Wednesday, 22 November 2017

কোচবিহারের দুর্গাপূজা: নতুন তথ্য নতুন আলো





“ গিরিপুরে কি আনন্দ হইল
  আমার উমানিধি গৃহে আইল
  আমি চিরদিনের দুখি হে রাজ
  ও চান্দ বদন হের‍্যা প্রাণ জুড়াইল
       কহে শিবেন্দ্র ভূপে
  আমার মনের আন্ধার দূরে গেল। ’’- মহারাজা শিবেন্দ্রনারায়ণের আগমনী গান দিয়েই শুরু হল আমাদের আলোচনা। আমরা জানি মহারাজা হরেন্দ্রনারায়ণ ও  তাঁর পুত্র শিবেন্দ্রনারায়ণ দুজনেই শাক্ত সংগীত রচনা করেছিলেন। হরেন্দ্রনারায়ণ একাধিক আগমনী সংগীত রচনা করলেও ‘আশ্চর্যের বিষয় কোন বিজয়ার গান নেই’- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নৃপেন্দ্রনাথ পাল মহাশয়। আমরা জানি কোচবিহারের মহারাজাদের ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাস একরৈখিক নয়। যোগিনী তন্ত্রের মতে রাজা বিশ্বসিংহ ছিলেন শিবের পুত্র। বিশ্বসিংহের সময় থেকেই ব্যাপকভাবে আর্যায়ন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। মহারাজা নরনারায়ণের সময় শাক্তধর্ম রাজধর্মে স্বীকৃতি পায়। অবশ্য সে সময় শঙ্করদেব রাজদরবারে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। আবার বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবও ছিল। মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ সপরিবারে নববিধান ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, সে তথ্য অজানা নয়। কোচবিহারের দুর্গাপূজার সংবাদ আমরা পরিচারিকা নবপর্য্যায় পত্রিকার একটি সংখ্যায় পাই-  এবারে মহামায়ার আগমন হইয়াছিল মহামারী লইয়া আশ্বিনের শেষে ওলাউঠা দেখা দিয়াছিল সহরে ও মফ:স্বলে। সরকারের অক্লান্ত চেষ্টা সত্ত্বেও তাহার প্রকোপ অগ্রহায়ণের প্রথমেও প্রশমিত হয় নাই। সহরে থামিলেও মফ:স্বলে আজও তাহার জের চলিতেছে। মৃত্যু আতঙ্কে অধিবাসীবর্গ এরূপ অভিভূত হইয়াছিল যে পূজার উৎসব-আনন্দে কেহই যোগ দেন নাই। অনেকেই সহর পরিত্যাগ করিয়া অন্যত্র গমন করিয়াছিলেন,-যাঁহার ছিলেন তাঁহাদের আলোচনার বিষয়ই হইয়াছিল ‘আজ আবার কার কিবা হইল!” কোচবিহার সহরে ‘দেবীবাড়ী’তে দেবীপূজা উপলক্ষে প্রতি বছর মেলা হয়- এবার তাহা হইতে পারে নাই, তোর্ষা নদীতে ভাসান হয়, নদীর দু’ ধারে কলেরা—কাজেই প্রতিমা বিসর্জ্জন হইয়াছিল একটি বিরাট সরোবরে। ’’ (পরিচারিকা নবপর্য্যায়- অগ্রহায়ণ ১৩৩০, ৮ম বর্ষ ১ম সংখ্যা) এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যেহেতু এই পত্রিকাটি প্রাথমিকভাবে আর্যনারীসমাজের মুখপত্র ছিল, নিরূপমা দেবী ১৩২৩ বঙ্গাব্দে এই পত্রিকার দায়িত্বভার গ্রহণ করে সাহিত্য পত্রিকায় উন্নীত করলেও পত্রিকার ভাবাদর্শে ব্রাহ্ম প্রভাব ক্রিয়াশীল ছিল বলেই মনে হয়। ফলে খুব বেশি দুর্গাপূজা সংক্রান্ত লেখা প্রকাশিত হয়নি এই পত্রিকায়জীবনকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘ অকাল- বোধন’ নামে একটি ছোট প্রবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৩৮ খিস্টাব্দের ১৪ই এপ্রিল শরচ্চন্দ্র ঘোষাল ও জানকীবল্লভ বিশ্বাসের সম্পাদনার কোচবিহার দর্পণ পাক্ষিক পত্রিকা হিসেবে পথ চলা শুরু করে। এই পত্রিকায় দুর্গাপূজা বিষয়ে প্রবন্ধ যেমন প্রকাশিত হয়েছিল, তেমনই পাই প্রচুর সংবাদ; সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোচবিহার দর্পণ- পত্রিকায় ১লা কার্ত্তিক, ১৩৪৫ সনের সংখ্যায় পাচ্ছি ‘ মাথাভাঙায় দুর্গোৎসব’ শীর্ষক সংবাদ- “ এ বছর মাথাভাঙ্গা টাউনে দুর্গোৎসব সমারোহ সহকারে সম্পন্ন হইয়াছে। গত বৎসর সহরে চারিখানা প্রতিমা হইয়াছিল তৎস্থলে এ বৎসর মাত্র দুইখানি প্রতিমার পূজা হইয়াছে। অত্রস্থ হাটের ইজারাদার কর্ত্তৃক হাট প্রাঙ্গণে একখানি ও মাথাভাঙ্গা ক্লাবের উদ্যোগে বারোয়ারীভাবে স্থানীয় শ্রীশ্রী ঁমদনমোহন ঠাকুর বাড়ীর প্রাঙ্গণে অপর আর একখানি পূজা হইয়াছে। ইহা ব্যতীত সহরের ৩।৪ মাইল মধ্যে আরও দুই তিন স্থানে ঁশ্রীশ্রী দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান হইয়াছে। গ্রামের পূজানুষ্ঠান মধ্যে সহরের সন্নিকটস্থ শিকারপুরের স্থানীয় প্রামাণিক পরিবারের পরিবারের শ্রীশ্রী ঁদুর্গোৎসবে কিছু বিশেষত্ব আছে। ইহা শাস্ত্রোচিতমতে পূর্ব্ব প্রতিষ্ঠিত নূন্যাধিক তিন ফুট উচ্চ শ্রীশ্রী ঁদশ ভূজার ধাতু নির্ম্মিত ঐ প্রামাণিক পরিবারের নিত্য পূজার গৃহ বিগ্রহ। শারদীয় উৎসব কালে প্রতি বৎসর উক্ত বিগ্রহের গান বাদ্যাদিদ্বারা সমারোহের সহ ষোড়শোপাচারে পূজা হইয়া থাকে। ’’  এই সংখ্যাতেই ‘দিনহাটা সংবাদ’ অংশে পাই- “ স্থানীয় অধিবাসীদের চেষ্টায় অত্র সহরে শ্রীশ্রী বলরাম ঁবলরাম জিউর প্রাঙ্গণে, শিব বাড়ীতে এবং রেলওয়ে স্টেশনের সন্নিকটে মহামায়াপাটে তিনখানি ঁরী শারদীয় পূজার অনুষ্ঠান হইয়াছে। প্রতিমার গঠন প্রণালীতে স্থানীয় কুম্ভকারগণ বেশ কৃতিত্বের পরিচয় প্রদান করিতেছে। ইহাদের গঠন নৈপুণ্য বিদেশীয় কারিকর অপেক্ষা বিশেষ নিকৃষ্ট বলিয়া মনে হয় না। ইহা দেশীয় কুম্ভকারদের পক্ষে কম শ্লাঘার বিষয় নহে। জনসাধারণের এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে এই পূজা উপলক্ষে ঁরী মহামায়া পাটে চারি দিবস বিরাট মেলার আয়োজন হইয়াছিল। ’’ ১ লা অগ্রহায়ণ ১৩৪৬-র সংখ্যায় দেখি- “ প্রতি বৎসরের ন্যায় এবারও স্থানীয় ঁমদনমোহন ঠাকুরবাড়ীতে ঁদুর্গোৎসব মহাসমারোহে সাধিত হইয়াছে। এ বৎসর পূজার তিন দিবস স্থানীয় বিষহরা গান স্থানীয় লোকজনদের এবং বহুদূরাগত লোকজনদের বিশেষ উপভোগ্য হইয়াছিল এবং লোকসমাগমও অন্যান্য বৎসরের তুলনায় অনেক বেশী হইয়াছিল। এই বারোয়ারী পূজা ব্যতীত স্থানীয় জোতদার শ্রীযুক্ত মোহিনীমোহন দত্ত এবং মোক্তার শ্রীযুক্ত রাজচন্দ্র চক্রবর্ত্তী মহাশয়ের বসতবাটীতে অন্যান্য বৎসরের ন্যায় ঁশারদীয়া পূজার অনুষ্ঠান হইয়াছিল। মহামান্য রাজসভার ৪ র্থ মেম্বর শ্রীযুক্ত সুশীলকুমার চক্রবর্ত্তী মহোদয়ের জমিদারী সেরেস্তার ম্যানেজার শ্রীযুক্ত সতীশচন্দ্র গুহ মহাশয়ের বাসাবাটীতে ঁশারদীয়া পূজার অনুষ্ঠান শৃঙ্খলার সহিত নিষ্পন্ন হইয়াছে।’’ মাথাভাঙ্গা সংবাদ- অংশে ‘ মাথাভাঙায় শারদোৎসব ও রবীন্দ্র স্মৃতিপূজা’ শীর্ষক শিরোনামে শ্রী ফণীন্দ্রমোহন ব্রহ্ম প্রেরিত খবর প্রকাশিত হচ্ছে ৪র্থ বর্ষের একটি সংখ্যায়- “ মাথাভাঙ্গা ক্লাবের সার্ব্বজনীন দুর্গোৎসব মাননীয় নায়েব আহিলকারদ্বয়ের উৎসাহে সুরুচারূপে (?) সম্পন্ন হইয়াছে। পূজাকমিটির সম্পাদক শ্রীবিনোদবিহারী তরফদার ও সহঃসম্পাদক শ্রীকালীমোহন সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমে উক্ত উৎসব সম্ভব হইয়াছিল।
              বাৎসরিক শারদীয় সম্মিলনী উৎসবে ঁরবীন্দ্রনাথের পুণ্যস্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শ্রীপরেশচন্দ্র সেন, এম-এ ঁরবীন্দ্রনাথের একটী গান গাহিয়াছিলেন, শ্রীঅধীরচন্দ্র ধর, বি-এল “শাহাজান’’ কবিতাটী আবৃত্তি করেন। ঁরবীন্দ্রনাথের “ঁবৈকুন্ঠের খাতা’’ প্রহসন বিশেষ সাফল্য সহকারে অভিনীত হয়। উক্ত অভিনয়ে শ্রীঅধীরচন্দ্র ধর, বি-এল, শ্রীনরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী,এম-এ,বি-টি, শ্রীক্ষিতীশচন্দ্র ধর, বি-টি ও শ্রীমণীন্দ্রনাথ দাস বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন। ’’
‘কোচবিহারে রাজকীয় দুর্গোৎসব’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় ‘কোচবিহার দর্পণ’ পত্রিকার ২১ শে আশ্বিন, সন ১৩৪৫ সংখ্যায়। একই ব্যক্তির আরেকটি লেখা আমরা পাই ‘ নবদুর্গা, নবপত্রিকা ও নবগ্রহ’ নামে। প্রকাশিত হয়েছিল কোচবিহার দর্পণ পত্রিকায় ১৯৪৩ সালে। তরুণকৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাঁর ‘ পৌণ্ড্রদর্পণ’ পত্রিকায় পূজা সংখ্যা ১৩৯৫- এ এই লেখাটি পুনর্মুদ্রণ করেন। সপ্তম বর্ষে ১৩৫১ সালে আশ্বিন মাসে দর্পণ-এ জীবনকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘ দুর্গে দুর্গতিনাশিনী’ প্রবন্ধের শেষে এই টুকরো সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল- “কোচবিহারে রাজকীয় দুর্গোৎসব- প্রতি ন্যায় বর্ত্তমান বর্ষেও উৎসবের আয়োজন চলিতেছে। রাজকীয় সেই চিরাচরিত প্রথার ব্যতিক্রম না হইলেও বর্ত্তমান বর্ষে দুর্দ্দিনের প্রকোপে উৎসবের দিক দিয়া যে সংক্ষিপ্ত ভাব অবলম্বন করিতে হইবে—তাহা বলাই বাহুল্য। যদিও গরীবের ঘরে ঘরে অন্নবস্ত্রের হাহাকার তথাপি হিন্দুর দুর্গোৎসব ও মুসলমানদের ‘ঈদলফেতর’ পর্ব্ব  প্রায় এক সময় অনুষ্টিত  হওয়ায় বর্ত্তমান বর্ষে হিন্দুমুসলমান নির্ব্বিশেষে সকলেরই শুষ্ক মুখে হাসির রেখা দেখা দেখা দিয়াছে! উৎসব সফল হউক ইহাই আমাদের কামনা। ’’ এই অংশ থেকে কোচবিহারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ছবি পাওয়া যায়। ‘শ্রী শ্রী দুর্গাপূজা’ নামে প্রবন্ধ লিখেছিলেন জীতেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ‘কোচবিহার দর্পণ’ পত্রিকায়। ১লা কার্ত্তিক, ১৩৪৬ সংখ্যায় ‘অঞ্জলি’ পত্রিকার শারদ সংখ্যা নিয়ে একটি আলোচনা প্রকাশিত হয়েছিল- “ জেন্‌ঙ্কিন্স স্কুল পত্রিকা; শারদীয় সংখ্যা, ১৩৪৬ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রাক্তন – ছাত্র মহাশয়দিগের ও বর্ত্তমান ছাত্রগণের ইংরাজী, বাঙ্গলা বিবিধ রচনাসম্ভারে সজ্জিত হইয়া প্রকাশিত হইয়াছে । প্রবন্ধাদির অধিকাংশই সুখপাঠ্য। ছাত্রগণের রচনা আশাপ্রদ।’’

তরুণকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সম্পাদিত  ‘পৌণ্ড্রদর্পণ’ পত্রিকায় দুর্গাপূজা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। যেমন – ‘কোচবিহারে দুর্গাপূজার সেকাল ও একাল’ ( পূজা সংখ্যা ১৩৯৩) লিখেছিলেন ব্রজেশ্বরী বর্মা। প্রবন্ধের শুরুতে তিনি দেবীবাড়ির পূজা ও মদনমোহন বাড়ির পূজার কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর লিখছেন – “ রাজকুলের এই দুইটি দুর্গাপূজা ছাড়া সেকালে কোচবিহার শহরে জমিদার শ্রীসুশীলকুমার চক্রবর্তীর বাড়ীতেও প্রতিমা পূজার ব্যবস্থা ছিল। এছাড়া ব্রহ্মচারী কালীবাড়ী এবং রাধিকানন্দ ভট্টাচার্য্যের বাড়ীতেও দেশভাগের পূর্ব থেকেই প্রতিমায় দুর্গাপূজা হত। কোচবিহারে শহরে কেহ কেহ মহাষ্টমী দিন ঘটে পূজা দিতেন। এ ছিল কোচবিহারের সেকালের দুর্গাপূজা।’’ অনেক প্রাচীন দুর্গাপূজা বন্ধ হয়ে গেছে বলে আক্ষেপ করছেন- “ কোচবিহার শহরে শশধর ভট্টাচার্য্য, নলিনী তাকুকদার, অমূল্য বকসী, রাজেন্দ্রনাথ রায়, বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী ও প্রিয়লাল মুকুটী প্রমূখ মহাশয়গণের বাড়ীতে প্রতিমা দিয়ে তিনদিন দুর্গাপূজা হতকালক্রমে এই প্রতিমা পূজাগুলি বন্ধ হয়ে যায়।’’ এই লেখা থেকে আমরা আরো জানতে পারি যে- “ গ্রামাঞ্চলের মধ্যে নির্মল চন্দ্র মুস্তাফী (গোবরাছড়া গ্রামে) মনোমোহন বকসী, প্রমোদা বকসী, গিরিশ চন্দ্র লাহিড়ী (বামনহাট) প্রমূখ মহাশয়গণের গ্রামের বাড়ীতে তিনদিনই প্রতিমা পূজার ব্যবস্থা ছিল। এই পূজাগুলি অবলুপ্ত হয়ে গেছে। খাগড়াবাড়ী ব্রাহ্মণপাড়ায় ও কোন কোন বাড়ীতে তিনদিনই মহাপূজার আয়োজন হত। এই বাড়ীগুলিতে বেশীর ভাগই দুর্গার পিতলের মূর্ত্তিতেই পূজা হয়ে আসছে, এখনও হয়। কোন কোন বাড়ীতে তিনদিন যেমন হয়, আবার প্রতিষ্ঠিত পিতলের মূর্ত্তিতে নিত্যপূজাও হয়। মহাপূজা উপলক্ষে পিতলামূর্ত্তি বা ঘটে তিনদিনই পূজা হয়ে থাকে তার মধ্যে: ঁরাজেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, ঁভূমীন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, ঁচারুকেশ চক্রবর্ত্তী, ঁদেবেন্দ্রানন্দ চক্রবর্ত্তী, দুর্গানাথ চক্রবর্ত্তী, ঁভবশংকর স্মৃতিরত্ন, ঁধীরানন্দ ভট্টাচার্য্য, শ্রীমনীন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, শ্রীপ্রমোদেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী, শ্রীকেশবনন্দন ভট্টাচার্য্য প্রমূখ মহাশয়ের বাড়ীতে। এই পূজাগুলির মধ্যে কোনটি শতাধিক বৎসর থেকে চলে আসছে।’’ এই প্রবন্ধে সার্বজনীন পুজোর কথাও এসেছে। পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়া, হরিসভা, হাজরাপাড়া, কোচবিহার ধর্মসভার মধ্যে সবচেয়ে আগে কারা তা বলা কঠিন বলে আমাদের মনে হয়। স্বদেশচর্চা লোক পত্রিকার সেপ্টেম্বর ২০১৪- এর শারদ সংখ্যায় দীপক কুমার রায় লিখেছিলেন ‘উত্তরবঙ্গের প্রেক্ষাপটে বড়োবাড়ির দুর্গাপূজা’ প্রবন্ধে কোচবিহার জেলা নিয়ে যা লিখেছেন তার প্রায় পুরো অংশটাই উদ্ধৃত করছি-
“ ১. পূর্বপাড়া সিংহবাড়ির পূজা: কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ির অন্তর্গত পূর্বপাড়া সিংহবাড়ির পূজা প্রায় ২৫০ বছরের প্রাচীন। প্রতিমার কাঠামো তৈরি হয় রথযাত্রার দিন। ২৫৬টি বেলপাতা দিয়ে যজ্ঞ এবং সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে ১৭টি বলি। পারিবারিক রীতি অনুসারে এক বছর কলকাতায় এক শরিকের বাড়ীতে এবং হলদিবাড়ির সিংহবাড়িতে  পরের বছর পুজো দেবার রীতি।
      পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায় ঢাকায় বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার অন্তর্গত কামারখোলা গ্রামে রামস্বরূপ সিংহ রায়চৌধুরী প্রথম এই দুর্গাপূজা করেন, ১৯৪৯-এ হলদিবাড়িতে প্রথম এই দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।
. বাবুপাড়ার দুর্গাপূজা: কোচবিহার জেলার দিনহাটা শহরের অন্তর্গত বাবুপাড়ার বাগ্‌চি পরিবারের দুর্গাপূজা প্রায় শতবর্ষ উত্তীর্ণ।
. পূর্বপাড়া দত্তবাড়ির পূজা: কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ শহরের পূর্বপাড়া দত্তবাড়ির পূজা ২০১২ সনে শতবর্ষে পা দিয়েছে। একদা অবিভক্ত বাংলাদেশের ঢাকা থেকে মোহিনীমোহন দত্ত চলে আসেন কোচবিহারে। তিনিই দত্তবাড়ির দুর্গাপূজার প্রচলন করেনপূর্বপুরুষদের তৈরি কাঠামোতে প্রতি বৎসর দুর্গা প্রতিমা তৈরি হয়। বিসর্জনের পরে নদী থেকে কাঠটি বাড়িতে তুলে আনা হয় এবং পারিবারিক রীতি অনুযায়ী জন্মাষ্টমীর দিনে প্রতিমার কাঠামোটি মন্ডপে স্থাপন করে পূজার্চনা করা হয়। মূলত বৈষ্ণব মতেই পূজার্চনা করার রীতি। পূজা উপলক্ষে দরিদ্র নারায়ণ সেবার আয়োজন করা হয়।
. মহেশ্বরী ভবনের পূজা: দিনহাটার অন্তর্গত মহেশ্বরী ভবনের দুর্গাপূজা পারিবারিক পূজা হিসেবে স্মরণীয়। তবে এই পূজার ঐতিহ্য খুব পুরানো নয়।’’
        কোচবিহারের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব নীরজ বিশ্বাসের সংবাদ সামরিকপত্রে নির্বাচিত লেখালেখি নিয়ে প্রকাশিত ‘কোচবিহার প্রসঙ্গে’ বইতে অন্যরকম পূজার দেশ হিসেবে উঠে এসেছে কোচবিহার। স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে ইতিহাসের ভাষ্য। ‘ পুজোর দিনের দীর্ঘশ্বাস’ লেখায় বলেছেন তিনি- “ সত্যি কথা বলতে কি, কোচবিহারে বারোয়ারি ব্যাপারটা অন্য যে কোন জেলা থেকে অনেক পরে এসেছে। কারণ বলতে সরকারী প্রচেষ্টায় পুজো করা তো নিয়মই ছিল। আর তাতে যোগ দিতেন কোচবিহারের সমস্ত মানুষ।’’   
       
          কোচবিহারের দুর্গাপূজার বিবর্তন নিয়ে বড় লেখার ইচ্ছে রইল। অধুনা দুর্লভ পত্র-পত্রিকা থেকে সংগৃহীত পুজোর প্রতিবেদনে যদি উঠে আসে নতুন তথ্য কিংবা কোচবিহারের প্রাচীন দুর্গাপূজা নিয়ে নতুন আলো পাঠককে ইতিহাসের খোঁজে উদ্বুদ্ধ করে, তবেই এ লেখা সার্থক।
                               .....................
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ-
নৃপেন্দ্রনাথ পাল, ভাস্কর সেনগুপ্ত

(প্রকাশিত- শারদছন্দ, ১৪২৪)


No comments:

Post a Comment