Thursday, 11 April 2024

বহুরূপী

 



সে ছিল এক বহুরূপী দিন চৈত্র মাসে চড়ক পুজোর দল বাড়ি বাড়ি ঘুরতো সংক্রান্তির ঠিক আগের দিন উৎসব যেন বহুরূপীদের পেছন পেছন বাচ্চাদের খুশির ছুট সারি বেঁধে হেঁটে চলা জ্যোৎস্নার পথ হ্যাজাকের আলোয় বিশিষ্ট কোনো বাড়িতে জমাটি রূপানুরাগ শিব-পার্বতী পার্বতীর সস্তা পাউডার উপচে ভেসে উঠতো দাঁড়ির রেখা বগলতলা ছিঁড়ে গেছে রঙিন নেট জামার পাড়ার রাখাল যে জন্মাষ্টমীতে গোপাল সাজতো, কালীপূজার আগে জিভ বের করে জয় মা কালী সারা গায়ে রং - ছাপ গ্রামীণ পরবে অনিবার্য ছিল রূপের বৈভব শহরেও দেখা যেত বহুরূপীদের হনুমানের লেজের পেছন পেছন বাচ্চারা ছুটছে পোয়াল দিয়ে লেজ বানানোর খেলা আমরাও যে খেলেছি ঘুড়ির লেজ মনে পড়ে রাফ খাতা ছিঁড়ে সাদা ভাত টিপে টিপে সে এক আকাশ উড়ান জয় হনুমান সিরিয়াল হত তখন এদিকে আমাদের কাছের হনুমান লঙ্কায় আগুন লাগানোর বদলে শ্যামল বিড়িতে দিচ্ছে এক টান তারপর গদা হাতে বাজারে তান্ডব নয়, হাত পেতে দিন গুজরানের আশায় পৌরাণিক চরিত্রগুলির মূর্ত রূপের এক নিদর্শন হল বহুরূপীরা আমরা তাঁদের শিল্পী বলিনি কোনোদিন আমরা তাঁদের বলিনি এক অঙ্গে এত রূপ কীভাবে ধরতে পারতেন তাঁরা?

ট্রেনের কামরায় কামরায় এখনও দেখা মেলে স্কুলছুট নন্দলালাদের খালি পা হাতে বাঁশি ঝলমলে পোশাকের ভেতরে ভেতরে এক ক্ষুধার্ত হৃদয় কামরায় লজেন্সের হকার উঠলে চোখ চলে যায় প্লাস্টিকে ভুলে যায় থেকে থেকে সে আসলে রাখাল রাজা বহুরূপীরা কেন হারিয়ে যাচ্ছে? আসলে আমাদের বিস্ময়ের পরিধি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, মুগ্ধতারা সর্বহারা আমাদের পোকেমন শৈশব ছোটাভিমের কার্টুন দেখেই সন্তুষ্ট থাকে তাদের অভিভাবকরা বহুরূপীদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চায় না আর বিশ্বায়ন আমাদের বিনোদনের স্বরূপ পাল্টে দিয়েছে আর জীবন যেখানে জি বাংলা, বহুরূপীরা সেখানে বিলীয়মান সংস্কৃতির স্মারক হয়ে থাকবে-- এটাই স্বাভাবিক তবে শেষ কথা বলে হয়তো কিছু হয় না প্রতিটা মানুষ যখন এক অর্থে বহুরূপী, তখন এই আলোর রূপের মানুষদের মুখ বেশি বেশি দেখতে ইচ্ছে করে ভাবতে ভালো লাগে আমাদের ভারতবর্ষে শ্রীরাম সাজছেন যিনি তাঁর আসল নাম মহম্মদ!

 

Monday, 25 November 2019

ও চিরপ্রণম্য শক্তি


স্মৃতির থেকে একমুঠো দিন জন্মদিনে ঢেলে সাজালে

সবাই মিলে বসে থাকতুম, তোমায় ঘিরে বৃদ্ধজাতক!

                                                   (জন্মদিনে/ শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

বেঁচে থাকলে আমরা সকলে মিলে কবির পঁচাশি বছরের জন্মদিন পালন করতাম। ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে ভরে থাকত ছবি, কবিতা। কবিদের মৃত্যু হয় বিশ্বাস করি না। কিন্তু শারীরিক উপস্থিতি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করব এমন সাধ্য যে নেই। মনকেমনের মন্দে-ভালোয় ‘পদ্যসমগ্র’-র পৃষ্ঠা উল্টে চোখ আটকে যায় একটি কবিতায়—

হলুদ শস্যের মধ্যে হাত পেতে রয়েছে দাঁড়িয়ে

একা লোকটি, হাত পেতে দাঁড়িয়ে রয়েছে,

হলুদ শস্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে

সারাদিন।

অন্নপূর্ণা, অন্ন দাও- ব’লে সেই যোজন বিস্তৃত

মাঠে, একা দাঁড়িয়ে রয়েছে।

পূর্ণ হয়ে যায় তার শূন্য করতল--

      

একা লোকটির দাঁড়িয়ে থাকার ছবি আর শূন্য করতল পূর্ণ হয়ে যাওয়ার দার্শনিক অনুভব মিশিয়ে কবিতাটি একটি প্রার্থনাকে জাগিয়ে রাখে। আধুনিক কবিতার প্রেক্ষিতে কীভাবে ধরব তাকে? আধুনিক বাংলা কবিতার টেকনিকসর্বস্ব হয়ে ওঠার প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। ত্রিশের কবিদের পাশ্চাত্যমুখীনতার বিপ্রতীপে পঞ্চাশের কবিদের ঘরে ফেরার তুমুল ইচ্ছে নব্য-আধুনিকতাকে সূচিত করেছিল। শক্তির কবিতায় অবনীকে কবির অন্তর্গত সত্তা হিসেবে ধরা যেতেই পারে। কিন্তু বহুভাবে চেনা বাড়ি যে মেলে না আর। যেমন আমরা পড়েছি ‘কিছুতে মেলেনি’ কবিতায়। আশ্রয়ের খোঁজ যেমন কবির নিজস্ব, তেমনি অসুখের অনুভবও। ‘বলো, ভালোবাসা’ কবিতার প্রথম পংক্তিটি এরকম—‘এই হাসপাতালে এসে দেখি শুধু আমার অসুখ।’ কবিতাটি শেষ অংশটুকু এরকম—“বলো, ভালো আছো আর তোমার অসুখ সেরে গেছে/ বলো, ভালোবাসো তাই তোমার অসুখ সেরে গেছে।” যুক্তিটি লক্ষ্যণীয়। আমাদের মনে পড়ে অশ্রুকুমার শিকদারের একটি লেখার কথা, যেখানে তিনি বলছেন-- “আধুনিক কবিতায় যেমন থাকে, তেমনি আয়রনি আমরা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় পাই না, পাই না নাট্য লক্ষ্মণ। কবিতার বক্তা ও কবির মধ্যে গড়ে ওঠে না কোনো দূরত্ব। শক্তির কবিতা সরাসরি কবির স্বরূপের কবিতা; এই কবিতাগুচ্ছের শ্রেষ্ঠ মুহুর্তগুলিতে অবশ্য তিনি উত্তীর্ণ হন ‘ব্যক্তিগত আমি থেকে আত্মগত আমিতে।’   

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার রাজনৈতিক উপাদান নিয়ে তুলনামূলকভাবে আলোচনা কম হয়। আপাদমস্তক রোম্যান্টিক আজন্ম স্বেচ্ছাচারী কবিসত্তাকে প্রায় মিথে পরিণত করে দিয়ে আমরা কি ভুলতে বসেছি ‘সকলে প্রত্যেকে একা’ কাব্যগ্রন্থের ‘নৈরাজ্য, প্রতীক যেন’ কিংবা ‘যে হিবরুগান তুমি’ কবিতাকে? ‘অপরূপভাবে ভাঙা, গড়ার চেয়েও মূল্যবান/ কখনো-সখনো’ কিংবা ‘প্রতিষ্ঠান ভেঙে যায় বহুদিন সুসময় লেগে’—এই পংক্তিদুটির মধ্যে কি অন্য অন্তর্ঘাতী অভিঘাত নেই? আসলে কবি ও কাঙালের যন্ত্রণার পথকে আমরা আদৌ ধরতে পারিনি। অসুখের একমাত্র উপশম যে ভালোবাসা আকাশের মতো ব্যাপ্ত। আধুনিকোত্তর ভোগসর্বস্বতা দিয়ে তাকে বুঝতে পারা সম্ভব নয় কখনোই। আমাদের জীবনের সম্পর্কেরা যে দুঃখ দেয়, তাকে আগলে রাখার মন আছে আমাদের? জানি না। এটুকু জানি, সারাজীবন ধরে একটি কবিতাই লিখতে চেয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সে কবিতার নাম কি হতে পারে সেটা ভাবি মাঝেমাঝে। কখনও মনে হয়—‘সকলে প্রত্যেকে একা’, কখনও মনে হয়- ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’। সংসারে সন্ন্যাসী ছিলেন যে মানুষটি তাঁর কবিতা লেখা ছাড়া যে আর কোনো উপায় ছিল না। কেননা কবিতা ‘নিজেকে নিজের মত করে দেখার জলজদর্পণ এক’। অথচ—“কোনো প্রেরণা না, কোনো সনির্বন্ধ ভালোবাসায় না—শুধুমাত্র চ্যালেঞ্জ-এর মুখোমুখি এসে এইসব পদ্য লেখা”। এক অভিজ্ঞতা থেকে আরেক অভিজ্ঞতার যাত্রাপথ যেন ধরে রাখা কথায়-কবিতায়। যেখানে সংশোধনের কোনো তাগিদ নেই, কেবল আছে আত্মপ্রকাশ আর আত্মানুসন্ধানের দুর্মর সংরাগ। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ভীষণভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন প্রেমে-অপ্রেমে, আবেগে-আশ্লেষে, ভিতরে বাহিরে, দুঃখে অ-সুখে। অস্তিত্ববাদী কবিকে আমাদের জন্মদিনের প্রণাম। ফিরে পড়তে চাই অমোঘ পংক্তিগুলি--

       …বাঁচতে চাই, বেঁচে থাকতে চাই

শুধু বাঁচা, অহরহ মৃত্যুর ওলোটপালোটের

মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই, শুধু বাঁচতে চাই।

Friday, 4 October 2019

পুজো ভালোবাসা



মহালয়া

মহালয়া মানে ভোর

শিউলি কুড়নো ফ্রকের আঁচল তোর!

 

আমাদের রুগ্ন রেডিও এই দিনটায় সবার মনোযোগ আদায় করে নিত।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত গলাতে মনে হত কিছু বিস্ময় এখনও বাকি, রহস্যটাও!

 

বাজলো তোমার আলোর বেণু

সকাল বলে দিত মা আসছেন।                               

পরদিন অঙ্ক পরীক্ষার সিঁড়িভাঙা ধাপগুলো আকাশে ছড়ানো...

মেঘেদের মন, ও মেয়ে তুমি কিছু জানো?

 

ষষ্ঠী

প্রতিবারের মত এবারেও গম্বুজটা একদিকে হেলে গিয়েছে।

ঠাকুর এসেছে কতক্ষণ...

অস্ত্র অবশ্য আসেনি, পরে আসবে।

ঠাকুরকে এখনও ঠিক ততটা ঠাকুর বলে মনে হচ্ছে না।

পুজো হয়নি যে!

 

সন্ধে ঘনাচ্ছে। ঢাক বাজলো। আলোলিকা।

তুমি যেখানে যেখানে ছুঁয়েছো, সেখানেই বোধন!

 

 সপ্তমী

সকালের রোদ বলে দেয় আজ...

ক্যারাম পিটিয়ে যাচ্ছি কনফার্মড হচ্ছে না।

ঠাকুরমশাই পুজোর উপকরণ খুঁজে পাচ্ছেন না।

আর আমি পাচ্ছি না তোমাকে।

তুমি তো ঘুরতে এসেছো, কাকে বলবো কাকে?

 

দুপুর এখন মাইক বাজাচ্ছে পুজোর গান

তুমি আসছো, ভালোবাসছো, ও সর্বনাম!

 

 অষ্টমী

 সকাল সকাল স্নান সেরেই পাঞ্জাবি...

উপোস শুনলেই খিদে পেয়ে যায় তবু

বছরে তো একটা দিন।

কখন অঞ্জলি হবে বুঝতে পারছি না

লাল সাদা ঢাকাই-তে সে এলো

বড্ড অসুর হতে ইচ্ছে করলো।

সারাজীবন শুভদৃষ্টি, অস্ত্রাঘাতে- রক্তপাতে-

 

ফুলটা পা অব্দি পৌঁছুবে না জানতাম।

কোথায় গেল আমি আর দেখিনি।

কেননা উপোস আর নেই।


জয় মা জয় মা দুর্গা দুর্গতিনাশিনী।

 

নবমী

নয় নয় করেই নবমী আসে

বিষণ্ণতার খুশি ছায়া ফেলেছে আকাশে।

রোদটা কম, মাইকের আওয়াজটাও অভিমানী

রাত ফুরোলেই ভেসে যাবে, জানি।

 

আরতি হচ্ছে। ভোগের।

তুমি সেই দূরে দাঁড়িয়ে আছো যেখান থেকে সব দেখা যায়,

কিন্তু অন্য কেউ...

 

মনে মনে আগুন নিয়ে বলি-

ওগো নবমী নিশি না হৈও অবসান!

 

দশমী

সকাল থেকেই গভীর আঁধার নেমেছে, জানা...

আজ দশমী, বিষাদ, সানাই...

 

একে একে নিভিছে দেউটি। ফিরে যাচ্ছে আলো, তাঁবু, চেয়ার...

ঠাকুরের মুখে হাসি নেই।

অস্ত্র নেই কোনও। মুখে পান।

অসুরের পা নিয়ে শিশুর প্রণাম!

 

তুমিও এসেছো, সিঁদুর ছুঁয়েছে দুই গাল

আমি যে মনকে বলি-- সামাল সামাল।

 

অপেক্ষা করবোই, তুমি আসবে বললে যেই-

সেই তো জেনে যাওয়া ভালোবাসার বিসর্জন নেই!