পৃথিবীর তিনভাগ জল আর একভাগ স্থল। আমাদের প্রাথমিক ভূগোলবোধ জল বাদ দিয়ে নয়। আমাদের অস্তিত্বের বোধে সমুদ্র অনিবার্য। বাংলার মানচিত্রে তার নাম বঙ্গোপসাগর। “সাহিত্যে, বাংলা সাহিত্যেও, সমুদ্রকে পেয়ে যাই- কখনো কম কখনো বেশি। কিন্তু তবু, না মেনে পারি না, সব-মিলিয়ে বাঙালির মনে সমুদ্রের খুব- একটা জায়গা নেই।” আলোচ্য ‘সমুদ্রের কবিতা’ সংকলনের ভূমিকায় অরুণ সেন- এর মন্তব্যটিকে স্বীকার করতেই হয়। সমুদ্র নিয়ে কবিতার এই সংকলনের ভাবনাবিন্যাসে পূর্ণেন্দু পত্রীর সশ্রদ্ধ উল্লেখ করেছেন সম্পাদক। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধকাব্য’-এর প্রথম সর্গের অংশবিশেষ দিয়ে শুরু হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমুদ্র’, ‘জন্মদিনে ৯’, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ অন্ধকারে সমুদ্রের প্রতি’, নজরুল ইসলামের ‘সিন্ধু’, জীবনানন্দ দাশের ‘সিন্ধুসারস’, ‘জুহু’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উন্মার্গ’, অমিয় চক্রবর্তীর ‘সমুদ্র’ প্রভৃতি কবিতা ঠাঁই পেয়েছে এই বই-এ। সম্পাদকের দীর্ঘ ভূমিকা এই বই-এর বিশেষ সম্বল। অরুণ সেন লিখছেন-- “বাংলা ভাষায় রচিত সমুদ্রকবিতার সেই পরম্পরাকে এখানে ধরা হল এমন নয়, কিন্তু সমুদ্রের মতো যে-কোনো প্রাকৃতিক বিষয়কে ধরেই যে কবিতা ও ইতিহাসের সম্পর্কের নানা সত্যকেই খুঁজতে শুরু করা যায়- তার একটা নমুনা পাওয়া যাবে হয়ত। ’’ কবির আত্মসচেতন এবং অবচেতনের অবিরত ঈশারায় সমুদ্র যে বিস্তার নিয়ে হাজির হয়, আক্ষরিক অর্থেই ডুবে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না!
সমুদ্রের স্বাদ আমাদের রক্তে। আপনাকে এই জানতে চেয়েই আমরা হয়ত নীলের কাছাকাছি-‘সিন্ধুসারস’ কবিতায় যেমন লিখছেন জীবনানন্দ-- “তুমি তাহা কোনোদিন জানিবে না; সমুদ্রের নীল জানালায়/ আমারই শৈশব আজ আমারেই আনন্দ জানায়।’’ সোমেন পালিত অবশ্য জুহুর সমুদ্রপারে কিছুটা স্তব্ধতা ভিক্ষা করেছিল। ‘সমুদ্রঃ ছিন্ন চরণ’ অংশে বিনয় মজুমদারের কবিতার খসড়া মনে পড়ে-- “যখন সমুদ্রজলে একটি গিটার ভেসে চলেছে এখন/ যখন সকলে ডুবে নিশ্চিহ্ন হয়েছে সব হারিয়ে গিয়েছে/ তখন সমুদ্রজলে একটি গিটার ভেসে ভেসে চলছে এখন...’’ গিটারের চলনে হৃদয়ের দ্বার খুলে যায় কি? কবির অন্তঃপ্রেরণার সঙ্গে সমুদ্রের অনিবার্য যোগাযোগ নিত্য নতুন অভিমুখ খুলে দেয় জীবন, সম্পর্কের? ‘ সমুদ্র হবার অভিলাষ’ কবিতায় বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত লিখেছেন যেমন- “… পরস্পরের ঢেউ হয়ে, সমুদ্র হবার অভিলাষে/ একদিন/ নিঃসঙ্গ হয়েছিলাম সকলের ব্যক্তিগত বোধে।… ’’ যে কোনও বড় কিছুর সামনে দাঁড়ালে নিজেকে অ-সামান্য লাগে। অস্মিতার বোধে ঢেউ এর পর ঢেউ এসে কাঁদায়, হাসায়, ভালোবাসায়। চেনা সম্পর্কের পৃথিবীতে নোনা বাতাস লাগে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ‘গার্হস্থ্য সমুদ্র একাকার’ কবিতার শেষে দেখি-- “আমরা দাঁড়িয়ে থাকি আমাদের দু-মুঠি সংসারে/ সম্বল বলতে শুধু কোলকাতা যাবার ভিসা’’, জাগ্রত চন্দনেশ্বর দেবতার মন্দিরে না গিয়েও কবি মনে লেগে থাকে এক অদ্ভুত সুগন্ধ- মৌতাত! আর রোম্যান্টিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ দেখা হবে’ কবিতার তুমুল উচ্চারণ করছেন - “… কিছু না বলার ভাষা, গরম ওষ্ঠের শিলালেখ/ ঠিক সে সময়/ রাত্রির সমুদ্র হবে সশরীর রাত্রির সমুদ্র/ হবে, দেখা হবে।’’ ‘দেখা হবে’ শব্দবন্ধটি অবিরত ঘুরে ফিরে আসে। ধ্রুবপদের মত। সার্থক কবিতা চিনে পাঠকের কাছে বিষয় অনুযায়ী বিন্যস্ত করে পরিবেশন করা সহজ কাজ নয়। আরেকটি কথা কোনো সংকলনই সম্পূর্ণ নয়, না হওয়াই স্বাভাবিক। সমগ্রতার আদল পাঠকের মনের মধ্যে নিজের মত করে যদি তৈরি করে দিতে পারেন সম্পাদক, তবে শূন্য পরিসর পূর্ণ হবে সহজ সুরেই সন্দেহ নেই।
আমাদের দেখা-না-দেখায় মেশা সমুদ্র দর্শনে নারীদের কবিতা যে অন্যমাত্রা রাখবে, তা বলা বাহুল্য। নবনীতা দেব সেন লিখছেন ‘গঙ্গাসাগর’ কবিতায়-- “ তুমি মোহনায় থেকো/ আমি মোহনার দিকে যাই।’’ মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘জাহাজডুবি’ কবিতার অংশ উদ্ধৃত করছি- “ আমি কি জানতাম সারাটা রাত ধরে অতটা যেতে পারে শৃঙ্গার!/ নরম একটুও হল না অনুনয়ে, জাহাজে শুধু দোলা লাগল’’- কী অসামান্য চিত্রকল্প। সমুদ্রের কবিতায় শরীর আসছে, শৃঙ্গার আসছে। আবার ঝিনুকে ঠোঁট কেটে খোলা সংসারের গল্প পাচ্ছি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের ‘গোয়েন্দা কবিতা’য়- “ যে-সব শরীরে একবার সমুদ্র ঢুকেছে, তারা/ সুইসাইডাল নোট লিখে রেখে যেতে আর সময় পায়নি।’’ প্রেম আর মৃত্যুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা জানি আমরা। সিদ্ধেশ্বর সেনের ‘প্রকৃতি-পুরুষ’ কবিতায় সমুদ্র এসেছে সৃষ্টির আদিকল্পে। ‘শুধু রাতের শব্দ নয়’ কবিতায় শেষ সমুদ্রে যাত্রার আয়োজনে আশার অমরত্ব ঘোষণা করলেন কবি অরুণ মিত্র। আর এভাবেই সমুদ্র হয়ে উঠেছে জীবন সঙ্গীত।
পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের একটি পংক্তি মনে রাখবার মতো-- ‘… প্রত্যাশা হল সমুদ্রের অন্তহীন ফেনা।…’ আমাদের বেঁচে থাকা নতুন এক অর্থের মুখোমুখি হয়। সবিনয়ে জানাতে চাই, সাম্প্রতিক সময়ে অনুনয় চট্টোপাধ্যায় ও উর্বী মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ বাংলা সাহিত্যে সমুদ্র’ শীর্ষক আলোচনা গ্রন্থটি। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সমুদ্রের উপস্থিতিকে নতুনভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারবেন উৎসুক পাঠকেরা। আমাদের কবিতার সমুদ্রে বুদ্ধদেব বসুর ‘সমুদ্রস্নান’ কবিতার অংশবিশেষ দিয়েই ইতি টানি সহজপাঠের- “একবার নিজেকে দাও না সমুদ্রের কাছে/ তারপর দ্যাখো সে তোমাকে নিয়ে কী করে।’’
……………
সমুদ্রের কবিতা
অরুণ সেন সম্পাদিত
প্রতিক্ষণ
প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ১৯৮৮
নতুন পর্যায়ের প্রথম সংস্করণ
জানুয়ারি ২০১৭
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ- পূর্ণেন্দু পত্রী
মূল্য- ৯০ টাকা

No comments:
Post a Comment