Friday, 4 October 2019

পুজো ভালোবাসা



মহালয়া

মহালয়া মানে ভোর

শিউলি কুড়নো ফ্রকের আঁচল তোর!

 

আমাদের রুগ্ন রেডিও এই দিনটায় সবার মনোযোগ আদায় করে নিত।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত গলাতে মনে হত কিছু বিস্ময় এখনও বাকি, রহস্যটাও!

 

বাজলো তোমার আলোর বেণু

সকাল বলে দিত মা আসছেন।                               

পরদিন অঙ্ক পরীক্ষার সিঁড়িভাঙা ধাপগুলো আকাশে ছড়ানো...

মেঘেদের মন, ও মেয়ে তুমি কিছু জানো?

 

ষষ্ঠী

প্রতিবারের মত এবারেও গম্বুজটা একদিকে হেলে গিয়েছে।

ঠাকুর এসেছে কতক্ষণ...

অস্ত্র অবশ্য আসেনি, পরে আসবে।

ঠাকুরকে এখনও ঠিক ততটা ঠাকুর বলে মনে হচ্ছে না।

পুজো হয়নি যে!

 

সন্ধে ঘনাচ্ছে। ঢাক বাজলো। আলোলিকা।

তুমি যেখানে যেখানে ছুঁয়েছো, সেখানেই বোধন!

 

 সপ্তমী

সকালের রোদ বলে দেয় আজ...

ক্যারাম পিটিয়ে যাচ্ছি কনফার্মড হচ্ছে না।

ঠাকুরমশাই পুজোর উপকরণ খুঁজে পাচ্ছেন না।

আর আমি পাচ্ছি না তোমাকে।

তুমি তো ঘুরতে এসেছো, কাকে বলবো কাকে?

 

দুপুর এখন মাইক বাজাচ্ছে পুজোর গান

তুমি আসছো, ভালোবাসছো, ও সর্বনাম!

 

 অষ্টমী

 সকাল সকাল স্নান সেরেই পাঞ্জাবি...

উপোস শুনলেই খিদে পেয়ে যায় তবু

বছরে তো একটা দিন।

কখন অঞ্জলি হবে বুঝতে পারছি না

লাল সাদা ঢাকাই-তে সে এলো

বড্ড অসুর হতে ইচ্ছে করলো।

সারাজীবন শুভদৃষ্টি, অস্ত্রাঘাতে- রক্তপাতে-

 

ফুলটা পা অব্দি পৌঁছুবে না জানতাম।

কোথায় গেল আমি আর দেখিনি।

কেননা উপোস আর নেই।


জয় মা জয় মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী।

 

নবমী

নয় নয় করেই নবমী আসে

বিষণ্ণতার খুশি ছায়া ফেলেছে আকাশে।

রোদটা কম, মাইকের আওয়াজটাও অভিমানী

রাত ফুরোলেই ভেসে যাবে, জানি।

 

আরতি হচ্ছে। ভোগের।

তুমি সেই দূরে দাঁড়িয়ে আছো যেখান থেকে সব দেখা যায়,

কিন্তু অন্য কেউ...

 

মনে মনে আগুন নিয়ে বলি-

ওগো নবমী নিশি না হৈও অবসান!

 

দশমী

সকাল থেকেই গভীর আঁধার নেমেছে, জানা...

আজ দশমী, বিষাদ, সানাই...

 

একে একে নিভিছে দেউটি। ফিরে যাচ্ছে আলো, তাঁবু, চেয়ার...

ঠাকুরের মুখে হাসি নেই।

অস্ত্র নেই কোনও। মুখে পান।

অসুরের পা নিয়ে শিশুর প্রণাম!

 

তুমিও এসেছো, সিঁদুর ছুঁয়েছে দুই গাল

আমি যে মনকে বলি-- সামাল সামাল।

 

অপেক্ষা করবোই, তুমি আসবে বললে যেই-

সেই তো জেনে যাওয়া ভালোবাসার বিসর্জন নেই!

Sunday, 22 September 2019

বিনায়কের কবিতা

      

ঠিকানা পেয়েই হোক, বা নিরুদ্দেশে

বাজারের গায়ে বাজার লেগেছে এসে...

তবু যদি দাঁড়িপাল্লা ছুঁয়ে না দেখে

তোমার কোলেই আজীবন মাথা রেখে

এই বসন্তে মরতেই চাই তবে;

তোমাকে কি আরও বেশি টাকা দিতে হবে?

                                                   বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জোছনা থেকে জুয়া’ কাব্যগ্রন্থের ‘বসন্তের চিঠি বসন্তসেনাকে’ কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে শুরু হল আমাদের এই লেখা। কবি ও কবিতার আলোচনায় দশক বিভাজনে পুরোপুরি আস্থা না রেখেও বলা যায়, নব্বই-এর কবি বিনায়কের কবিতা ছুঁয়ে থাকে আমাদের বদলে যাওয়া জীবনের গলি থেকে রাজপথ। ‘রিকশা নয়ত রূপকথা’ শুধুমাত্র কবিতার বইয়ের নাম হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে অব্যর্থ সময়ভাষ্য। এ.সি ঘরে বসে পিৎজা খেতে খেতে রাষ্ট্রকে যারা একমাত্র শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল অনতি অতীতে, দশক পেরিয়ে আজও তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সমান ক্রিয়াশীল। কবি ‘‘বসন্ত বিলাপ’- এর অনুপকুমারদের থেকে সাবধান’ (৩ মার্চ ২০১৯, ‘সংবাদ প্রতিদিন’) লেখায় সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন তুলেছিলেন যদি প্রাক্তন সর্বহারা বিপ্লবীরা  গগনচুম্বী অট্টালিকা থেকে মেহনতি মানুষের  জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে স্টেটাস দিতে পারেন, তবে ছাপোষা একজন লোক বাজার থেকে চারাপোনা আর পালং শাক কিনে ‘ I stand with Indian Army’ বললেই দোষ? – “‘তুমি’ বললেই যেটা ‘বিপ্লব’, ‘আমি’ বললেই সেটা ‘প্রতিক্রিয়া’ হয়ে যেতে পারে না তো!” লেখা কোনোদিন নিরীহ কাজ নয়। সচেতনভাবেই হোক কিংবা অচেতনভাবে, লেখা হল মতাদর্শগত কর্ম। রাজনৈতিক তো বটেই। শিল্পীর সচেতন অবস্থান সনাক্ত করাই আমাদের কর্তব্য। ‘কী বদলালো’ কবিতায় যেমন পাচ্ছি—

সকালবেলা টকটকে লাল

বিকেল হলেই ঘন কালো

রক্ত কেবল প্রশ্ন করে

“ বলো আমায় কী বদলালো?”

মরিচঝাঁপি, বানতলার উল্লেখ পাচ্ছি এই কবিতায়। শেষ হচ্ছে এইভাবে—

স্বীকার করি আমি খারাপ

মেনে নিলাম তুমিই ভাল;                                                              

আমায় মেরে ফেলার পরে

জানিও শুধু কী বদলালো?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে পালাবদল প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। পরিবর্তনের সমর্থনে বুদ্ধিজীবীদের সোচ্চার ঘোষণাও মনে পড়ে আমাদের। দিনবদলের গান আমাদের ভালো রাখতে পারেনি। স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের মধ্যে হাইফেন হয়ে থেকে গেল সময়। ক্ষমতার বৃত্ত নিজের মধ্যে কীভাবে টেনে নেয় বিবেকের স্বর, তা নিয়ে নতুন করে না বললেও চলে। কবিতার সূত্রে অনিবার্যভাবে চলে আসে আরেকটি কবিতা। বিনায়কের ‘দাঁড়াচ্ছি দরজার বাইরে’ কাব্যগ্রন্থের ‘সিস্টেম’ কবিতার শেষের দুটি লাইন মনে পড়ে--

       রমাকান্ত কামার--

       তোমাকে যদি উলটে দিই তবুও তুমি রমাকান্ত কামার?

 

(২)

 

কবির রাজনৈতিক অবস্থানের সূত্রে সাংস্কৃতিক রাজনীতির স্বরূপকেও বুঝতে চাইছি আমরা—

মাংসখণ্ড ছুড়ে দিলে, কাক- কোকিলে ভিড় জমাবে

সেই ভিড়ে যে শিল্প খুঁজছে, সে-ই কি শিল্পী? সেও কি কোকিল?

‘সাফ কথা’ কবিতা থেকে কবির বিশ্বাসের সত্যকে চিনে নেওয়া সম্ভব—

চাই না মুকুট, চাই না গাড়ি

কিংবা ঘুষের টাকায় বাড়ি...

গুরুর মন্ত্র দিনরাত্তির বাজছে কানে;

 

একটা দণ্ডি, একটা ঝোলা

পথই আমার বাবা ভোলা

ভালবেসে টানছে কেবল শ্মশানপানে...

 

জন্মভূমি নিলাম করে, নগদে বখশিস নিল যে

         ঘেন্না আমার, হাত থেকে তার

                          আমায় বাঁচায়;

স্কটল্যান্ডের ঝর্না আমি দেখিনি তাই দেখতে চাই না

পুড়তে পুড়তে আমার শরীর গঙ্গাকে চায়!

কবির উপন্যাসকে যদি দেখা যায় কবিমনের সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে, তবে অবশ্যই আসবে ‘মন্ত্র’ আখ্যানের প্রসঙ্গ। ঠাকুর শ্রীশ্রী দুর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেবের শিষ্য বিনায়ক জীবনকে যেভাবে দেখেন ও দেখান, তার মূলে থাকে ভারতীয় দর্শনের সার্থক উত্তরাধিকার। বিশ্বায়ন যখন কেড়ে নিচ্ছে আমাদের প্রজন্মবাহিত স্মৃতি ও সংস্কারকে, প্রগতিশীলতার নামে উদ্বাস্তু করতে চাইছে বিশ্বাসের মাটি থেকে; সেসময় বিকল্প স্বর হিসেবে বিনায়ক তুলে আনেন প্রতিরোধের বয়ান। পুরাণের নবনির্মাণে চমৎকৃত হই আমরা। ‘অন্ধকারে তুমিই বিগ্রহ’ কাব্যগ্রন্থের ‘হনুমান’ কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করছে— “ চোখ বিঁধলেও তুমিই বেরোতে, জিভ কাটলেও তুমি/ শ্মশান যেখানে স্থাপিত সেও তো আমারই জন্মভূমি...”।

 

(৩)

 

বিনায়কের কবিতায় প্রেম ও অপ্রেমের দ্বন্দ্ব বড়ো জায়গা জুড়ে আছে। ‘জোছনা থেকে জুয়া’ কাব্যগ্রন্থের ‘বিষণ্ণ বৈভবে’ কবিতায় লিখছেন— “সকালের পুজো, সন্ধ্যার ধান্দায়/ মিশে যেতে যেতে সে আমাকে বলে যায়,/ ভালবাসা মানে জানলা না-ছোঁয়া হাওয়া/ যাকে ভালোবাসি, তার কাছে রেখে যাওয়া।” হাওয়া এবং চাওয়ার কথা পাই ‘থামো’ কবিতাটিতেও— অনবদ্যভাবে বলছেন—“ ভিতরে তাই ঢুকিনি আর থেকেছি রাস্তায়/ নরক জানি, আদর পেলে তীর্থে পাল্টায়/ পাল্টায় না বিগ্রহই, মাটি কিংবা সোনা/ নাই বা ভালবাসলে তুমি ঘেন্না ছড়িয়ো না...”।  বিনায়কের কবিতা ভালোবেসে এই নশ্বর জীবনকে ছুঁয়ে অবিনশ্বর হয়ে ওঠে--- “ তুমি বাটা খেয়ো, ভাজা খেয়ো, আইওয়ায় আমি রাঁধছি শুনে যে ঢ্যাঁড়শ- পোস্ত খেতে চেয়েছিলে, পারলে তাও খেয়ো। পুরনো ইচ্ছেটাকে আমি অন্তরে রূপ দিলাম, তুমি অন্তরে গ্রহণ করে দ্যাখো, পৃথিবীতে অতিকায়, দানবীয়, কংক্রিট কিচ্ছু নেই, সব এই পোস্তর মতো ছোট, দানা দানা, মায়াময়; ভালবাসায় টসটস করছে...”।

 

 

    বিনায়কের কবিতায় প্রেম-রাজনীতি-সমকাল এমনভাবে জড়িয়ে থাকে মায়ার বন্ধনে, সবসময় আলাদা করা যায় না বিষয়ভিত্তিক। ‘গ্রাম- শহর’ কবিতার মধ্যে যেমন মধ্যবিত্তের দ্বিচারিতার ছবি স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়েছে—

গ্রামে কিছু জটিলতা আছে

শহরে শীতের মজা

          একদম সরল;

বাবা-মা’কে ওল্ড এজ হোমে রেখে এসে

শরণার্থীদের দুঃখে,

                  ছেলের দু’চোখ ভরা জল।

‘ফেসিয়াল’ কবিতায় পাচ্ছি—

শিখিয়েছিলে কতটা ভারে ঠিক কতটা ধার/ বারান্দায় কুষ্ঠরোগী, ঘরেই পার্লার।

কবিতা হয়ে ওঠে অনেকার্থদ্যোতক। যা কিছু অন্তঃসারশূন্য, মিথ্যে, ঠুনকো; চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন কবি নিজস্ব কাব্যশৈলীতে। ভাষার জটিলতা যেখানে বিষয় থেকে বিচ্যুত করে না পাঠককে। জনপ্রিয়তার নন্দনতত্ত্ব দিয়ে বিনায়কের কবিতার বিশ্লেষণ পুরোপুরি সম্ভব নয়। তাঁর লেখায় অন্তর্ঘাতের প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ‘নিজের বিরুদ্ধে যাওয়া চাই’ উচ্চারণ ভাবিয়ে তোলে আমাদের। ভাবিয়ে তোলে এই বিনাশী, অস্থির সময়েও কবির সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি। যেমন- ‘তবুও’ কবিতাটি-- 

 

তবুও

 

অতবড় ব্ল্যাকবোর্ড

সাদা হয়ে যায়

 

ছোট্ট একটা চকের ছোঁওয়ায়

 

আর কিছু বলার নেই। থাকতে পারে না। শিল্প সার্থক হলে মানুষ যে ভাষা হারিয়ে ফেলে!

Thursday, 22 February 2018

উত্তরজনপদবৃত্তান্ত : লোকায়ত চিরকালীন জীবন

 “মাইল মাইল দিগন্তের ভিতর, দিগন্ত পেরিয়ে আরো আরো দিগন্তের ভিতর, নদীঘেরা মানুষঘেরা অরণ্যঘেরা গানঘেরা বাজনাঘেরা জীবনের অনন্ততা ছুঁয়ে কোথাও কি যাবার থাকে মানুষের! প্রশ্ন নয়, প্রত্যাশাহীন সংশয় হয়ে কবে কার কতকালের জীবন যেন মায়াকুহকময়তায় জীবনেরই বন্দনাগান।... আবহমানের আবহমানতায় চিরসত্য হয়ে জীবন যেন নুড়িভাষা নদীর অঞ্চলকথার অত্যাশ্চর্য চোরাটান।’’- কবি সুবীর সরকারের সাম্প্রতিক গদ্যের বই ‘উত্তরজনপদবৃত্তান্ত’ পড়তে গিয়ে শুরুতেই উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করল লেখকের ‘টরেয়া’ শীর্ষক একটি লেখার অংশ। কবির গদ্য পড়তে হলে কিছু কবিতা অনিবার্যভাবেই চলে আসে অনুভবের উঠোনে। যেমন- ‘বৃত্তান্ত’

                         বৃত্তান্তে যাবো না বরং গন্তব্যে

                                   পৌঁছই

                         ফের নীরবতা।

                         উনুনে গুঁজে দেব

                                  টুপি

‘দোয়েল’ নামের একটি কবিতা পড়ছি পড়ার আনন্দেই-

                    ভাঙা দেওয়ালে পা। দেওয়ালে দোয়েল বসে

                                        থাকে

                    কত কত জন্মের পুলক!

                    ভরসন্ধ্যেয় পালকি এসে

                              থামে

আমরা জানি নব্বই দশকের কবি সুবীর সরকার জীবনে ও যাপনে ছুঁয়ে থাকেন উত্তরজনপদ। আঞ্চলিক ইতিহাস, লোককথা থেকে তুলে আনতে চান অন্তহীন বাঁচার রসদ। যে বাঁচা নাগরিক মধ্যবিত্তের নয়। যেকোনো একরৈখিক ধারণাকে নস্যাৎ করে বহুমাত্রিক অনুভবেই তিনি খুঁজতে চান বাতাসের ভেতর আরোগ্য। স্বপ্ন দেখেন সাদা ঘোড়া, কবিতাগ্রাম এবং রবিশস্যে ভরা খামারবাড়ির। ‘কত কত জন্মের পুলক’- কে পেতে হলে এক জীবনে কী করতে হবে মানুষকে?

মধ্য হেমন্তের নরম রোদের মধ্য দিয়ে কইকান্তের হন্তদন্ত হেঁটে আসার সূত্র ধরে আখ্যান শুরু হয়। রাধাকান্ত, কইকান্ত, ফণিমোহনের বন্ধুত্ব- পরবর্তী প্রজন্মে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে আত্মীয়তা পাতাবার তাগিদ আমাদের আখ্যানের সময়কে নিজের মত করে গড়ে নেয়। সন তারিখ দিয়ে এই সময় বোঝা যায় না। বিহান বেলার রোদে আলস্য মাখতে মাখতে আমরা পাই কইকান্তের গৃহিণী নন্দরাণীর কথা। উত্তরাঞ্চলের এক ভরা সংসারের কর্ত্রীর কাজের ফাঁকে নিজের আসামের বাড়ির কথা মনে পড়ে। আসে আবহমান হাতিমাহুতের গান -  “ ও মোর গণেশ হাতির মাহুত রে/ মোক নিয়া যান বাপ ভাইয়ার দেশে।’’ স্মৃতি থেকে ‘সংসারের বাস্তবতার দৈনন্দিনতায়’ ফিরতে হয় তাকে। এই ফেরা না ফেরার সূত্রে পাই রাধাকান্ত কিংবা সোমেশ্বরীকে। পুরোনো দেশকালের গল্প জুড়ে বিষণ্ণ সন্ধে নামার প্রসঙ্গে সচেতন পাঠক লক্ষ্য করতেই পারেন সময়ের চলনকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর সন্ধে—চরিত্রেরা পাল্টে যায়। প্রসারিত হতে থাকে দীর্ঘশ্বাসের ডালপালা—“ হালকা কুয়াশায় স্মৃতির স্তরে স্তরে ফেলে আসা সময়ের মহার্ঘ্য টুকরোগুলি কিছুতেই কিন্তু জোড়া লাগে না।’’  

সোমেশ্বরীর বাবা হরমোহন ছিলেন জোতদার। সোমেশ্বরী বাল্যস্মৃতির কাছে আকুল হয়ে পেতে চায় আশ্রয়। কিন্তু... সে জানে তাকে ফিরতে হবেই মাছের ঝাঁকের কাছে- “ হায় রে জীবন! আদিগন্ত এক মানব জীবন।’’ বদলে যাওয়া জীবনের অসহায়তার কথা বারেবারেই তুলে আনেন লেখক। বাতাসের ভেতর আরোগ্য খুঁজতে চেয়ে হয়তো গাড়িয়াল গান তোলে চরাচরের বুকে। যেখানে গদ্য থেমে যায়, গান আসে সেখানে। কিংবা যেখানে গান থামে, সেখানে নিস্তব্ধতা নামে। একটা নিম কাঠের দোতরা চোখের শূন্যতার মিশে যেতে থাকবার ছবিতে বুঝতে পারি এই গদ্য কেবল একজন কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব। কুশাণের পালা, মঞ্চ জুড়ে বহুবর্ণিল গীতিময়তার মধ্য থেকেই মানুষ খুঁজে নিতে থাকে হয়তো জীবনের রসদ- “ ঘরবাড়ি বিভ্রমের শিশিরেই ভিজে যায়। রাধাকান্তরা জীবনের পরতে পরতে এইভাবে কেবল উৎসব সাজিয়ে যায়।’’ হাটের দিনে পাগলের গল্পে জমতে থাকে কুয়াশার মিথ। গদ্যকার বলেন- “ এক একটা হাট তো তাকে এক এক জন্মের স্বাদ এনে দেয়।’’ এই বই কাহিনিসর্বস্ব হয়ে উঠতে চায়নি কোথাও। ফলে ঘটনা খুব একটা থাকে না। যা থাকে তা হল উত্তরজনপদের চিরায়ত জীবন ইতিহাস। গানে-গল্পে-স্মৃতিতে-যাপনে।

কুদ্দুস, ইয়াসিন, নাসিরুদ্দীন ব্যাপারী, গজেন বর্মণ, বান্ধে ওরাউ, হীরামতি নার্জিনারী, আব্রাহাম রাভা – সবাই মিলে তৈরি করে উত্তরের আত্মপরিচয়। শেকড়ের সন্ধানে ঢুকে পড়তে হয় বহমান জীবনের গভীরে- “সোমেশ্বরীর পাকঘর থেকে মুসুরির ডালের গন্ধ আর প্রাচীনা আবোর মজাগুয়ার মিশ্রণে উত্তরের বিলপুকুরের হাঁসগুলি তাদের চলাচলের ভেতর দিয়ে আবহমানের সব গল্পকথাগুলিকেই হাহাকারের মতন সাজিয়ে দিতে থাকে, একধরনের বাধ্যবাধকতাতেই হয়তো উত্তরকথার খুব খুব ভেতরেই।’’ এই সেজে ওঠা ফুরোয় না কখনো। লেখা যেখানে থেমে যায়, হাওয়া চলে আসে। আবাড় জমতে থাকে উত্তরের কথকতা...

বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবি উত্তম দত্তকে। কৌশিক আচার্যের অসামান্য ছবি গ্রন্থের প্রচ্ছদকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। চিত্রাঙ্গী যত্ন করে প্রকাশ করেছে এই বই। উত্তরজনপদ নিয়ে আরো লিখুন গদ্যকার- এমন দাবি করা যেতেই পারে।      

....................

             

উত্তরজনপদবৃত্তান্ত

সুবীর সরকার

চিত্রাঙ্গী

প্রথম প্রকাশ- নভেম্বর, ২০১৭

মূল্য- ১২০ টাকা।

Sunday, 7 January 2018

জলজ্যোৎস্নার মেয়ে : প্রেম পদাবলি


“ প্রেমের কবিতা বা বিচ্ছেদের কবিতা।

     কখন যে নিজের অজান্তেই প্রেম পেয়ে বসেছে, টের পাইনি। তারপর তা ক্রমে বিচ্ছেদের মতো স্বর্গীয় ভোগের দিকে চলে যায়’’-- কবি মানিক সাহার ‘জলজ্যোৎস্নার মেয়ে’ কাব্যগ্রন্থের ‘ভূমিকা’ শুরু হয়েছে এভাবেই। প্রেমের চেয়ে বিচ্ছেদের মাদকতা বেশি বলে মনে হয়েছে কবির- সৃজনের অনুপ্রেরণা হয়ে বিরহ হয়তো নিয়ে যেতে পারে শুদ্ধতম সত্যের দিকে। কবিতা সেখানে আত্মার পরিশুদ্ধি। চলুন এবারে কবিতা পড়া যাক। কোনো বই হাতে নিয়েই নামকবিতার দিকে আমাদের চোখ চলে যায় অজান্তেই-

 

জলজ্যোৎস্নার মেয়ে

 

স্নান সেরে এসে তুমি পোশাক উড়িয়ে দিলে

আর চমৎকার চুম্বনে ভরে উঠলো

বাগান ও আকাশ থেকে ঝুলতে থাকা

দুধের মতো টলটলে চাঁদ

 

আজ মধুচন্দ্রিমা

তোমার মুখের কাছে নতুন পুরুষের মুখ নামছে

অথচ চোখ বন্ধ করে তুমি ভাবছো

ফেলে রেখে যাওয়া এই প্রেমিকের কথা!

জল মানে জীবন। জ্যোৎস্না সম্ভোগ পদার্থ। জলের ওপর জ্যোৎস্না এসে পড়লে এক মায়া পৃথিবীর সৃষ্টি হয়। একজন পুরুষের মনে মধুচন্দ্রিমার যে স্বপ্ন থাকে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়ে সেই ভাবনার পরিমণ্ডল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। পাঠের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছি পুরুষ পছন্দের নারীটির সঙ্গে মিলিত হতে পারেনি। সে আটকাতে পারেনি তার সাধের নারীটির চলে যাওয়া। এইবার সে মনে করছে- যখন অবাঞ্ছিত নতুন পুরুষের মুখ নামছে প্রিয়ার মুখের কাছে , উত্তেজনার সে মুহুর্তে চোখ বুজে নারী যেন ভাবছে ‘ফেলে রেখে যাওয়া এই প্রেমিকের কথা!’ - এই বিস্ময়বোধক চিহ্নটি ভারি মজার। নারীটি সত্যি ভেবেছিল কিনা পুরুষটির কথা আমরা জানি না, আর এই প্রশ্নও সুসঙ্গত নয়। আচ্ছা, এই ভাবনার মধ্যে কি একরকমের ইচ্ছেপূরণের গল্প নেই? কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘বালিতে আঁকা নাভি’ শেষ হচ্ছে এইভাবে-- “... ফুলসজ্জার রাতে চাঁদ ঠিকরে পড়ছে/ তোমার ও তোমার স্বামীর অলৌকিক ছায়ায়।’’ ফুলশয্যা, চাঁদ যে শব্দগুলো সম্ভোগের সূত্রে ব্যবহৃত হয়, তাই হয়ে উঠছে আরেকজনের কাছে দুঃখের, যন্ত্রণার। আমরা জানি বিপ্রলম্ভ-শৃঙ্গার অধম প্রকৃতির নায়ক নায়িকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাদের কাছে সম্ভোগ- শৃঙ্গারই শৃঙ্গারের একমাত্র রূপ। বিচ্ছেদের মধ্যে প্রেম খুঁজে পাওয়া উত্তম প্রকৃতির মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এ কথাগুলো একারণেই বলা, বর্তমান বিশ্বায়িত সমাজে প্রেমের সঙ্গে শরীরের যত যোগ প্রচারিত হয়, আন্তরিক স্মৃতির যোগ ততটা প্রাধান্য পায় না। ব্রেক আপ আর বিচ্ছেদ যে সমার্থবোধক নয়। এবং বিরহ মানে যে বিশেষ ভাবে থাকা! যেদিন থেকে সব শূন্য মনে হওয়া শর্তসাপেক্ষে, সেদিন থেকেই তো প্রেম।

‘প্রেম’ কবিতার শেষে কবি লিখছেন- “কত জন্ম আগেকার কথা/ কত জন্ম পার হয়ে এসে/ সেই সব পোড়া দাগ এই তো সেদিন বলে মনে হয়।’’ বুঝতে পারি সময়ের ব্যবধানেও সম্পর্কের আগুন মলিন হয়নি। পুড়িয়ে দেওয়া জুড়িয়ে দেওয়া ক্ষত বুঝি বিষাক্ত সম্পদ। কবির বুঁদ হয়ে থাকা বুঝি বিগত সময়কে আগলে রেখেই প্রাণপণে “... আমার প্রতিটি শব্দ/ হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি সময় ছুঁয়ে থাকে।’’ (গান) এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি পড়লে সম্পর্কের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। ‘সম্পর্ক’ কবিতার সূচনায় বলা হচ্ছে একটি গাছের কথা, যে ক্রমশ বৃক্ষ হয়ে উঠছে। পথিক এসে গুনে দেখছে ফলের রং, পাখি আর তার চিকন সন্তান মেতে উঠছে রং মিলান্তিতে। এদিকে সকলের অগোচরে মানব মানবীর ‘পরিচয়’ ক্রমশ গড়িয়ে যাচ্ছে সম্পর্কে। কেউ জানলই না! গোপনীয়তা শিল্পের অন্যতম শর্ত, সম্পর্কেরও। তবে আলোর মত ছড়িয়ে পড়াও থাকে বইকি। ‘ঝুলবারান্দা’ কবিতায় লেখা হয়- “একটি ঝুলবারান্দায় পড়ে থাকা বিকেলের রোদ/ তাতে তোমার চুলের গন্ধ লেগে আছে’’। “তুমি প্রতিদিন আড়ালে বসে বাদাম ভাঙছো/ তার গন্ধে বড় উঠছে তোমার অভিমান’’ (অভিমান) ফ্রেমে আটকে যাওয়া কিছু ছবি পাঠককে নিয়ে যেতে পারে স্মৃতির সরণীতে। স্মরণযোগ্যতা যদি কবিতার মাপকাঠি হয়, মানিক সাহা সসম্মানে উত্তীর্ণ হতেই পারেন- “ মুগ্ধ হই, যতটুকু মুগ্ধ হলে/ কান্না থেমে যায়...’’ কিংবা “... ভালো প্রেমিক হওয়া বড় কঠিন কাজ/ বরং দুষ্টু দেবতা হওয়া তার চেয়ে কিছুটা সহজ।’’  

‘অভিশপ্ত’, ‘দেবতার অভিশপ্ত ছায়া’, ‘ভাঙা ডানা’, ‘মেঘ ও মৃত্যু বিষয়ক’, ‘আত্মহত্যার পর যা যা লিখব ভেবেছি’, ‘নির্বাণ’- কবিতার নামগুলিকে এইভাবে সাজালে কবিমনের আরেকটি পরিচয় ফুটে ওঠে- “মুচলেকা লিখে রেখে/ বেঁচে থাকা বড় অভিমানী/ স্নায়ু জুড়ে ব্যভিচার, শেষ চিঠি/ স্বীকারোক্তিঃ কবি আজ/ আত্মহত্যাকামী।’’ প্রেমের সঙ্গে মৃত্যুর যোগের কথা আমরা জানি। হাসিকান্না হীরাপান্না। নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। এর থেকে পরিত্রাণ নেই। আধুনিক মানুষের অন্যতম অভিজ্ঞান যে দ্বন্দ্ব! আরেকটি কথা বলার, বিপ্রলম্ভের মধ্যে মিশে থাকে বঞ্চনা। এই বঞ্চনা হতে পারে বিভিন্নভাবে- প্রতিশ্রুতি দিয়ে পালন না করবার মধ্যে, বিবাদের মধ্যে কিংবা দৈবের কারণে। প্রেমিক কখনও এই বঞ্চনা ভুলতে পারে না। এবং তা ফিরিয়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়। সে কেবল অসহায়ভাবে বলতে পারে- “ এতসব... এতকিছু দিয়ে/ আমাকে রিক্ত করার এত প্রয়োজন ছিল!’’ (অবসান) নিঃস্বতার যে আত্মঅহংকার তাই হয়ত মূর্ত হয়ে ওঠে কথায় ছবিতে কবিতায়।

তরুণ কবি ও প্রকাশক অরুণাভ রাহারায় উত্তর শিলালিপির পক্ষ থেকে যত্ন করে বইটি পাঠকের দরবারে এনেছেন। সুন্দর প্রচ্ছদ, মুদ্রণ – ঝকঝকে, নির্ভুল। কবিতার বিন্যাসের ক্ষেত্রে আরেকটু মনোযোগী হওয়াই যেত। কবির ‘ভূমিকা’ দিয়েই শুরু হয়েছিল আমাদের লেখা, থেমে যাবার আগে মনে হচ্ছে ‘জলজ্যোৎস্নার মেয়ে’ ভূমিকাবিহীন হলে ভালো হত আরো।  

                             .................................

জলজ্যোৎস্নার মেয়ে

মানিক সাহা

উত্তর শিলালিপি

প্রথম প্রকাশ- ২০১৭

মূল্য- ৮০ টাকা

Friday, 1 December 2017

রোদেলা রোদ্দুর

রোদে হেলান দিয়ে বসে আছে আমাদের শৈশব। চালের বস্তার ওপর খোলা রয়েছে ভূগোল অনুশীলনী। সকালে বারান্দায় রোদ আসে কুট্টিদাদের বাড়ির চাল পেরিয়ে। বড়োরাস্তা থেকে রোদকে আসতে অনেকগুলো বাড়ি ছুঁতে হয়। পথে শিশিরের সাথে মাখামাখি হয়ে সামনের মাঠে যখন বসে থাকে ঘুম ভাঙাবে বলে, আমরা তখন খেলতে বেরোই। ফুটবল। শার্টের কলারটা টেনে লম্বা করার চেষ্টা করতে থাকি। বাবুদের বাড়ি গিয়ে বলি- কিরে উঠে পড়। টিনের দেওয়াল ভেদ করে শব্দ পৌঁছে দি-  সূর্য উঠে গেছে রে...

নারকেল পাতার মধ্য দিয়ে, গাড়ির গ্যারাজের টিনের ভেতর দিয়ে রোদ আসতে থাকে। নরম, লেপের ওমের মত। তাকানো যায় দিব্যি। ফুলের প্লাস্টিকে রোদ ভরতে থাকে কেউ কেউ। দাঁতন করে কুলকুচি করতে করতে যখন সূর্যের দিকে তাকায়, এর মধ্যে টাইম কলে জল এসে যায়। ব্যস, রোদ দাঁড়িয়ে পড়ে লাইনে। টুগবুগ করে জল ভরা হতে থাকে, মুখের বুলবুলিতে যেন রোদ আস্কারা দেয় আমাদের। তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে দু’এক কথা বলি। দেখতে পাই আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট, টব, বারান্দা, সাইকেল... কুসুমদের বাড়ি থেকে গানের সুর ভেসে আসছে। রোদ তাতেও মিশে যাচ্ছে।

সকালের চা-মুড়ি খেয়ে ঘরে ঘুম পেত বলেই বাইরে পড়ার ছলে চলে আসা বই নিয়ে। বেড়াল কুকুরগুলো ততক্ষণে রোদ পোহানো শুরু করে দিয়েছে। পড়ার চেষ্টা করছি ভারতের ইতিহাস। এর মধ্যে রোদের তেজ বাড়ছে কমছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি ইচ্ছে করে রোদ এসব করে। আমাদের কোচবিহারে প্রতি বছর দিন দশেক রোদ ওঠে না। এমনভাবে কুয়াশা ঘিরে রাখে সুয্যিমামাকে, টেনে বার করে কার সাধ্য। রোদ না উঠলে ভালো সময় বোঝা যায় না। মা ঘুম থেকে উঠেই বলে- হায় হায় আজ অফিসের দেরি হয়ে যাবে। এমন দিনে আমার স্নান করতে ইচ্ছে করে না। বেলা অব্দি অপেক্ষা করতে থাকি রোদ উঠলে স্নান করব। গা ধুয়ে রোদ পোহাতে চলে যাই মাঠে। দেখি লেপগুলো শুকোতে দিচ্ছে কাকিমা। দুমদাম করে তোশকের ওপর লাঠি মারতে থাকে মানসদা। ধুলো ওড়ে। আর ধুলোর মধ্যে আবার খুশি রোদ এসে পড়ে। আমি দেখতে থাকি। আর ভাবি রোদ সব কিছু দেখতে পায়। সবখানে যেতে পারে।

রোদের চলাচল আমাদের বাড়িতে অন্তত আমি জানি। ছায়াছবির গল্পে ডুগি তবলা শুকোতে দিই। মা আলমারি থেকে মাঝেমাঝে বের করে ন্যাপথালিন দেওয়া জামা কাপড়। বাবা পুরোনো ফাইল ঘাটতে বসে। আমাদের বাড়িতে উৎসব লেগে যায় যেন। আমিও জমানো মাটির পুতুলগুলো বের করি। মিঠে রোদের ভেতর বাঁশি বাজাতে থাকেন কৃষ্ণ ঠাকুর। পাশেই দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ।

আকাশ আমায় কেমন করে আলোয় ভরিয়ে দেয় রোদ না থাকলে জানতাম? আচারের শিশি উষ্ণ আদর না চাইলে আমরা খোঁজ পেতাম নাকি তাদের? শীতের আলো বেশ ভালো। ভ্রুকুটি নেই। শাসন নেই। মাথাগরম নেই সকালবেলা মেয়েরা যখন দলবেঁধে পড়তে যায়, সেসময় রোদ লাগে ওদের মুখে। ওরা হাসতে হাসতে ঘাড় কাত করে বেণী করে নিয়ে যায় প্রাইভেটে। তারপর স্কুল। বিকেলের ঠিক আগে রোদ নরম হয়ে আসে আরো, কোনো একলা মুখে আলো পড়লে কেমন একটা ভেতরে হয়। আকাশে মেঘের গায়ে মেখে থাকে অদ্ভুত সব রঙ... ঝুপ করে বিকেল ফুরিয়ে আসে। রাস্তার আলো জ্বলে ওঠার পর রোদ ধীরে ধীরে চলে যায়। আমি আবার অপেক্ষা করতে থাকি। সকালের।  

জন্মান্তরের রোদের গন্ধে চমক লেগে দেখি রাজনগরে তোর্সার পাড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করে যাচ্ছে এক কিশোর আর কিশোরী। ঠাণ্ডা হাওয়া জলের বুকে ধীর কাঁপন তুলছে। দূরে দেখা যাচ্ছে রাজবাড়ির গম্বুজ। ওরা গল্প করেই চলেছে। আলো লাগছে ওদের গায়ে। ওদের মুখ দেখতে পারছি না। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি ওদের নাম আমি জানি। আপনারাও জানেন। মেয়েটির নাম জবা। ছেলেটির নাম রোদ্দুর!

Wednesday, 22 November 2017

কোচবিহারের দুর্গাপূজা: নতুন তথ্য নতুন আলো





“ গিরিপুরে কি আনন্দ হইল
  আমার উমানিধি গৃহে আইল
  আমি চিরদিনের দুখি হে রাজ
  ও চান্দ বদন হের‍্যা প্রাণ জুড়াইল
       কহে শিবেন্দ্র ভূপে
  আমার মনের আন্ধার দূরে গেল। ’’- মহারাজা শিবেন্দ্রনারায়ণের আগমনী গান দিয়েই শুরু হল আমাদের আলোচনা। আমরা জানি মহারাজা হরেন্দ্রনারায়ণ ও  তাঁর পুত্র শিবেন্দ্রনারায়ণ দুজনেই শাক্ত সংগীত রচনা করেছিলেন। হরেন্দ্রনারায়ণ একাধিক আগমনী সংগীত রচনা করলেও ‘আশ্চর্যের বিষয় কোন বিজয়ার গান নেই’- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নৃপেন্দ্রনাথ পাল মহাশয়। আমরা জানি কোচবিহারের মহারাজাদের ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাস একরৈখিক নয়। যোগিনী তন্ত্রের মতে রাজা বিশ্বসিংহ ছিলেন শিবের পুত্র। বিশ্বসিংহের সময় থেকেই ব্যাপকভাবে আর্যায়ন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। মহারাজা নরনারায়ণের সময় শাক্তধর্ম রাজধর্মে স্বীকৃতি পায়। অবশ্য সে সময় শঙ্করদেব রাজদরবারে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। আবার বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবও ছিল। মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ সপরিবারে নববিধান ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, সে তথ্য অজানা নয়। কোচবিহারের দুর্গাপূজার সংবাদ আমরা পরিচারিকা নবপর্য্যায় পত্রিকার একটি সংখ্যায় পাই-  এবারে মহামায়ার আগমন হইয়াছিল মহামারী লইয়া আশ্বিনের শেষে ওলাউঠা দেখা দিয়াছিল সহরে ও মফ:স্বলে। সরকারের অক্লান্ত চেষ্টা সত্ত্বেও তাহার প্রকোপ অগ্রহায়ণের প্রথমেও প্রশমিত হয় নাই। সহরে থামিলেও মফ:স্বলে আজও তাহার জের চলিতেছে। মৃত্যু আতঙ্কে অধিবাসীবর্গ এরূপ অভিভূত হইয়াছিল যে পূজার উৎসব-আনন্দে কেহই যোগ দেন নাই। অনেকেই সহর পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র গমন করিয়াছিলেন,-যাঁহার ছিলেন তাঁহাদের আলোচনার বিষয়ই হইয়াছিল ‘আজ আবার কার কিবা হইল!” কোচবিহার সহরে ‘দেবীবাড়ী’তে দেবীপূজা উপলক্ষে প্রতি বছর মেলা হয়- এবার তাহা হইতে পারে নাই, তোর্ষা নদীতে ভাসান হয়, নদীর দু’ ধারে কলেরা—কাজেই প্রতিমা বিসর্জ্জন হইয়াছিল একটি বিরাট সরোবরে। ’’ (পরিচারিকা নবপর্য্যায়- অগ্রহায়ণ ১৩৩০, ৮ম বর্ষ ১ম সংখ্যা) এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যেহেতু এই পত্রিকাটি প্রাথমিকভাবে আর্যনারীসমাজের মুখপত্র ছিল, নিরূপমা দেবী ১৩২৩ বঙ্গাব্দে এই পত্রিকার দায়িত্বভার গ্রহণ করে সাহিত্য পত্রিকায় উন্নীত করলেও পত্রিকার ভাবাদর্শে ব্রাহ্ম প্রভাব ক্রিয়াশীল ছিল বলেই মনে হয়। ফলে খুব বেশি দুর্গাপূজা সংক্রান্ত লেখা প্রকাশিত হয়নি এই পত্রিকায়জীবনকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘ অকাল- বোধন’ নামে একটি ছোট প্রবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৩৮ খিস্টাব্দের ১৪ই এপ্রিল শরচ্চন্দ্র ঘোষাল ও জানকীবল্লভ বিশ্বাসের সম্পাদনার কোচবিহার দর্পণ পাক্ষিক পত্রিকা হিসেবে পথ চলা শুরু করে। এই পত্রিকায় দুর্গাপূজা বিষয়ে প্রবন্ধ যেমন প্রকাশিত হয়েছিল, তেমনই পাই প্রচুর সংবাদ; সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোচবিহার দর্পণ- পত্রিকায় ১লা কার্ত্তিক, ১৩৪৫ সনের সংখ্যায় পাচ্ছি ‘ মাথাভাঙায় দুর্গোৎসব’ শীর্ষক সংবাদ- “ এ বছর মাথাভাঙ্গা টাউনে দুর্গোৎসব সমারোহ সহকারে সম্পন্ন হইয়াছে। গত বৎসর সহরে চারিখানা প্রতিমা হইয়াছিল তৎস্থলে এ বৎসর মাত্র দুইখানি প্রতিমার পূজা হইয়াছে। অত্রস্থ হাটের ইজারাদার কর্ত্তৃক হাট প্রাঙ্গণে একখানি ও মাথাভাঙ্গা ক্লাবের উদ্যোগে বারোয়ারীভাবে স্থানীয় শ্রীশ্রী ঁমদনমোহন ঠাকুর বাড়ীর প্রাঙ্গণে অপর আর একখানি পূজা হইয়াছে। ইহা ব্যতীত সহরের ৩।৪ মাইল মধ্যে আরও দুই তিন স্থানে ঁশ্রীশ্রী দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান হইয়াছে। গ্রামের পূজানুষ্ঠান মধ্যে সহরের সন্নিকটস্থ শিকারপুরের স্থানীয় প্রামাণিক পরিবারের পরিবারের শ্রীশ্রী ঁদুর্গোৎসবে কিছু বিশেষত্ব আছে। ইহা শাস্ত্রোচিতমতে পূর্ব্ব প্রতিষ্ঠিত নূন্যাধিক তিন ফুট উচ্চ শ্রীশ্রী ঁদশ ভূজার ধাতু নির্ম্মিত ঐ প্রামাণিক পরিবারের নিত্য পূজার গৃহ বিগ্রহ। শারদীয় উৎসব কালে প্রতি বৎসর উক্ত বিগ্রহের গান বাদ্যাদিদ্বারা সমারোহের সহ ষোড়শোপাচারে পূজা হইয়া থাকে। ’’  এই সংখ্যাতেই ‘দিনহাটা সংবাদ’ অংশে পাই- “ স্থানীয় অধিবাসীদের চেষ্টায় অত্র সহরে শ্রীশ্রী বলরাম ঁবলরাম জিউর প্রাঙ্গণে, শিব বাড়ীতে এবং রেলওয়ে স্টেশনের সন্নিকটে মহামায়াপাটে তিনখানি ঁরী শারদীয় পূজার অনুষ্ঠান হইয়াছে। প্রতিমার গঠন প্রণালীতে স্থানীয় কুম্ভকারগণ বেশ কৃতিত্বের পরিচয় প্রদান করিতেছে। ইহাদের গঠন নৈপুণ্য বিদেশীয় কারিকর অপেক্ষা বিশেষ নিকৃষ্ট বলিয়া মনে হয় না। ইহা দেশীয় কুম্ভকারদের পক্ষে কম শ্লাঘার বিষয় নহে। জনসাধারণের এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে এই পূজা উপলক্ষে ঁরী মহামায়া পাটে চারি দিবস বিরাট মেলার আয়োজন হইয়াছিল। ’’ ১ লা অগ্রহায়ণ ১৩৪৬-র সংখ্যায় দেখি- “ প্রতি বৎসরের ন্যায় এবারও স্থানীয় ঁমদনমোহন ঠাকুরবাড়ীতে ঁদুর্গোৎসব মহাসমারোহে সাধিত হইয়াছে। এ বৎসর পূজার তিন দিবস স্থানীয় বিষহরা গান স্থানীয় লোকজনদের এবং বহুদূরাগত লোকজনদের বিশেষ উপভোগ্য হইয়াছিল এবং লোকসমাগমও অন্যান্য বৎসরের তুলনায় অনেক বেশী হইয়াছিল। এই বারোয়ারী পূজা ব্যতীত স্থানীয় জোতদার শ্রীযুক্ত মোহিনীমোহন দত্ত এবং মোক্তার শ্রীযুক্ত রাজচন্দ্র চক্রবর্ত্তী মহাশয়ের বসতবাটীতে অন্যান্য বৎসরের ন্যায় ঁশারদীয়া পূজার অনুষ্ঠান হইয়াছিল। মহামান্য রাজসভার ৪ র্থ মেম্বর শ্রীযুক্ত সুশীলকুমার চক্রবর্ত্তী মহোদয়ের জমিদারী সেরেস্তার ম্যানেজার শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র গুহ মহাশয়ের বাসাবাটীতে ঁশারদীয়া পূজার অনুষ্ঠান শৃঙ্খলার সহিত নিষ্পন্ন হইয়াছে।’’ মাথাভাঙ্গা সংবাদ- অংশে ‘ মাথাভাঙায় শারদোৎসব ও রবীন্দ্র স্মৃতিপূজা’ শীর্ষক শিরোনামে শ্রী ফণীন্দ্রমোহন ব্রহ্ম প্রেরিত খবর প্রকাশিত হচ্ছে ৪র্থ বর্ষের একটি সংখ্যায়- “ মাথাভাঙ্গা ক্লাবের সার্ব্বজনীন দুর্গোৎসব মাননীয় নায়েব আহিলকারদ্বয়ের উৎসাহে সুরুচারূপে (?) সম্পন্ন হইয়াছে। পূজাকমিটির সম্পাদক শ্রীবিনোদবিহারী তরফদার ও সহঃসম্পাদক শ্রীকালীমোহন সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমে উক্ত উৎসব সম্ভব হইয়াছিল।
              বাৎসরিক শারদীয় সম্মিলনী উৎসবে ঁরবীন্দ্রনাথের পুণ্যস্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শ্রীপরেশচন্দ্র সেন, এম-এ ঁরবীন্দ্রনাথের একটী গান গাহিয়াছিলেন, শ্রীঅধীরচন্দ্র ধর, বি-এল “শাহাজান’’ কবিতাটী আবৃত্তি করেন। ঁরবীন্দ্রনাথের “ঁবৈকুন্ঠের খাতা’’ প্রহসন বিশেষ সাফল্য সহকারে অভিনীত হয়। উক্ত অভিনয়ে শ্রীঅধীরচন্দ্র ধর, বি-এল, শ্রীনরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী,এম-এ,বি-টি, শ্রীক্ষিতীশচন্দ্র ধর, বি-টি ও শ্রীমণীন্দ্রনাথ দাস বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন। ’’
‘কোচবিহারে রাজকীয় দুর্গোৎসব’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় ‘কোচবিহার দর্পণ’ পত্রিকার ২১ শে আশ্বিন, সন ১৩৪৫ সংখ্যায়। একই ব্যক্তির আরেকটি লেখা আমরা পাই ‘ নবদুর্গা, নবপত্রিকা ও নবগ্রহ’ নামে। প্রকাশিত হয়েছিল কোচবিহার দর্পণ পত্রিকায় ১৯৪৩ সালে। তরুণকৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাঁর ‘ পৌণ্ড্রদর্পণ’ পত্রিকায় পূজা সংখ্যা ১৩৯৫- এ এই লেখাটি পুনর্মুদ্রণ করেন। সপ্তম বর্ষে ১৩৫১ সালে আশ্বিন মাসে দর্পণ-এ জীবনকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘ দুর্গে দুর্গতিনাশিনী’ প্রবন্ধের শেষে এই টুকরো সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল- “কোচবিহারে রাজকীয় দুর্গোৎসব- প্রতি ন্যায় বর্ত্তমান বর্ষেও উৎসবের আয়োজন চলিতেছে। রাজকীয় সেই চিরাচরিত প্রথার ব্যতিক্রম না হইলেও বর্ত্তমান বর্ষে দুর্দ্দিনের প্রকোপে উৎসবের দিক দিয়া যে সংক্ষিপ্ত ভাব অবলম্বন করিতে হইবে—তাহা বলাই বাহুল্য। যদিও গরীবের ঘরে ঘরে অন্নবস্ত্রের হাহাকার তথাপি হিন্দুর দুর্গোৎসব ও মুসলমানদের ‘ঈদলফেতর’ পর্ব্ব  প্রায় এক সময় অনুষ্টিত  হওয়ায় বর্ত্তমান বর্ষে হিন্দুমুসলমান নির্ব্বিশেষে সকলেরই শুষ্ক মুখে হাসির রেখা দেখা দেখা দিয়াছে! উৎসব সফল হউক ইহাই আমাদের কামনা। ’’ এই অংশ থেকে কোচবিহারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ছবি পাওয়া যায়। ‘শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা’ নামে প্রবন্ধ লিখেছিলেন জীতেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ‘কোচবিহার দর্পণ’ পত্রিকায়। ১লা কার্ত্তিক, ১৩৪৬ সংখ্যায় ‘অঞ্জলি’ পত্রিকার শারদ সংখ্যা নিয়ে একটি আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল- “ জেন্‌ঙ্কিন্স স্কুল পত্রিকা; শারদীয় সংখ্যা, ১৩৪৬ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাক্তন – ছাত্র মহাশয়দিগের ও বর্ত্তমান ছাত্রগণের ইংরাজী, বাঙ্গলা বিবিধ রচনাসম্ভারে সজ্জিত হইয়া প্রকাশিত হইয়াছে । প্রবন্ধাদির অধিকাংশই সুখপাঠ্য। ছাত্রগণের রচনা আশাপ্রদ।’’

তরুণকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সম্পাদিত  ‘পৌণ্ড্রদর্পণ’ পত্রিকায় দুর্গাপূজা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন – ‘কোচবিহারে দুর্গাপূজার সেকাল ও একাল’ ( পূজা সংখ্যা ১৩৯৩) লিখেছিলেন ব্রজেশ্বরী বর্মা। প্রবন্ধের শুরুতে তিনি দেবীবাড়ির পূজা ও মদনমোহন বাড়ির পূজার কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর লিখছেন – “ রাজকুলের এই দুইটি দুর্গাপূজা ছাড়া সেকালে কোচবিহার শহরে জমিদার শ্রীসুশীলকুমার চক্রবর্তীর বাড়ীতেও প্রতিমা পূজার ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া ব্রহ্মচারী কালীবাড়ী এবং রাধিকানন্দ ভট্টাচার্য্যের বাড়ীতেও দেশভাগের পূর্ব থেকেই প্রতিমায় দুর্গাপূজা হত। কোচবিহারে শহরে কেহ কেহ মহাষ্টমী দিন ঘটে পূজা দিতেন। এ ছিল কোচবিহারের সেকালের দুর্গাপূজা।’’ অনেক প্রাচীন দুর্গাপূজা বন্ধ হয়ে গেছে বলে আক্ষেপ করছেন- “ কোচবিহার শহরে শশধর ভট্টাচার্য্য, নলিনী তাকুকদার, অমূল্য বকসী, রাজেন্দ্রনাথ রায়, বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী ও প্রিয়লাল মুকুটী প্রমূখ মহাশয়গণের বাড়ীতে প্রতিমা দিয়ে তিনদিন দুর্গাপূজা হতকালক্রমে এই প্রতিমা পূজাগুলি বন্ধ হয়ে যায়।’’ এই লেখা থেকে আমরা আরো জানতে পারি যে- “ গ্রামাঞ্চলের মধ্যে নির্মল চন্দ্র মুস্তাফী (গোবরাছড়া গ্রামে) মনোমোহন বকসী, প্রমোদা বকসী, গিরিশ চন্দ্র লাহিড়ী (বামনহাট) প্রমূখ মহাশয়গণের গ্রামের বাড়ীতে তিনদিনই প্রতিমা পূজার ব্যবস্থা ছিল। এই পূজাগুলি অবলুপ্ত হয়ে গেছে। খাগড়াবাড়ী ব্রাহ্মণপাড়ায় ও কোন কোন বাড়ীতে তিনদিনই মহাপূজার আয়োজন হত। এই বাড়ীগুলিতে বেশীর ভাগই দুর্গার পিতলের মূর্ত্তিতেই পূজা হয়ে আসছে, এখনও হয়। কোন কোন বাড়ীতে তিনদিন যেমন হয়, আবার প্রতিষ্ঠিত পিতলের মূর্ত্তিতে নিত্যপূজাও হয়। মহাপূজা উপলক্ষে পিতলামূর্ত্তি বা ঘটে তিনদিনই পূজা হয়ে থাকে তার মধ্যে: ঁরাজেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, ঁভূমীন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, ঁচারুকেশ চক্রবর্ত্তী, ঁদেবেন্দ্রানন্দ চক্রবর্ত্তী, দুর্গানাথ চক্রবর্ত্তী, ঁভবশংকর স্মৃতিরত্ন, ঁধীরানন্দ ভট্টাচার্য্য, শ্রীমনীন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, শ্রীপ্রমোদেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, শ্রীকেশবনন্দন ভট্টাচার্য্য প্রমূখ মহাশয়ের বাড়ীতে। এই পূজাগুলির মধ্যে কোনটি শতাধিক বৎসর থেকে চলে আসছে।’’ এই প্রবন্ধে সার্বজনীন পুজোর কথাও এসেছে। পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়া, হরিসভা, হাজরাপাড়া, কোচবিহার ধর্মসভার মধ্যে সবচেয়ে আগে কারা তা বলা কঠিন বলে আমাদের মনে হয়। স্বদেশচর্চা লোক পত্রিকার সেপ্টেম্বর ২০১৪- এর শারদ সংখ্যায় দীপক কুমার রায় লিখেছিলেন ‘উত্তরবঙ্গের প্রেক্ষাপটে বড়োবাড়ির দুর্গাপূজা’ প্রবন্ধে কোচবিহার জেলা নিয়ে যা লিখেছেন তার প্রায় পুরো অংশটাই উদ্ধৃত করছি-
“ ১. পূর্বপাড়া সিংহবাড়ির পূজা: কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ির অন্তর্গত পূর্বপাড়া সিংহবাড়ির পূজা প্রায় ২৫০ বছরের প্রাচীন। প্রতিমার কাঠামো তৈরি হয় রথযাত্রার দিন। ২৫৬টি বেলপাতা দিয়ে যজ্ঞ এবং সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে ১৭টি বলি। পারিবারিক রীতি অনুসারে এক বছর কলকাতায় এক শরিকের বাড়ীতে এবং হলদিবাড়ির সিংহবাড়িতে  পরের বছর পুজো দেবার রীতি।
      পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায় ঢাকায় বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার অন্তর্গত কামারখোলা গ্রামে রামস্বরূপ সিংহ রায়চৌধুরী প্রথম এই দুর্গাপূজা করেন, ১৯৪৯-এ হলদিবাড়িতে প্রথম এই দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।
. বাবুপাড়ার দুর্গাপূজা: কোচবিহার জেলার দিনহাটা শহরের অন্তর্গত বাবুপাড়ার বাগ্‌চি পরিবারের দুর্গাপূজা প্রায় শতবর্ষ উত্তীর্ণ।
. পূর্বপাড়া দত্তবাড়ির পূজা: কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ শহরের পূর্বপাড়া দত্তবাড়ির পূজা ২০১২ সনে শতবর্ষে পা দিয়েছে। একদা অবিভক্ত বাংলাদেশের ঢাকা থেকে মোহিনীমোহন দত্ত চলে আসেন কোচবিহারে। তিনিই দত্তবাড়ির দুর্গাপূজার প্রচলন করেনপূর্বপুরুষদের তৈরি কাঠামোতে প্রতি বৎসর দুর্গা প্রতিমা তৈরি হয়। বিসর্জনের পরে নদী থেকে কাঠটি বাড়িতে তুলে আনা হয় এবং পারিবারিক রীতি অনুযায়ী জন্মাষ্টমীর দিনে প্রতিমার কাঠামোটি মন্ডপে স্থাপন করে পূজার্চনা করা হয়। মূলত বৈষ্ণব মতেই পূজার্চনা করার রীতি। পূজা উপলক্ষে দরিদ্র নারায়ণ সেবার আয়োজন করা হয়।
. মহেশ্বরী ভবনের পূজা: দিনহাটার অন্তর্গত মহেশ্বরী ভবনের দুর্গাপূজা পারিবারিক পূজা হিসেবে স্মরণীয়। তবে এই পূজার ঐতিহ্য খুব পুরানো নয়।’’
        কোচবিহারের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব নীরজ বিশ্বাসের সংবাদ সামরিকপত্রে নির্বাচিত লেখালেখি নিয়ে প্রকাশিত ‘কোচবিহার প্রসঙ্গে’ বইতে অন্যরকম পূজার দেশ হিসেবে উঠে এসেছে কোচবিহার। স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে ইতিহাসের ভাষ্য। ‘ পুজোর দিনের দীর্ঘশ্বাস’ লেখায় বলেছেন তিনি- “ সত্যি কথা বলতে কি, কোচবিহারে বারোয়ারি ব্যাপারটা অন্য যে কোন জেলা থেকে অনেক পরে এসেছে। কারণ বলতে সরকারী প্রচেষ্টায় পুজো করা তো নিয়মই ছিল। আর তাতে যোগ দিতেন কোচবিহারের সমস্ত মানুষ।’’   
       
          কোচবিহারের দুর্গাপূজার বিবর্তন নিয়ে বড় লেখার ইচ্ছে রইল। অধুনা দুর্লভ পত্র-পত্রিকা থেকে সংগৃহীত পুজোর প্রতিবেদনে যদি উঠে আসে নতুন তথ্য কিংবা কোচবিহারের প্রাচীন দুর্গাপূজা নিয়ে নতুন আলো পাঠককে ইতিহাসের খোঁজে উদ্বুদ্ধ করে, তবেই এ লেখা সার্থক।
                               .....................
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ-
নৃপেন্দ্রনাথ পাল, ভাস্কর সেনগুপ্ত

(প্রকাশিত- শারদছন্দ, ১৪২৪)