Friday, 21 July 2017

সুখের মুহূর্তগুলি : তারেক কাজীর কবিতা

 

‘অদৃশ্যে নিজেকে রেখে যেন রেওয়াজে বসেছ।’- তারেক কাজীর ‘বিপন্ন মেঘের  দল’ কাব্যগ্রন্থের ‘বসন্ত’ কবিতার এই উচ্চারণকে তাঁর কবিতা সম্বন্ধেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। ‘সুখের মুহূর্তগুলি’ কবিতার বই-এর প্রথম কবিতা ‘শ্রাবণ’, শেষ হচ্ছে এই ভাবে- “আরও একটা বরষা শুরু হল, মাঠে মাঠে লাঙল পড়ল... ধান ছাড়া রোয়া হল...কালসিটে মানুষগুলো বগলে সন্তান আঁকড়ে দেখতে শুরু করল ডালভাতের স্বপ্ন... ’’ কালসিটে শব্দটির ব্যবহার নিয়ে ভাবতে ভাবতেই মনে হতে থাকে যে, এই সামান্য ডালভাতের স্বপ্নই বুঝি অসামান্য। চিরন্তন। বাংলা কবিতার ভূগোলে গ্রামজীবনের ছবি আরও বেশি করে উঠে আসা দরকার। যেমন দরকার সংখ্যালঘু মানুষের দিনযাপনের সঙ্গে আন্তরিক পরিচয়। ‘আহাদ্‌’ কবিতায় কবি বলছেন- ‘হাদিস বর্ণিত নির্মম দোজখ কিংবা খুশবুময় জান্নাত- দুটিই আমার কাছে পাহাড় চূড়ায় ফুটে থাকা বসন্তের অচেনা ফুলের মতো।... জানতে ইচ্ছে করে কোন রহস্যে এখনও ওই আট জান্নাত এবং সাতদোজখের মাঝে আমাদের ছেড়ে দিয়ে নির্বিকার তুমি... ’’ এই পৃথিবীর দিনযাপনের আনন্দই জান্নাত, আর দারুণ যন্ত্রণারা দোজখের আযাবের মতো- এই ভাবনা তার ভেতরে ভেতরে এক অন্য জীবনের খোঁজ করতে থাকে। “খোদার মর্জির খামখেয়ালি রূপের কথা ভাতে ভাবতে এঁটো থালাবাটি জড়ো করি। ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করি লাবণ্যময়ী কার্পেট আর দিল- কলবেতে লেগে থাকা দাগ... ’’ কবিতার নাম ‘দলছুট’। কবিও এক অর্থে তাই।

“কত রাত্রি পার হল, জমা কথা শেষ হয়ে এল। তোমাদের আজকাল আর একত্রে দেখা যায় না। তোমাদের ভিতর এখন বাক্যালাপ তেমন কিছু হয় না। তোমরা দুজন নিজেদের মতো একই চালার নীচে গড়ে নিয়েছ ভিন্ন ভিন্ন পৃথিবী।... অনিদ্রায় শীতের পাহাড় রাত্রি কাবার হয়ে যায়। মনের ভিতর  আবার আশ্রয় নিতে চায় প্রাচীন, প্রাচীন খেলাধূলা। দেহ নড়েচড়ে সাড়া দিয়ে ওঠে। নিজেকে সামলে নিতে নিতে দু-একটা উপদেশ দাও। ঘ্যাগ ঘ্যাগ করে কাশো- ছেলেবউ বিরক্ত হয়... ’’ শেষের লাইনটি পড়ে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ঘ্যাগ ঘ্যাগ শব্দের বিরক্তির মধ্যে এত মায়া ভর্তি হয়ে থাকে, পাঠক হিসেবে ভাবতে থাকি। জীবনের দিকে মুখ ফেরাই। এক পুরুষের চোখ দিয়ে দাম্পত্য দেখা এবং দেখানোর অভিনবত্ব মন কেড়ে নেয়। এতক্ষণ ধরে আমরা বিভিন্ন কবিতার থেকে যে অংশগুলি উদ্ধৃত করছি, তা থেকে কিছুটা হলেও কাব্যভাষা নিয়ে ধারণা জন্মেছে। এই কাব্যগ্রন্থের সব কবিতাই গদ্যে। ছন্দ কি নেই এর মধ্যে কোথাও? আছে। তবে প্রচলিত ছন্দকাঠামোয় তাকে ধরা মুশকিল। এই যেমন-- “ এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় সম্মুখে নেই। এখন আঘাত সহ্য করা ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই।... তোমার অব্যক্ত মননের ওই ভাষা, রেশমী সুতোর গিঁট। একান্ত যাপন... সামান্য হলেও আমি বুঝি। যেমন গাছেরা বোঝে গাছের ইশারা। পাখিরা পাখির...’’ ( হেমন্ত) কবির কারও প্রতি উচ্চকিত অভিযোগ নেই। বেদনার ভারে স্মরণ করা কেবল মাত্র। কবি নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলে চলেন। ভেতরের দিকে মুখ ফেরানো এই কবিতারা দহনের মধ্য দিয়ে শুদ্ধ হয়ে ওঠার কথা বলে। আঘাত উপেক্ষা করে সকলের ভালো চায়। ব্যক্তিগত ঈশ্বরের সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে সান্ত্বনা দিতে থাকেন নিজেই নিজেকে-- “ একটু ধৈর্য ধরো, ওই উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকাও, ওই দৃশ্যের কাছে তোমার হু- হুতাশ বড় বেশি বেমানান। ’’  

শিল্প যদি বেঁচে থাকাকে আরেকটু সহনীয় করে তোলে, জীবনকে সমস্ত অপ্রাপ্তির উর্দ্ধে নতুন ইতিবাচক এক অর্থ দান করে; তবে মানবজাতির ঋণ বেড়ে যায় স্রষ্টার প্রতি। ‘স্বপ্ন’, ‘বিরহ’, ‘বার্ধক্য’, ‘পরামর্শ’, ‘দ্বন্দ্ব’, ‘স্বীকারোক্তি’, ‘জবাবদিহি’, ‘অনুতাপ’, ‘অবসাদ’,’সান্ত্বনা’, ‘অহিংসা’- কবিতার নামগুলিকে যদি অনুধাবন করি, প্রতিটি কবিতাকে বিচ্ছিন্ন একক বলে মনে হয় না আর। মনে হয় আসলে একটি দীর্ঘ কবিতাকেই কবি খন্ডে খন্ডে লিখছেন। আর সেই কবিতা ‘যাযাবর’- এর- “ আমার ঢাল নেই, তরোয়ালও নেই, তবুও বারবার রণাঙ্গনে গেছি... ’’

‘সুখের মুহূর্তগুলি’ কাব্যগ্রন্থে পেয়ে যাই কিছু কিছু চরিত্রের হদিশ। যেমন ‘অনার কিলিং’ কবিতার মাধবকাকা যিনি একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন। ছেলের নাম রাজু। ‘হাসিনা প্রেমিক ছিল তার’। ফেরি পারাপার করতে থাকা যাত্রীদের দিকে চেয়ে থাকেন আর বিড়বিড় করেন। ছেলের খুনিকে কোনোদিন চিহ্নিত করতে পারবেন কি? কবিতার নামটির মধ্যেই আখ্যানের খোঁজ পাই আমরা। ‘বঙ্গবাসী’ কবিতায় পাই দুখুদাদুর কথা। যিনি এক কালে পালাগান গাইতেন। নিঃসন্তান রেবানানী গত হওয়ার পর দুখু দাদুর জীবন পাল্টে গেছে। এর ওর কাছে হাত পেতে নিরাশ্রয় জীবন অশত্থতলায়। গাছ ডালপালা নাড়ে। মশামাছি যেন না বসে- “যেন দুখুদাদু তাঁকে ছেড়ে কোনওদিন কোথাও না চলে যায়।’’ কবির সুখ দুঃখের সাথী মানুষগুলোর কথা পড়তে পড়তে উৎপলকুমার বসুর কবিতা মনে পড়ে। ‘অহিংসা’ কবিতার বুড়োর কোনো নাম নেই। যিনি বলতে পারেন- “ কবিতা পড়ি না আমরা। আর তার কোনও প্রয়োজন নেই। …  আমাদের জীবনযাপনই তোমাদের এক একটা স্বয়ং সম্পূর্ণ কবিতা।’’ ভোর বেলা যার প্রথম লাইন শুরু। কবিতাটি লেখা হতে থাকে জীবন যাপনের পরিচয় দিয়ে। দিন আনি দিন খাই এই মানুষ কাজ না জুটলে ছিপ হাতে মাছের সন্ধান করেন। কবিতাটি বুড়োর জবানিতে এই ভাবে শেষ হচ্ছে- “যদি কিছু মিলে যায় ভালো, তবে কোনোদিন দোষারোপ করিনি ঈশ্বরকে…’’ বুড়োর সংলাপে কবির স্বর চিনে নিতে অসুবিধা হয় না আমাদের। পারস্পরিক বিদ্বেষ যখন আমাদের জীবনের অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠেছে, তখন যেকোনো সঙ্কীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে উদার অনুভব, সহিষ্ণুতার শিক্ষা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। নিরাভরণ, শান্ত, নম্র, আত্মগত উচ্চারণে তারেক কাজী যে সুখের মুহূর্তগুলি লিখে ফেলেন, তা আসলে কবিতার মুহূর্ত। দুঃখ যেখানে কাছের সম্বল। কান্না হাসির দোল দোলানো জীবন আরেকবার কবিতার কাছে এসে জীবিত হয়- “ বলো বন্ধু বলো- সুখের মুহূর্তগুলি বলো- সেগুলি তো আজও ক্ষণস্থায়ী বড়…’’

                                    …………………

সুখের মুহূর্তগুলি

তারেক কাজী

প্রচ্ছদ- শোভন পাত্র

ছোঁয়া

প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০১৭

মূল্য- একশো টাকা

Saturday, 3 June 2017

পারমাণবিক বীজতলা : সৈয়দ কওসর জামাল

 

এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা, যখন প্রতিদিন শাসকের রক্তচক্ষু তীব্রতর হয়ে আমাদের সহজ জীবনধর্মকে নষ্ট করে দিচ্ছে। কুৎসা, অপবাদ, ভয়ের বাতাবরণে ধর্মের সর্বংসহা ধারণ ক্ষমতার কথা বিস্মৃত হতে বাধ্য হচ্ছি আমরা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা পদবন্ধটি কেবলমাত্র সংবিধানেই আছে বোধ হচ্ছে, মিছিল যে মানুষের মুখ,  শাসক হয়তো ভুলে যাচ্ছেন সে কথা! এমন সময় হাতে যদি এসে যায় এমন এক কবিতার বই যেখানে পেয়ে যাই সময়ের স্বর, সংকটের স্বরূপ এবং উত্তরণের পথ, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে- হ্যাঁ, কবিতা পারে। অনেক কিছু পারে। শিল্প এবং শিল্পীর ওপরে ক্রমাগত আঘাতের মধ্যেই এ উচ্চারণ মানায়- ‘ আমাদের শিল্প তবে ধর্ম হয়ে উঠুক এবার!’ কবি- সৈয়দ কওসর জামাল। কবিতার বই- ‘পারমাণবিক বীজতলা’।

‘পারমাণবিক বীজতলা’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা- ‘বেদনার গান’। আমরা জানি আমাদের প্রিয় যত গান সব ‘বেদনাসঞ্জাত’। এই ধারণাটিকে নিয়েই কবিতার হয়ে ওঠা। কবি লিখছেন--“ প্রিয় গান বেদনাবিধৃত বলে বেদনামাত্রই / গান হয়ে ওঠে না কখনও’’ ; আসলে বেদনা চায় নিভৃতি। শেষে বলছেন--

“যে মানুষ আনন্দের গান গেয়ে যায়

 তা নিজের নয়, অন্যের বেদনাজাত,

 ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া দিগন্তরেখায়

 নিজেকেই খুঁজে চলে একাকী, অজ্ঞাত।’’

আমাদের মনে হয়েছে প্রথম কবিতার মধ্য দিয়ে কবির দর্শনের খোঁজ কিছুটা পাওয়া সম্ভব। সমগ্রের স্বাদ একটি কবিতা থেকে পাব, এটা নিছকই কষ্টকল্পনা তবু কবির মনকে ছুঁতে চেয়ে দু’ একটি কবিতার দিকে বিশেষ পক্ষপাত থাকতেই পারে। ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া দিগন্তরেখায় নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে কবি এসে বসেন সাদা পাতার সামনে। যে সাদা পাতা আপাত সরলতার আড়ালে তৈরি করে প্রবল প্রতিরোধ। ‘ সাদা পাতা’ কবিতায় ‘কলমের খোলা মুখ’ শব্দটির মধ্যে যৌন আবেদন কাজ করে চলে বলা বাহুল্য, ‘ সফল কবিতা এক পতাকার মতো ওড়ে পর্বতচূড়ায়’- শেষ পংক্তিতে পৌঁছে আমাদের মনে যে ছবি ভেসে ওঠে, সেখানে কবিকে মনে হয় এক অভিযাত্রী। সারা গায়ে ফ্রস্টবাইটের দাগ, শ্বাসরোধকারী প্রতিবেশের মধ্যেই জন্ম নিতে থাকেন বিজয়ী। ‘নীলকণ্ঠ’ নামে এই কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতায় কবি লিখছেন- “ নামছি অজস্র পাহাড় ঘুরে/ ঝর্ণার পাশে হাইড্রো- ইলেকট্রিক প্লুতস্বর!/ সভ্যতা এগোয় যত/ মাইন, মেশিনগান, যুদ্ধবিমানের শব্দ আরও ঘন হয়।’’ তথাকথিত প্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। প্রতিদিন প্রকৃতির মধ্যে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছি আমরা, আকাশ যেন সব প্ররোচনা বুঝেই নিজেকে নীল রঙে ঢেকে ফেলেছে। জানি অভিমানের রং নীল। এক আকাশ অভিমানে কী কবি লিখে ফেলেন- “ মানুষ বিষণ্ণ হলে আকাশে আকাশে নীল/ নীলকণ্ঠ পাখি ডাকে…’’

‘পারমাণবিক বীজতলা’ কাব্যগ্রন্থটিতে পাঠক সৈয়দ কওসর জামালকে বারেবারে খুঁজে পাওয়া যায়। এ পাঠ যেমন বিশ্বকবিতার, তেমনি এ পড়া তাঁর নিজের সৃষ্টিকেও। ‘আমিও পাঠকমাত্র এই কবিতার’ লেখাটিতে কবির বিভ্রম আর পাঠকের শ্বাস যেন অপরাহ্ণবেলায় মিশে যায়। ইতিহাস, পুরাণ মিশে থাকে এই বই-এর মর্মে মর্মে। মেধার ভিতরে আলো খেলা করে। হ্যাঁ এবং না, অতীত এবং বর্তমান, ‘আলো- অন্ধকার- অশ্রু- হিম পেরিয়ে’ কবি বিশ্বাস করেন মাঝখানে অন্য পরিসর আছে। এই পরিসরটুকু চিনিয়ে দেওয়ার কথা আমরা বলার চেষ্টা করেছিলাম আমাদের আলোচনার প্রথমদিকে। পিয়ানোর ভাঙা রিড চঞ্চল হওয়ার চিত্রকল্পে ‘পরিসর’ কবিতাটি এক অসীম সম্ভাবনার দ্যোতক হয়ে ওঠে। স্মরণযোগ্যতা যদি কবিতার অন্যতম মাপকাঠি হয়, তবে কিছু কিছু পংক্তি উদ্ধৃত করবার লোভ সামলানো যায় না। যেমন-

“ভেঙেই পড়েছিলাম, যদি না হরিণী

 হাত ধরে টেনে আনত তার এই ঝরনাটির কাছে

 নীচে বয়ে চলা শান্ত জল...

 

 জল নয়, আমি শুধু তৃষ্ণাটুকু দুঠোঁটে ধরেছি।’’ ( তৃষ্ণা)

 “যে বিষাদ মরে যায়, তারও কি এলিজি লেখা হবে/ তোমার ও মুখে? ’’

                                                ( যে বিষাদ মরে যায়)

 “ আহত মুখের দিকে/ অনন্ত মুগ্ধতাবোধ স্থির চেয়ে আছে। ’’

                                             (আর য়ু লোনসাম টু নাইট?)

 “... নশ্বর মানুষ কবে তার/ নশ্বরতা মনে রেখে স্থাণু বসে ছিল?’’ ( নশ্বরতা)

কবিতা এক অর্থে কবির আত্মজীবনী। সচেতন কবি ‘দ্বিখন্ডের আমি’ কে নিয়ে দ্ব্যর্থ ব্যঞ্জনায় লিখে চলেন দিনলিপি। শূন্যতায় ভরে উঠে নিঃস্ব হয়ে চলে যাওয়ার মধ্যে যে বোধ কাজ করে, কবি হিসেবে অন্তরিন্দ্রিয়ের খোঁজে এক সাধকের সন্ধান  পাওয়া যায়। একটি বিষয় জোর দিয়ে বলার, সৈয়দ কওসর জামালের কবিতা অভিজাত মননের অধিকারী। এ আভিজাত্য ভাবের এবং প্রকাশেরও বটে! ফরাসি সাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় তাঁর কবিতাকে অন্যমাত্রা দিয়েছে সন্দেহ নেই। নির্জন সাঁকোর দিকে একাকী জলের কাছে যে হেঁটে যায় শান্ত পায়ে, তাঁর মনের অতল রহস্য মনোরম, অগম্য। ‘অসম্পূর্ণ’ কবিতার শেষ স্তবকটি উদ্ধৃত করছি--

“লেখা অসম্পূর্ণ রেখে গেলে

 অশরীরী কোনও হাত তুলে নেয় লেখার কলম

 পাতার বাকিটা ভরে যায়...

 লেখা আর আমার থাকে না।’’

এর পর বলা বারণ। অসম্পূর্ণতা হয়ে উঠুক অনন্য অভিজ্ঞান। কোত্থেকে যেন ভেসে আসছে ছাতিম ফুলের গন্ধ!

                                 ..................

পারমাণবিক বীজতলা

সৈয়দ কওসর জামাল

প্রচ্ছদ- সৌমিত্র সেনগুপ্ত

ক্যানেস্তারা

মূল্য- ৬০ টাকা

Saturday, 22 April 2017

সমুদ্রের কবিতা : কবিতার সমুদ্র


পৃথিবীর তিনভাগ জল আর একভাগ স্থল। আমাদের প্রাথমিক ভূগোলবোধ জল বাদ দিয়ে নয়। আমাদের অস্তিত্বের বোধে সমুদ্র অনিবার্য। বাংলার মানচিত্রে তার নাম বঙ্গোপসাগর। “সাহিত্যে, বাংলা সাহিত্যেও, সমুদ্রকে পেয়ে যাই- কখনো কম কখনো বেশি। কিন্তু তবু, না মেনে পারি না, সব-মিলিয়ে বাঙালির মনে সমুদ্রের খুব- একটা জায়গা নেই।” আলোচ্য ‘সমুদ্রের কবিতা’ সংকলনের ভূমিকায় অরুণ সেন- এর মন্তব্যটিকে স্বীকার করতেই হয়। সমুদ্র নিয়ে কবিতার এই সংকলনের ভাবনাবিন্যাসে পূর্ণেন্দু পত্রীর সশ্রদ্ধ উল্লেখ করেছেন সম্পাদক। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধকাব্য’-এর প্রথম সর্গের অংশবিশেষ দিয়ে শুরু হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমুদ্র’, ‘জন্মদিনে ৯’, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ অন্ধকারে সমুদ্রের প্রতি’, নজরুল ইসলামের ‘সিন্ধু’, জীবনানন্দ দাশের ‘সিন্ধুসারস’, ‘জুহু’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উন্মার্গ’, অমিয় চক্রবর্তীর ‘সমুদ্র’ প্রভৃতি কবিতা ঠাঁই পেয়েছে এই বই-এ। সম্পাদকের দীর্ঘ ভূমিকা এই বই-এর বিশেষ সম্বল। অরুণ সেন লিখছেন-- “বাংলা ভাষায় রচিত সমুদ্রকবিতার সেই পরম্পরাকে এখানে ধরা হল এমন নয়, কিন্তু সমুদ্রের মতো যে-কোনো প্রাকৃতিক বিষয়কে ধরেই যে কবিতা ও ইতিহাসের সম্পর্কের নানা সত্যকেই খুঁজতে শুরু করা যায়- তার একটা নমুনা পাওয়া যাবে হয়ত। ’’ কবির আত্মসচেতন এবং অবচেতনের অবিরত ঈশারায় সমুদ্র যে বিস্তার নিয়ে হাজির হয়, আক্ষরিক অর্থেই ডুবে যাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না!

সমুদ্রের স্বাদ আমাদের রক্তে। আপনাকে এই জানতে চেয়েই আমরা হয়ত নীলের কাছাকাছি-‘সিন্ধুসারস’ কবিতায় যেমন লিখছেন জীবনানন্দ-- “তুমি তাহা কোনোদিন জানিবে না; সমুদ্রের নীল জানালায়/ আমারই শৈশব আজ আমারেই আনন্দ জানায়।’’  সোমেন পালিত অবশ্য জুহুর সমুদ্রপারে কিছুটা স্তব্ধতা ভিক্ষা করেছিল। ‘সমুদ্রঃ ছিন্ন চরণ’ অংশে বিনয় মজুমদারের কবিতার খসড়া মনে পড়ে-- “যখন সমুদ্রজলে একটি গিটার ভেসে চলেছে এখন/ যখন সকলে ডুবে নিশ্চিহ্ন হয়েছে সব হারিয়ে গিয়েছে/ তখন সমুদ্রজলে একটি গিটার ভেসে ভেসে চলছে এখন...’’ গিটারের চলনে হৃদয়ের দ্বার খুলে যায় কি? কবির অন্তঃপ্রেরণার সঙ্গে সমুদ্রের অনিবার্য যোগাযোগ নিত্য নতুন অভিমুখ খুলে দেয় জীবন, সম্পর্কের? ‘ সমুদ্র হবার অভিলাষ’ কবিতায় বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত লিখেছেন যেমন- “… পরস্পরের ঢেউ হয়ে, সমুদ্র হবার অভিলাষে/ একদিন/ নিঃসঙ্গ হয়েছিলাম সকলের ব্যক্তিগত বোধে।… ’’ যে কোনও বড় কিছুর সামনে দাঁড়ালে নিজেকে অ-সামান্য লাগে। অস্মিতার বোধে ঢেউ এর পর ঢেউ এসে কাঁদায়, হাসায়, ভালোবাসায়। চেনা সম্পর্কের পৃথিবীতে নোনা বাতাস লাগে। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ‘গার্হস্থ্য সমুদ্র একাকার’ কবিতার শেষে দেখি-- “আমরা দাঁড়িয়ে থাকি আমাদের দু-মুঠি সংসারে/ সম্বল বলতে শুধু কোলকাতা যাবার ভিসা’’, জাগ্রত চন্দনেশ্বর দেবতার মন্দিরে না গিয়েও কবি মনে লেগে থাকে এক অদ্ভুত সুগন্ধ- মৌতাত! আর  রোম্যান্টিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ দেখা হবে’ কবিতার তুমুল উচ্চারণ করছেন - “… কিছু না বলার ভাষা, গরম ওষ্ঠের শিলালেখ/ ঠিক সে সময়/ রাত্রির সমুদ্র হবে সশরীর রাত্রির সমুদ্র/ হবে, দেখা হবে।’’ ‘দেখা হবে’ শব্দবন্ধটি অবিরত ঘুরে ফিরে আসে। ধ্রুবপদের মত। সার্থক কবিতা চিনে পাঠকের কাছে বিষয় অনুযায়ী বিন্যস্ত করে পরিবেশন করা সহজ কাজ নয়। আরেকটি কথা কোনো সংকলনই সম্পূর্ণ নয়, না হওয়াই স্বাভাবিক। সমগ্রতার আদল পাঠকের মনের মধ্যে নিজের মত করে যদি তৈরি করে দিতে পারেন সম্পাদক, তবে শূন্য পরিসর পূর্ণ হবে সহজ সুরেই সন্দেহ নেই।

আমাদের দেখা-না-দেখায় মেশা সমুদ্র দর্শনে নারীদের কবিতা যে অন্যমাত্রা রাখবে, তা বলা বাহুল্য। নবনীতা দেব সেন লিখছেন ‘গঙ্গাসাগর’ কবিতায়-- “ তুমি মোহনায় থেকো/ আমি মোহনার দিকে যাই।’’ মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘জাহাজডুবি’ কবিতার অংশ উদ্ধৃত করছি- “ আমি কি জানতাম সারাটা রাত ধরে অতটা যেতে পারে শৃঙ্গার!/ নরম একটুও হল না অনুনয়ে, জাহাজে শুধু দোলা লাগল’’- কী অসামান্য চিত্রকল্প। সমুদ্রের কবিতায় শরীর আসছে, শৃঙ্গার আসছে। আবার ঝিনুকে ঠোঁট কেটে খোলা সংসারের গল্প পাচ্ছি চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের ‘গোয়েন্দা কবিতা’য়- “ যে-সব শরীরে একবার সমুদ্র ঢুকেছে, তারা/ সুইসাইডাল নোট লিখে রেখে যেতে আর সময় পায়নি।’’ প্রেম আর মৃত্যুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা জানি আমরা। সিদ্ধেশ্বর সেনের ‘প্রকৃতি-পুরুষ’ কবিতায় সমুদ্র এসেছে সৃষ্টির আদিকল্পে। ‘শুধু রাতের শব্দ নয়’ কবিতায় শেষ সমুদ্রে যাত্রার আয়োজনে আশার অমরত্ব ঘোষণা করলেন কবি অরুণ মিত্র। আর এভাবেই সমুদ্র হয়ে উঠেছে জীবন সঙ্গীত।   

পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের একটি পংক্তি মনে রাখবার মতো-- ‘… প্রত্যাশা হল সমুদ্রের অন্তহীন ফেনা।…’ আমাদের বেঁচে থাকা নতুন এক অর্থের মুখোমুখি হয়। সবিনয়ে জানাতে চাই, সাম্প্রতিক সময়ে অনুনয় চট্টোপাধ্যায় ও উর্বী মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘ বাংলা সাহিত্যে সমুদ্র’ শীর্ষক আলোচনা গ্রন্থটি। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সমুদ্রের উপস্থিতিকে নতুনভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারবেন উৎসুক পাঠকেরা। আমাদের কবিতার সমুদ্রে বুদ্ধদেব বসুর ‘সমুদ্রস্নান’ কবিতার অংশবিশেষ দিয়েই ইতি টানি সহজপাঠের-  “একবার নিজেকে দাও না সমুদ্রের কাছে/ তারপর দ্যাখো সে তোমাকে নিয়ে কী করে।’’

                                    ……………

সমুদ্রের কবিতা

অরুণ সেন সম্পাদিত

প্রতিক্ষণ

প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ১৯৮৮

নতুন পর্যায়ের প্রথম সংস্করণ

জানুয়ারি ২০১৭

প্রচ্ছদ ও অলংকরণ- পূর্ণেন্দু পত্রী

মূল্য- ৯০ টাকা

  

Saturday, 8 April 2017

র‍্যাঁবোর কবিতাঃ অভিশপ্ত ইস্তাহার

অনুবাদে কবিতার রস অক্ষুণ্ণ থাকে কিনা এ নিয়ে তর্ক চলতেই পারে তবে সাহিত্যের রসজ্ঞ পাঠকেরা সার্থক অনুবাদের জন্য যে অপেক্ষা করে থাকেন তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না ‘র‍্যাঁবো উন্মাদ সৌরকণা’ বইটি কয়েকদিন ধরে পড়ছিলাম। র‍্যাঁবোর কবিতার অনুবাদ করেছেন গৌতম গুহ রায়। জানিয়ে রাখা ভালো অনুবাদক নিজেও একজন কবি।

১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের ২০ অক্টোবর ফ্রান্সের এক সীমান্ত শহর শার্লভিলে জাঁ আর্তুর র‍্যাঁবো জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন। মা গ্রামের কৃষককন্যা। শৈশব থেকে রূঢ় বাস্তবের সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘জাঁ আর্তুর র‍্যাঁবোঃ উন্মাদ সৌরকণা’ ও ‘জীবনপঞ্জী’ শীর্ষক দুটি লেখা এই বই-এর কবিতাগুলির  শেষে যুক্ত হয়েছে, কবির জীবনচরিতে প্রবেশের পক্ষে এই লেখাদুটি সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এই সূত্রেই বলে রাখি, র‍্যাঁবোর জন্মের শতবর্ষে লোকনাথ ভট্টাচার্যের অনুবাদে ‘নরকে এক ঋতু’ প্রকাশিত হয়েছিল। র‍্যাঁবোর সম্পূর্ণ গ্রন্থের অনুবাদ বাংলায় সেই প্রথম। এই বইটির সশ্রদ্ধ উল্লেখ বারেবারেই পাই গৌতম গুহ রায়ের লেখায়। কবিতার ইতিহাসের সঙ্গে অনুবাদের পরম্পরাকে একবার দেখে নিতে পারলে লাভ হয় বইকি যাহোক, লোকনাথ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন তাঁর অনূদিত বই-এর ভূমিকায়- “ কে এই র‍্যাঁবো? এক কথায় এ- প্রশ্নের উত্তর দিতে বিদগ্ধ ফরাসীরাই বিপন্ন বোধ করবেন, আমি তো কোন ছার! তাঁকে কেউ বা বলবেন দানব, কেউ বা বলবেন দেবদূত, কেউ বা সকল গলা ছাপিয়ে নিজের গলাটিকে শুনিয়ে বলবেন—দানবও নন, দেবদূতও নন, মর- জগতের একজন মানুষ মাত্র। ” র‍্যাঁবোকে বুঝতে হলে ফরাসি সিম্বলিস্ট কাব্য, ভেরলেনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বকে জানতে হবে বলে জানিয়েছিলেন লোকনাথ ভট্টাচার্য ‘নরকে এক ঋতু’ বইটি বুদ্ধদেব বসুকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। বুদ্ধদেব বসুর কবিতার ওপর র‍্যাঁবোর প্রভাব নিয়ে অনেক সমালোচক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বাংলা কবিতায় র‍্যাঁবোর প্রভাব দুর্লক্ষ্য নয়। আমাদের মনে পড়তে পারে কবি অরুণেশ ঘোষের কথা। এবারে ফিরি কবিতায়।

‘নরকে এক ঋতু’ বইতে দেখি কবি বলছেন- “ বার করেছি স্বরবর্ণের রং—আ কৃষ্ণ, অ শ্বেত, ই রক্ত, ও নীল, উ সবুজ- নিরূপণ করেছি প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের গতি-প্রকৃতি। আর সহজাত প্রেরণার ছন্দেই আজ আবার লালায়িত হয়েছি কাব্যিক এমন একটি সুগম ক্রিয়াপদ আবিষ্কার করতে যা একদিন-না-একদিন প্রযোজ্য হ’তে পারবে সমস্ত অর্থে। এই আমি অনুবাদের সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ক’রে রাখলাম।’’ এই কথাগুলির সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারি আমাদের আলোচ্য বই-এ গৌতম গুহ রায়ের অনুবাদে ‘স্বরবর্ণ’ কবিতাটি- “ স্বরবর্ণগুলো যেমন--/ এ- কালো, আই-লাল, ও-নীল, সবুজ-ইউ-সাদা-ই/ তোমাদের শব্দ উৎসের গোপন ঝর্নার খোঁজ ফাঁস করে দেবো এবার:’’, আবার শব্দের রসায়ন আমাদের টেনে নিয়ে যায় ‘ অভিসার’ –এ, যেখানে কবি লিখছেন- “ সেই সন্ধ্যায়—দারুণ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আবার দেখা খালাসিটোলায়/ নেশার টানে, ভাঙন বুকে এক ফাঁকেতে তাড়ির গ্লাসে সফেন চুমু/ হারিয়ে যাও সেই কিশোরের রুদ্ধবাক্‌ স্মৃতির ফাঁকে/ সবুজ ঘাসে, বাতাবিলেবুর গন্ধমাখা সন্ধ্যারাতে”। এই কবিতাগুলির সঙ্গেই গ্রথিত হয়েছে মূল ফরাসি কবিতা অনুবাদক ‘খালাসিটোলা’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে বাঙালির কবিতাযাপনের এক সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরলেন যেহেতু আমি নিজে ফরাসি জানি না, অনুবাদ কতটা মূলানুগ হয়েছে আমার পক্ষে বলা  সম্ভব নয়। তবে ফরাসি থেকে বাংলায় রূপান্তরিত হবার পর পাঠক কবিতাগুলির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সমর্থ হবেন নিঃসন্দেহে, এটুকু সবিনয়ে জানাতে পারি কবিতা পড়তে পড়তে কল্পজগৎ ও বাস্তবের সীমারেখা হারিয়ে যেতে থাকে। ‘শীতের স্বপ্ন’ কবিতার মত পাগল পোকাটিকে খোঁজার পালা শুরু হয় ‘দিনরাত যেটা আমাদের ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে!’’

সংকেতবাদী কবিতার ক্ষেত্রে স্বপ্ন এক বিশেষ বিষয়। চেতনার বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যে পবিত্রতাকে র‍্যাঁবো খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন সেখানে কালের ভূমিকা অপরিসীম। মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছা থেকে মুক্ত হয়ে সোজা উঠে দাঁড়াবার প্রত্যয়ে তিনি তাই বলেন- “ আবারও পেয়ে গেছি সেই/ কালচক্র/ সূর্য ও সমুদ্র,/ এ যেন যুগলের গোপন অভিসার।’’ (কালচক্র) সমাজের প্রচলিত বিধির সঙ্গে মানিয়ে না নেওয়া এবং বিদ্রোহের মধ্যে দুঃখকে বরণ করে নেবার যে মানসিকতা আধুনিকতার অভিজ্ঞান, র‍্যাঁবোর জীবন যেন তারই সাধনা। আদ্যন্ত আধুনিক হতে চেয়েছিলেন তিনি। জাদুকরের সোনার কাঠির মত যিনি ছুঁতে চেয়েছিলেন পরম সংবেদনকে, তাঁকে অনুভব করা এক জীবনের কাজ নয়। ভাষাগত দূরত্ব পেরিয়ে র‍্যাঁবোর ভাবনাভুবনের সঙ্গে অনেকটা পরিচয় সম্ভব হল গৌতম গুহ রায়ের সৌজন্যে, এজন্য তিনি ধন্যবাদার্হ কবি ও কাব্যকৃতিকে বোঝার সহায়ক হয়েছে তাঁর কবিতা নির্বাচন

  তোমার উদ্দেশ্যে এই নাও জীবনের অভিশপ্ত পৃষ্ঠাগুলোর থেকে

  কয়েকটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে দিচ্ছি,

  হাত পাতো, নাও ’’- ( নরকে এক ঋতু)

সুন্দরকে নমস্কার করতে শিখিয়েছিলেন যিনি তাঁর কবিতার অনুবাদ সুন্দর না হয়ে পারে!

                                                …

র‍্যাঁবো উন্মাদ সৌরকণা

গৌতম গুহ রায়

প্রচ্ছদ- সঞ্জীব চৌধুরী

উত্তর শিলালিপি, আলিপুরদুয়ার

মূল্য- ১০০টাকা

 

 

Thursday, 30 March 2017

বিষাদ ও জন্মকথা : কৃষ্ণার কবিতা

জলের ওপর একটি নৌকো। ছায়া সঙ্গী তার। দিগন্তে দেখা যাচ্ছে হলদে রঙের আলো। বই-এর প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে থাকি। হারিয়ে যেতে যেতে দেখি বই-এর নাম- ‘বিষাদ ও জন্মকথা’, লিখেছেন- কৃষ্ণা।

‘কবিতাকে’ উৎসর্গকৃত এই বইতে রয়েছে মোট ছত্রিশটি কবিতা। প্রথম নামকবিতাতেই দেখি কবি লিখছেন-- “কলমের মুখে বিষাদ অমৃতময় স্রষ্টা যদি/ জন্ম নেবে শ্রেষ্ঠ কবিতা।” বিষাদ এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম আশ্রয় তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষাদ এক অলৌকিক পৃথিবীর মায়া সৃজন করে আনন্দ উপহার দিতে পারে কিনা ভাবতে ভাবতে পড়তে থাকি কবিতাগুলি। ‘সুন্দরের ভিক্ষা’ কবিতার প্রথম স্তবকে গভীর অনুভব থেকে উঠে আসা উপলব্ধি ভাষারূপ পায় যেন- “ সুন্দর নিঃসংশয় ভিখারি/ নবনীতকোমল কিশোরী স্তনবৃন্তের কাছে/ দুইহাতে ভিক্ষাপাত্র প্রার্থনার মতো/ দ্রুত মূর্ছনায় সেতারের মধ্যযাম রাগিনীতে/ সুন্দর চিরভিখারি বেশে গাঢ়তর হয়”। এই কাব্যগ্রন্থে দু’একটি কবিতা বাদ দিলে প্রচলিত ছন্দে কবিতাগুলিকে ভাঙা যায় না। কিন্তু অন্তর্গত দীর্ঘশ্বাস নিজস্ব এক ছন্দে কথা বলে চলে। চোরাগতির টান পাঠক এড়াতে পারে না।

 “ তোমার শব্দেরা ব্রহ্ম, ব্রহ্মাণ্ড হল

  সন্ধ্যে অবকাশ

  তোমার শব্দেরা অ্যান্ড্রোয়েডে, গভীর আশ্বাস। ’’

‘সংগোপন’ কবিতার প্রথম ও শেষে এই লাইনগুলি ঘুরে ফিরে আসে। একরকম ঘোর তৈরি হয়।এই কাব্যগ্রন্থে প্রেম এসেছে শিল্পের বোঝাপড়ায়- “ আমি অনেক কবিতার জন্মদাত্রী হতে পারি/ যদি তোমার ওই দু’ চোখে/ বৈকালি ভ্রমণের সুযোগ পাই।’’ আমার ভ্রমণ তোমার দু’চোখে থেমে যাবার কথা মনে হতে থাকে আমাদের। “বৃষ্টিভেজা এক দুপুরে প্যারিস এঁকেছিলাম/ তোমার মায়াবী চোখের পাতায়।’’- ‘ক্যানভাস’ কবিতার এই লাইনটি মন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু প্রেমিক-প্রেমিকার যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক। সরীসৃপ হয়ে বুকের ভেতর বিষ জমিয়ে রাখাই কি নিয়তি? পলাতক স্বপ্নেরা একাকী জাগিয়ে রাখে কবিকে। চৈতন্যের ভেতরে বৃক্ষের জন্ম হয়। যার বিবেক যত জাগ্রত, যন্ত্রণাও যে তত তীব্র। এই কবিতাগুলি থেকে কবির চেতনালোকের আঁচ পাওয়া যেতে পারে। তাঁর কবিতাচর্চায় অনুশীলনের পরিচয় সুস্পষ্ট। পূর্বতন কবিদের লেখার মেধাবী ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন প্রসঙ্গে।  যাহোক, দ্বন্দ্বের কারণ যে ‘চিরন্তন পুরুষ’। ‘পেন্ডুলামের দোলকগতি/ জীবনভর্তি বিরোধ।’ তবু কিশোরী থেকে রাইকিশোরী হবার ইচ্ছে যায় না। ‘ও কি ঈশ্বর, জাদুকর, কোন রঙে মাখে ছবি?/ সংশয় শুষ্ক অরণি, ও আমার কবি’ এই স্পষ্ট উচ্চারণে আমরা পেয়ে যাই বিশ্বাসের চারণভূমিকে। বিষাদের ভেতর থেকে জ্বলে ওঠে আলো। চাঁদের শরীর বেয়ে জ্যোৎস্না নামে। বাঁশি আর বর্ষাভিসারের যুগলবন্দী সেই আরাধিকার কথা স্মরণ করায়। শিল্পকলা আর প্রেমকলা একসঙ্গে ক্যানভাসে এঁকে চলে আলোর গন্ধ।

“ শীতের বিকেল

  বড় তাড়াতাড়ি মরে যায়

                     হিমের ভিতর

  সাঁঝের আঁধারে ডোবে

           মায়াবী আমার গ্রাম।

            ..........

ঘোলাটে হলুদ আলো

সামনে জ্বলছে হ্যারিকেন ’’

একসময় মধুর অন্ধকারে ঢাকা ছিল বাংলার গ্রাম। জাদুকর যেন রূপকথার ছবি আঁকত। বিজলিবাতির আলো সেই নিভৃত পরিসরকে কেড়ে নিয়েছে কি? হলদে আলোর গল্পে এক অদ্ভুত মনখারাপ থাকে। হ্যারিকেনের আলোয় কত কত মুখ ভেসে আসে। স্মৃতির সরণী বেয়ে। ছবির পর ছবি জুড়ে তৈরি হয়েছে ‘নস্ট্যালজিয়া’-র কবিতা। গ্রাম আর শহরের বদলে যাওয়া সন্ধ্যেগুলির বর্ণনার মধ্যে কবির নিভৃত অন্তর্লোকের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। এই কবিতাটির পরেই রাখা হয়েছে ‘ অ- পূর্ণ নাগরিক’ কবিতাটি। কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতায় কৃষ্ণা লিখছেন- “ আমি পূর্ণ নাগরিক হতেই পারি না/ আমি হব গোধূলির রং ছুঁয়ে থাকা স্বতন্ত্র জীবন।’’ নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা মানুষকে কীভাবে স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে দেয়, জানি আমরা। জানি কবির পূর্ণ নাগরিক হতে না চাওয়ার মধ্যে কাজ করে চলে প্রবল বিদ্রোহ। স্বতন্ত্র জীবনের খোঁজ গোধূলির রঙে কৃষ্ণাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় যে সমস্ত কবিতা, তা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে জন্ম নিতে থাকে নিজের মত এক জীবনের ইচ্ছে। ইচ্ছেদের ডাকনামে জন্ম নেয় আশ্চর্য কুহক। সব কিছু বোঝানো যায়না। অনিবার্য বিষাদ লেপ্টে থাকে দিগন্তের গায়ে। পরম সুন্দর। কবিতার মতো।

..................

বিষাদ ও জন্মকথা

কৃষ্ণা

উবুদশ, কোলকাতা

প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০১৭

প্রচ্ছদ- সোমনাথ চৌধুরী

বিনিময়- ৮০ টাকা 

Saturday, 25 March 2017

এই শহরের রাখাল : কবির চোখে কবি


এই শহরের রাখালের কথা আমরা জানি। যিনি শব্দের ঝর্নায় স্নান করে হয়েছিলেন অনন্যমনা। কবিতায়- জীবনে চিরবিস্ময় তিনি- শক্তি চট্টোপাধ্যায়। বসন্ত এলেই তাঁর মৃত্যুদিন মনে পড়ে যায়। তাঁর কবিতা আর তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতা মিলে তৈরি হতে থাকে এক নতুন পাঠ। এই যেমন ‘জয়ের শক্তি’ বইটি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা কীভাবে ধরা দেয় জয় গোস্বামীর কাছে, সেই অনুভবের সঙ্গেই এই বই- এর প্রথম পর্বে রয়েছে শক্তিকে নিয়ে লেখা সাতটি কবিতা। ‘কবি কাহিনি’ কবিতাটি থেকে উদ্ধৃত করছি--

“ মদে ডোবা লোক, কবি।

           মাথা ভাসছে পিপের ওপর।

 পিপেটি সমুদ্র যাত্রী—

            যাও, ওকে পরাও টোপর।

                     ......

ফসকে পড়া শব্দ ধরে

       মদ থেকে ভেসে ওঠে লোক।

পিপেদ্বীপ। তার ওপর সে বসে কবিতা লিখছে...

        হে সমুদ্র, এই দৃশ্য ফ্রিজ করা হোক! ’’

মধ্যরাতে কোলকাতা শাসন করা শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে জয় দেখেননি, দেখেছেন কেবল শব্দের ভেতর দিয়ে-- ‘কেন না, লিখিত শব্দই, লেখকের, প্রথম ও শেষ পরিচয়।’ কবিকে নিয়ে গড়ে ওঠা এত কাহিনির বাইরে কবিকে পড়ছেন। সমুদ্র প্রসঙ্গ আবার চলে আসছে ‘দিগন্তের ধারে’ কবিতাতে--

“ আমার মাথায় গাঁথা চতুর্থীর একফালি চাঁদ

  তা নিয়ে তখনও আমি এরকমই পাগল- পাগল করতাম

  তাঁর সমুদ্রের অন্য পারে!’’

সকলেই কবি নয়, জানি আমরা। জানি সকলেই সহৃদয় পাঠক হতে পারেন না। তবে কোনও একজন কবি যখন পড়েন আরেক কবিকে, কিংবা লিখে ফেলেন কবিতা পাঠকের অনুভবের- এক আশ্চর্য ভালোলাগা তৈরি হয়। আর সাহিত্যে ভালোলাগা মন্দ লাগা যে শেষ কথা এমনটি বোধহয় একজন কবির পক্ষেই ভাবা সম্ভব! ‘কফির নামটি আইরিশ’ কাব্যগ্রন্থে শ্রীজাত- পদ্যসমগ্র শীর্ষক চার লাইনের কবিতা আছে-- “বাতাসকে দিই হালকা ধমক রোজ/ আলতো টোকায় ছাই ঝাড়ি সূর্যের/ আকাশ যখন পদ্যসমগ্র—/ আমরা সবাই শক্তি চাটুজ্যে !”

শক্তি কবিতার বদলে পদ্য বলতেই ভালোবাসতেন তাঁর পদ্যসমগ্র নামটি উঠে এল তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতার শিরোনামে আমাদের প্রত্যেকেই যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই সম্ভাবনা উসকে দেবার মধ্য দিয়ে প্রাণের প্রসারণ ঘটে গেল বইকি

এবার আমিই/ এই শহরের রাখালশঙ্খ ঘোষের কবিতায় যুবার মুখে এই উচ্চারণ মনে আছে আমাদের এই শহরের রাখাল শীর্ষক গদ্যগ্রন্থে  নিজেকে নিয়ে শক্তি নামে একটি অসামান্য লেখা আছে শঙ্খ ঘোষের শক্তির স্বীকারোক্তির সাহস, নিজেকে নিরাবৃতভাবে মেলে ধরবার চেষ্টার কথা বলার শঙ্খ লিখছেন-- “সংসারের মধ্যে, প্রকৃতির মধ্যে, তাঁর নিজস্ব ঈশ্বরের মধ্যে নিজেকে খুঁজে বেড়ানোই তবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা ’’ আত্মজীবনের মধ্যে সামাজিক সময়কে ছুঁতে পাবার এক পথ আবিষ্কার করছেন কবি শঙ্খ ঘোষ শক্তির লেখার মধ্যে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার কথা আমাদের মনে পড়ছে সুনীলের কৃত্তিবাস কবিতায় পাই শক্তির দুর্দান্তপনা’- র কথা শক্তির মৃত্যুর পরে প্রকাশিত ভোরবেলার উপহার কাব্যগ্রন্থে পাই শক্তি নামের কবিতা রাত বারোটা কি দেড়টায় কবিতার খাতা খুলতেই সুনীল বাইরে তিনবার নাম ধরে ডাকার আওয়াজ পান গলা চিনতে ভুল হবার কথা নয়’ ‘… এই তো তার আসবার সময়’, কিন্তু বিভ্রম কেটে যায় শক্তি যে আর ফিরে আসবেন না এই জানাটুকু অস্তিত্বের মূল ধরে নাড়িয়ে দেয়, কবিতার কাছে ফিরে আসেন সুনীল; লিখে ফেলেন--

  শক্তিনেই, কবেকার সেই দুজনে মিলে লেখা লেখার খেলা

                হঠাৎ শেষ হয়ে গেল

   আমি চুপ করে বসে থাকি, রাত্রি ঝরে পড়ে, যেন উড়ছে

             আমাদের লেখাগুলির ছিন্ন পাতা

   আমি চুপ করে বসে থাকি, সাদা দেওয়াল, কানে তালা

              লাগিয়ে দিচ্ছে স্তব্ধতার বাজনা

   খাকি প্যান্ট ও কালো জামা, সাদা চুল, মুঠোয় সিগারেট ধরা

              শক্তি একটু একটু দুলছে… ’’

এই দোলার সামনে আমাদের চুপ করে থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই বাংলা সাহিত্যে অভিন্নহৃদয় কবি-বন্ধু বলতে এই দুজনের নাম যে উচ্চারিত হয় একসঙ্গে মধ্যরাতের নিঃসঙ্গতা ফিরিয়ে দিচ্ছে অতীতের মায়াবি উষ্ণতাকে ঘোর ভেঙে গেলে শোক থেকে জন্ম নিচ্ছে শ্লোক- কবির শক্তি’! ‘শক্তির সঙ্গে একটি দিন’, ‘টিলার ওপর থেকে শক্তিকে ডানা মেলে উড়তে দেখেছি’, ‘শক্তির কবিতা’, ‘খেলাচ্ছলে দিনগুলি’ – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এই গদ্যগুলি পাওয়া যাবে আমার জীবনানন্দ আবিষ্কার ও অন্যান্য বই- পাঠক এই লেখাগুলি থেকে পেতে পারেন এক অফুরান প্রাণের শক্তিকে

পূর্ণেন্দু পত্রীর ‘আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা’ কবিতায় সমবেত যাপনের সূত্রে এসেছে শক্তির কথা- ‘হিমালয় থেকে গড়াতে গড়াতে/ প্রকান্ড বোল্ডারের মতো জেগে উঠল শক্তি।’ এই কবিতাগুলি পড়া মানে এক অভিজ্ঞতা। তারাপদ রায়ের ‘আই শক্তি চ্যাটার্জী’ কবিতার শেষ স্তবক উদ্ধৃত করছি--

জোর বাতাস আসছে শালবনের দিক থেকে,

মোমবাতিটা দপদপ করছে।

বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে, রাত বাড়ছে।

আপনি দেখলেন?

আপনি ওদিকে কোথাও দেখলেন?

কেউ বলছে,

          শক্তি, আমি শক্তি, আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়

            আই শক্তি চ্যাটার্জী স্পিকিং।’

আমরা আমাদের আলোচনায় কবিদের চোখে কবি শক্তিকে প্রত্যক্ষ করলাম। এই লেখা ও দেখা চলছেই। কবির জন্মের শেষ নেই। ‘খোলা বুকে স্বেচ্ছাচারী ভাষা’ গদ্যে পিনাকী ঠাকুর শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে বলতে গিয়ে খুব সঙ্গতভাবেই তাই  বলেন-- “যিশুর মতো কবিরও হয় রেজারেকশন। নতুন যুগে কবি- পাঠকের চেতনায় জাগ্রত হয়ে ওঠেন কবি। বারবার।”