স্মৃতির থেকে একমুঠো দিন জন্মদিনে ঢেলে সাজালে
সবাই মিলে বসে থাকতুম,
তোমায় ঘিরে বৃদ্ধজাতক!
(জন্মদিনে/ শক্তি
চট্টোপাধ্যায়)
বেঁচে থাকলে আমরা সকলে
মিলে কবির পঁচাশি বছরের জন্মদিন পালন করতাম। ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে ভরে থাকত ছবি, কবিতা। কবিদের মৃত্যু হয়
বিশ্বাস করি না। কিন্তু শারীরিক উপস্থিতি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করব এমন সাধ্য যে নেই।
মনকেমনের মন্দে-ভালোয় ‘পদ্যসমগ্র’-র পৃষ্ঠা উল্টে চোখ আটকে যায় একটি কবিতায়—
হলুদ শস্যের মধ্যে হাত পেতে রয়েছে দাঁড়িয়ে
একা লোকটি,
হাত পেতে দাঁড়িয়ে রয়েছে,
হলুদ শস্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে
সারাদিন।
অন্নপূর্ণা,
অন্ন দাও- ব’লে সেই যোজন বিস্তৃত
মাঠে, একা
দাঁড়িয়ে রয়েছে।
পূর্ণ হয়ে যায় তার শূন্য করতল--
একা লোকটির দাঁড়িয়ে থাকার ছবি আর শূন্য করতল
পূর্ণ হয়ে যাওয়ার দার্শনিক অনুভব মিশিয়ে কবিতাটি একটি প্রার্থনাকে জাগিয়ে রাখে।
আধুনিক কবিতার প্রেক্ষিতে কীভাবে ধরব তাকে? আধুনিক বাংলা কবিতার টেকনিকসর্বস্ব হয়ে
ওঠার প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। ত্রিশের কবিদের পাশ্চাত্যমুখীনতার
বিপ্রতীপে পঞ্চাশের কবিদের ঘরে ফেরার তুমুল ইচ্ছে নব্য-আধুনিকতাকে সূচিত করেছিল।
শক্তির কবিতায় অবনীকে কবির অন্তর্গত সত্তা হিসেবে ধরা যেতেই পারে। কিন্তু বহুভাবে
চেনা বাড়ি যে মেলে না আর। যেমন আমরা পড়েছি ‘কিছুতে মেলেনি’ কবিতায়। আশ্রয়ের খোঁজ
যেমন কবির নিজস্ব, তেমনি অসুখের অনুভবও। ‘বলো, ভালোবাসা’ কবিতার প্রথম পংক্তিটি এরকম—‘এই হাসপাতালে এসে দেখি শুধু আমার
অসুখ।’ কবিতাটি শেষ অংশটুকু এরকম—“বলো, ভালো আছো আর তোমার
অসুখ সেরে গেছে/ বলো, ভালোবাসো তাই তোমার অসুখ সেরে গেছে।”
যুক্তিটি লক্ষ্যণীয়। আমাদের মনে পড়ে অশ্রুকুমার শিকদারের একটি লেখার কথা, যেখানে তিনি বলছেন-- “আধুনিক কবিতায় যেমন থাকে, তেমনি
আয়রনি আমরা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় পাই না, পাই না
নাট্য লক্ষ্মণ। কবিতার বক্তা ও কবির মধ্যে গড়ে ওঠে না কোনো দূরত্ব। শক্তির কবিতা
সরাসরি কবির স্বরূপের কবিতা; এই কবিতাগুচ্ছের শ্রেষ্ঠ
মুহুর্তগুলিতে অবশ্য তিনি উত্তীর্ণ হন ‘ব্যক্তিগত আমি থেকে আত্মগত আমিতে।’
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার রাজনৈতিক উপাদান
নিয়ে তুলনামূলকভাবে আলোচনা কম হয়। আপাদমস্তক রোম্যান্টিক আজন্ম স্বেচ্ছাচারী
কবিসত্তাকে প্রায় মিথে পরিণত করে দিয়ে আমরা কি ভুলতে বসেছি ‘সকলে প্রত্যেকে একা’
কাব্যগ্রন্থের ‘নৈরাজ্য,
প্রতীক যেন’ কিংবা ‘যে হিবরুগান তুমি’ কবিতাকে? ‘অপরূপভাবে ভাঙা, গড়ার চেয়েও মূল্যবান/ কখনো-সখনো’
কিংবা ‘প্রতিষ্ঠান ভেঙে যায় বহুদিন সুসময় লেগে’—এই পংক্তিদুটির মধ্যে কি অন্য অন্তর্ঘাতী
অভিঘাত নেই? আসলে কবি ও কাঙালের যন্ত্রণার পথকে আমরা আদৌ
ধরতে পারিনি। অসুখের একমাত্র উপশম যে ভালোবাসা আকাশের মতো ব্যাপ্ত। আধুনিকোত্তর
ভোগসর্বস্বতা দিয়ে তাকে বুঝতে পারা সম্ভব নয় কখনোই। আমাদের জীবনের সম্পর্কেরা যে
দুঃখ দেয়, তাকে আগলে রাখার মন আছে আমাদের? জানি না। এটুকু জানি, সারাজীবন ধরে একটি কবিতাই
লিখতে চেয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সে কবিতার নাম কি হতে পারে সেটা ভাবি
মাঝেমাঝে। কখনও মনে হয়—‘সকলে প্রত্যেকে একা’, কখনও মনে হয়-
‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’। সংসারে সন্ন্যাসী ছিলেন যে মানুষটি তাঁর কবিতা লেখা
ছাড়া যে আর কোনো উপায় ছিল না। কেননা কবিতা ‘নিজেকে নিজের মত করে দেখার জলজদর্পণ
এক’। অথচ—“কোনো প্রেরণা না, কোনো সনির্বন্ধ ভালোবাসায়
না—শুধুমাত্র চ্যালেঞ্জ-এর মুখোমুখি এসে এইসব পদ্য লেখা”। এক অভিজ্ঞতা থেকে আরেক
অভিজ্ঞতার যাত্রাপথ যেন ধরে রাখা কথায়-কবিতায়। যেখানে সংশোধনের কোনো তাগিদ নেই,
কেবল আছে আত্মপ্রকাশ আর আত্মানুসন্ধানের দুর্মর সংরাগ। শক্তি
চট্টোপাধ্যায় ভীষণভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন প্রেমে-অপ্রেমে, আবেগে-আশ্লেষে,
ভিতরে বাহিরে, দুঃখে অ-সুখে। অস্তিত্ববাদী
কবিকে আমাদের জন্মদিনের প্রণাম। ফিরে পড়তে চাই অমোঘ পংক্তিগুলি--
…বাঁচতে চাই, বেঁচে থাকতে চাই
শুধু বাঁচা, অহরহ মৃত্যুর ওলোটপালোটের
মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই, শুধু বাঁচতে চাই।
No comments:
Post a Comment