ঠিকানা পেয়েই হোক, বা নিরুদ্দেশে
বাজারের গায়ে বাজার লেগেছে এসে...
তবু যদি দাঁড়িপাল্লা ছুঁয়ে না দেখে
তোমার কোলেই আজীবন মাথা রেখে
এই বসন্তে মরতেই চাই তবে;
তোমাকে কি আরও বেশি টাকা দিতে হবে?
সকালবেলা টকটকে লাল
বিকেল হলেই ঘন কালো
রক্ত কেবল প্রশ্ন করে
“ বলো আমায় কী বদলালো?”
মরিচঝাঁপি, বানতলার উল্লেখ পাচ্ছি এই কবিতায়। শেষ হচ্ছে এইভাবে—
স্বীকার করি আমি খারাপ
মেনে নিলাম তুমিই ভাল;
আমায় মেরে ফেলার পরে
জানিও শুধু কী বদলালো?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে পালাবদল প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। পরিবর্তনের সমর্থনে বুদ্ধিজীবীদের সোচ্চার ঘোষণাও মনে পড়ে আমাদের। দিনবদলের গান আমাদের ভালো রাখতে পারেনি। স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের মধ্যে হাইফেন হয়ে থেকে গেল সময়। ক্ষমতার বৃত্ত নিজের মধ্যে কীভাবে টেনে নেয় বিবেকের স্বর, তা নিয়ে নতুন করে না বললেও চলে। কবিতার সূত্রে অনিবার্যভাবে চলে আসে আরেকটি কবিতা। বিনায়কের ‘দাঁড়াচ্ছি দরজার বাইরে’ কাব্যগ্রন্থের ‘সিস্টেম’ কবিতার শেষের দুটি লাইন মনে পড়ে--
রমাকান্ত কামার--
তোমাকে যদি উলটে দিই তবুও তুমি রমাকান্ত কামার?
(২)
কবির রাজনৈতিক অবস্থানের সূত্রে সাংস্কৃতিক রাজনীতির স্বরূপকেও বুঝতে চাইছি আমরা—
মাংসখণ্ড ছুড়ে দিলে, কাক- কোকিলে ভিড় জমাবে
সেই ভিড়ে যে শিল্প খুঁজছে, সে-ই কি শিল্পী? সেও কি কোকিল?
‘সাফ কথা’ কবিতা থেকে কবির বিশ্বাসের সত্যকে চিনে নেওয়া সম্ভব—
চাই না মুকুট, চাই না গাড়ি
কিংবা ঘুষের টাকায় বাড়ি...
গুরুর মন্ত্র দিনরাত্তির বাজছে কানে;
একটা দণ্ডি, একটা ঝোলা
পথই আমার বাবা ভোলা
ভালবেসে টানছে কেবল শ্মশানপানে...
জন্মভূমি নিলাম করে, নগদে বখশিস নিল যে
ঘেন্না আমার, হাত থেকে তার
আমায় বাঁচায়;
স্কটল্যান্ডের ঝর্না আমি দেখিনি তাই দেখতে চাই না
পুড়তে পুড়তে আমার শরীর গঙ্গাকে চায়!
কবির উপন্যাসকে যদি দেখা যায় কবিমনের সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে, তবে অবশ্যই আসবে ‘মন্ত্র’ আখ্যানের প্রসঙ্গ। ঠাকুর শ্রীশ্রী দুর্গাপ্রসন্ন পরমহংসদেবের শিষ্য বিনায়ক জীবনকে যেভাবে দেখেন ও দেখান, তার মূলে থাকে ভারতীয় দর্শনের সার্থক উত্তরাধিকার। বিশ্বায়ন যখন কেড়ে নিচ্ছে আমাদের প্রজন্মবাহিত স্মৃতি ও সংস্কারকে, প্রগতিশীলতার নামে উদ্বাস্তু করতে চাইছে বিশ্বাসের মাটি থেকে; সেসময় বিকল্প স্বর হিসেবে বিনায়ক তুলে আনেন প্রতিরোধের বয়ান। পুরাণের নবনির্মাণে চমৎকৃত হই আমরা। ‘অন্ধকারে তুমিই বিগ্রহ’ কাব্যগ্রন্থের ‘হনুমান’ কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করতে ইচ্ছে করছে— “ চোখ বিঁধলেও তুমিই বেরোতে, জিভ কাটলেও তুমি/ শ্মশান যেখানে স্থাপিত সেও তো আমারই জন্মভূমি...”।
(৩)
বিনায়কের কবিতায় প্রেম ও অপ্রেমের দ্বন্দ্ব বড়ো জায়গা জুড়ে আছে। ‘জোছনা থেকে জুয়া’ কাব্যগ্রন্থের ‘বিষণ্ণ বৈভবে’ কবিতায় লিখছেন— “সকালের পুজো, সন্ধ্যার ধান্দায়/ মিশে যেতে যেতে সে আমাকে বলে যায়,/ ভালবাসা মানে জানলা না-ছোঁয়া হাওয়া/ যাকে ভালোবাসি, তার কাছে রেখে যাওয়া।” হাওয়া এবং চাওয়ার কথা পাই ‘থামো’ কবিতাটিতেও— অনবদ্যভাবে বলছেন—“ ভিতরে তাই ঢুকিনি আর থেকেছি রাস্তায়/ নরক জানি, আদর পেলে তীর্থে পাল্টায়/ পাল্টায় না বিগ্রহই, মাটি কিংবা সোনা/ নাই বা ভালবাসলে তুমি ঘেন্না ছড়িয়ো না...”। বিনায়কের কবিতা ভালোবেসে এই নশ্বর জীবনকে ছুঁয়ে অবিনশ্বর হয়ে ওঠে--- “ তুমি বাটা খেয়ো, ভাজা খেয়ো, আইওয়ায় আমি রাঁধছি শুনে যে ঢ্যাঁড়শ- পোস্ত খেতে চেয়েছিলে, পারলে তাও খেয়ো। পুরনো ইচ্ছেটাকে আমি অন্তরে রূপ দিলাম, তুমি অন্তরে গ্রহণ করে দ্যাখো, পৃথিবীতে অতিকায়, দানবীয়, কংক্রিট কিচ্ছু নেই, সব এই পোস্তর মতো ছোট, দানা দানা, মায়াময়; ভালবাসায় টসটস করছে...”।
বিনায়কের কবিতায় প্রেম-রাজনীতি-সমকাল এমনভাবে জড়িয়ে থাকে মায়ার বন্ধনে, সবসময় আলাদা করা যায় না বিষয়ভিত্তিক। ‘গ্রাম- শহর’ কবিতার মধ্যে যেমন মধ্যবিত্তের দ্বিচারিতার ছবি স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়েছে—
গ্রামে কিছু জটিলতা আছে
শহরে শীতের মজা
একদম সরল;
বাবা-মা’কে ওল্ড এজ হোমে রেখে এসে
শরণার্থীদের দুঃখে,
ছেলের দু’চোখ ভরা জল।
‘ফেসিয়াল’ কবিতায় পাচ্ছি—
শিখিয়েছিলে কতটা ভারে ঠিক কতটা ধার/ বারান্দায় কুষ্ঠরোগী, ঘরেই পার্লার।
কবিতা হয়ে ওঠে অনেকার্থদ্যোতক। যা কিছু অন্তঃসারশূন্য, মিথ্যে, ঠুনকো; চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন কবি নিজস্ব কাব্যশৈলীতে। ভাষার জটিলতা যেখানে বিষয় থেকে বিচ্যুত করে না পাঠককে। জনপ্রিয়তার নন্দনতত্ত্ব দিয়ে বিনায়কের কবিতার বিশ্লেষণ পুরোপুরি সম্ভব নয়। তাঁর লেখায় অন্তর্ঘাতের প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ‘নিজের বিরুদ্ধে যাওয়া চাই’ উচ্চারণ ভাবিয়ে তোলে আমাদের। ভাবিয়ে তোলে এই বিনাশী, অস্থির সময়েও কবির সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি। যেমন- ‘তবুও’ কবিতাটি--
তবুও
অতবড় ব্ল্যাকবোর্ড
সাদা হয়ে যায়
ছোট্ট একটা চকের ছোঁওয়ায়
আর কিছু বলার নেই। থাকতে পারে না। শিল্প সার্থক হলে মানুষ যে ভাষা হারিয়ে ফেলে!
No comments:
Post a Comment