিন সবচেয়ে
ভালো বোঝা যায়। মুখে হলুদের আভা, অনভ্যস্ত আঁচল, মোবাইলপাণি। চাঁদা তুলে পাড়ায় পাড়ায় সরস্বতী পুজো করবার
রেওয়াজ কমে গেছে। ফেসবুকীয় ঢঙে দেবীবন্দনা লাইক করুন, শেয়ার করুন, প্রেম-প্রতিহিংসা-লাভ-লোকসানে
মনে রাখবেন ‘
এক মাঘে শীত
যায় না’।
ফাল্গুন
একে তো ফাগুন মাস, দারুণ অসময়। হাওয়ায় হাওয়ায় মন উতলা আকুল। ওড়না যদি উড়তে উড়তে
গাছে চড়ে বসে গল্পের মতো, দোষ তবে কার? কেন... কৃষ্ণচূড়া- রাধাচূড়ার! শীতবুড়ি চলে যাওয়ায় মন বেশ
ফুরফুরে। মদনদেব বাণ মারেন। সে বাণে ধরাশায়ী কিনু গোয়ালার গলিতে থই থই রোদ্দুর।
ধুলোর বুকে আলোর কোলাজ। জলতরঙ্গ। বিবাহবাসর। প্রজাপতি এ মন। আরেক ফাল্গুন ভাষা
দিবস। আ মরি বাংলা ভাষা। ছেলে ইংরেজি মাধ্যম। ম্যাডাম বলেছেন আমার সোনার বাংলা রবি
রক গাইতে...
চৈত্র
স্লগ ওভারে বসন্ত। সাইকেলের সামনে যে বসে থাকে তাকে নিয়ে কোথাও পৌঁছুতে
ইচ্ছে করে না। শুধু চলতে থাকার ইচ্ছে সাহস যোগান দিচ্ছে। রঙ মাখাতে গিয়ে প্রথম
স্পর্শের কথা বাঙালি ভোলে না কোনওদিন। রঙ খেলা যায়, কিন্তু রঙ তুলতে বড্ড চাপ। গলা
শুকিয়ে যেতে থাকে সঙ্গে ঘুম ঘুম নিঝুম দুপুর। স্নান সেরে আয়নায় মুখ দেখতে গিয়ে কি
মনে হয় না এই এবড়োখেবড়ো রঙ থাক বরং ? কেউ থাকে না। হাওয়া, লাটাই, বাইসাইকেল, ঘুড়ি, পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার গল্পের মধ্যেই
হারিয়ে যেতে থাকে একটা গোটা বছর। চৈত্র সেলে সরগরমে, হিসেব খাতার রোজনামচায় আবার আরেক
নতুন বছর শুরুর অপেক্ষা।
কে না জানে
অপেক্ষারা সবসময়ই সুন্দর।
No comments:
Post a Comment