রোদে হেলান দিয়ে বসে আছে আমাদের শৈশব। চালের বস্তার ওপর খোলা রয়েছে ভূগোল অনুশীলনী। সকালে বারান্দায় রোদ আসে কুট্টিদাদের বাড়ির চাল পেরিয়ে। বড়োরাস্তা থেকে রোদকে আসতে অনেকগুলো বাড়ি ছুঁতে হয়। পথে শিশিরের সাথে মাখামাখি হয়ে সামনের মাঠে যখন বসে থাকে ঘুম ভাঙাবে বলে, আমরা তখন খেলতে বেরোই। ফুটবল। শার্টের কলারটা টেনে লম্বা করার চেষ্টা করতে থাকি। বাবুদের বাড়ি গিয়ে বলি- কিরে উঠে পড়। টিনের দেওয়াল ভেদ করে শব্দ পৌঁছে দি- সূর্য উঠে গেছে রে...
নারকেল পাতার মধ্য দিয়ে, গাড়ির গ্যারাজের টিনের ভেতর দিয়ে রোদ আসতে থাকে। নরম, লেপের ওমের মত। তাকানো যায় দিব্যি। ফুলের প্লাস্টিকে রোদ ভরতে থাকে কেউ কেউ। দাঁতন করে কুলকুচি করতে করতে যখন সূর্যের দিকে তাকায়, এর মধ্যে টাইম কলে জল এসে যায়। ব্যস, রোদ দাঁড়িয়ে পড়ে লাইনে। টুগবুগ করে জল ভরা হতে থাকে, মুখের বুলবুলিতে যেন রোদ আস্কারা দেয় আমাদের। তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে দু’এক কথা বলি। দেখতে পাই আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট, টব, বারান্দা, সাইকেল... কুসুমদের বাড়ি থেকে গানের সুর ভেসে আসছে। রোদ তাতেও মিশে যাচ্ছে।
সকালের চা-মুড়ি খেয়ে ঘরে ঘুম পেত বলেই বাইরে পড়ার ছলে চলে আসা বই নিয়ে। বেড়াল কুকুরগুলো ততক্ষণে রোদ পোহানো শুরু করে দিয়েছে। পড়ার চেষ্টা করছি ভারতের ইতিহাস। এর মধ্যে রোদের তেজ বাড়ছে কমছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি ইচ্ছে করে রোদ এসব করে। আমাদের কোচবিহারে প্রতি বছর দিন দশেক রোদ ওঠে না। এমনভাবে কুয়াশা ঘিরে রাখে সুয্যিমামাকে, টেনে বার করে কার সাধ্য। রোদ না উঠলে ভালো সময় বোঝা যায় না। মা ঘুম থেকে উঠেই বলে- হায় হায় আজ অফিসের দেরি হয়ে যাবে। এমন দিনে আমার স্নান করতে ইচ্ছে করে না। বেলা অব্দি অপেক্ষা করতে থাকি রোদ উঠলে স্নান করব। গা ধুয়ে রোদ পোহাতে চলে যাই মাঠে। দেখি লেপগুলো শুকোতে দিচ্ছে কাকিমা। দুমদাম করে তোশকের ওপর লাঠি মারতে থাকে মানসদা। ধুলো ওড়ে। আর ধুলোর মধ্যে আবার খুশি রোদ এসে পড়ে। আমি দেখতে থাকি। আর ভাবি রোদ সব কিছু দেখতে পায়। সবখানে যেতে পারে।
রোদের চলাচল আমাদের বাড়িতে অন্তত আমি জানি।
ছায়াছবির গল্পে ডুগি তবলা শুকোতে দিই। মা আলমারি থেকে মাঝেমাঝে বের করে ন্যাপথালিন
দেওয়া জামা কাপড়। বাবা পুরোনো ফাইল ঘাটতে বসে। আমাদের বাড়িতে উৎসব লেগে যায় যেন।
আমিও জমানো মাটির পুতুলগুলো বের করি। মিঠে রোদের ভেতর বাঁশি বাজাতে থাকেন কৃষ্ণ
ঠাকুর। পাশেই দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ।
আকাশ আমায় কেমন করে আলোয় ভরিয়ে দেয় রোদ না
থাকলে জানতাম?
আচারের শিশি উষ্ণ আদর না চাইলে আমরা খোঁজ পেতাম নাকি তাদের? শীতের আলো বেশ ভালো। ভ্রুকুটি নেই। শাসন নেই। মাথাগরম নেই। সকালবেলা মেয়েরা যখন
দলবেঁধে পড়তে যায়,
সেসময় রোদ লাগে ওদের মুখে। ওরা হাসতে হাসতে ঘাড় কাত করে বেণী করে
নিয়ে যায় প্রাইভেটে। তারপর স্কুল। বিকেলের ঠিক আগে রোদ নরম হয়ে আসে আরো, কোনো একলা মুখে আলো পড়লে কেমন একটা ভেতরে হয়। আকাশে মেঘের গায়ে মেখে থাকে
অদ্ভুত সব রঙ... ঝুপ করে বিকেল ফুরিয়ে আসে। রাস্তার আলো জ্বলে ওঠার পর রোদ ধীরে
ধীরে চলে যায়। আমি আবার অপেক্ষা করতে থাকি। সকালের।
জন্মান্তরের রোদের গন্ধে চমক লেগে দেখি রাজনগরে তোর্সার পাড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করে যাচ্ছে এক কিশোর আর কিশোরী। ঠাণ্ডা হাওয়া জলের বুকে ধীর কাঁপন তুলছে। দূরে দেখা যাচ্ছে রাজবাড়ির গম্বুজ। ওরা গল্প করেই চলেছে। আলো লাগছে ওদের গায়ে। ওদের মুখ দেখতে পারছি না। কিন্তু আজ বুঝতে পারছি ওদের নাম আমি জানি। আপনারাও জানেন। মেয়েটির নাম জবা। ছেলেটির নাম রোদ্দুর!
No comments:
Post a Comment