Wednesday, 22 November 2017
কোচবিহারের দুর্গাপূজা: নতুন তথ্য নতুন আলো
Tuesday, 15 August 2017
ঝমঝম : আখ্যানের আলেখ্যে অনুভবের সত্য
গল্পেরা নিছক গল্প নয়, এ কথা আমাদের জানা। কাহিনির মোড়কে আমাদের সমাজ-ইতিহাস- ইচ্ছে-স্বপ্ন পুরাণ কীভাবে সত্য হয়ে থাকে, সে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং হবে। কিন্তু আমরা যখন কিছু পড়ি তখন বোধহয় পড়ার আনন্দে পড়ি এবং পথ চলতে চলতে বুঝতে পারি এ বই পড়ার আগের আমি এবং পরের আমি-র মধ্যে কিছুটা ফারাক হয়ে গেছে। শাশ্বত কর-এর ‘ঝমঝম’ উপন্যাসটি শুরুর আগে চোখ আটকে যাবে লেখকের ‘গপ্প শুরুর আগে’ অংশে। তিনি বলছেন- “আমি লক্ষ করে দেখেছি জানো, তোমার মনের সুতোয় যেখানে যেখানে টান পড়ে, আমারও তাই। এই যে ধরো তুমি ড্রাগন ভালোবাসো, মনস্টার ভালোবাসো, কল্পবিজ্ঞান ভালোবাসো, টেলিপ্যাথি, টেলিকিনেসিস, টেলিপোর্ট ভালোবাসো, বিশ্বাস করো আমিও তাই। সে জন্যেই তো এই বইটা লিখে ফেলা।’’ লেখা আসলে কথা বলা। এই বই-তে পাঠক সব সময় অফুরন্ত উদ্দীপনার খোঁজ পাবেন। বাচনের মধ্যেই তা নিহিত রয়েছে। আখ্যানকার পাঠকের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেন প্রস্তাবনা অংশেই- “এই বইতে কী আছে জানো? মজা আছে, অদ্ভুত আছে, সময়ের অন্য পারের হোমড়া-চোমড়া শক্তিশালী দুষ্টুলোক আছে, আর সরল মনের নিরাল গ্রাম আছে, গ্রামের সহজ মানুষেরা আছেন, তোমার মতো ছোট্ট ছেলে আছে, সিনেমা, শুটিং, ভালোবাসা, একসঙ্গে থাকা, শ্রদ্ধা—সর্বোপরি টাইম ট্রাভেল আছে।... সেই তো অন্যতম মূল বিষয়।’’ যে সারল্যের স্বর্গ থেকে আমরা নির্বাসিত হয়েছি, সেখানে ফিরিয়ে নিতে চান লেখক। শুধুমাত্র ছোটদের কথা ভেবে এ উপন্যাস লেখা হয়েছে এমন নয়, সবাই পড়তে পারেন। মনের ঘরে আমাদের প্রত্যেকরই যে অফুরন্ত শৈশব! এবার কাহিনির পরত খোলার পালা…
রসায়নের কৃতি ছাত্র পুলকেশ আইচ অধ্যাপনা কিংবা গবেষণার জগতে না গিয়ে ‘চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন ফিল্ম করাটাকে’। মাথায় এ ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন পুলকেশের গ্রামের ইস্কুলের কেমিস্ট্রির স্যার প্রফুল্ল নিয়োগী। তিনি বলতেন- “ম্যাজিক আর কী! ম্যাজিক মানে প্রকৃতি আর রং মানে কেমিস্ট্রি।’’ (পৃ: ৩৬) ছায়াছবির লোকেশন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে একটি গ্রাম। তার নাম গাংবেহালি। সাড়ে নয় বছরের ছোট্ট বাবিন এই সিনেমায় অভিনয় করবে। বাবিনের মা, বাবা নেই হয়ে গেছেন। কাকামের কাছেই মানুষ। কাকামকে ছেড়ে পুলকেশ আঙ্কেলের সঙ্গে যেতে মন খারাপ লাগছিল কিন্তু হাওড়া স্টেশনে বড় ঘড়ির নিচে গোটা ইউনিটের সঙ্গ পেয়ে বাবিনের মনখারাপ উধাও। যে গ্রামে তারা গেছে সেখানে একটা বড় জমিদার বাড়িতেই ফিল্মের মূল কাজ। সেখানে আছেন গাংবেহালির গিন্নিমা কৃষ্ণকামিনী দেবী। তাঁর স্বামী কুলদারঞ্জন ঘর ছেড়েছেন অনেকদিন। এদিকে পেটরোগা রতন রায়ের এক চড়েই মুচ্ছো গেল গগন পরামাণিক। চোখ মেলে দেখলো একমুখ তিনরঙা দাড়ির লোক। গোঁসাই নাকি! উপন্যাসে স্বপ্ন ও বাস্তব এমনভাবে মিশে থাকে যে আলাদা করা মুশকিল হয়ে পড়ে। এদিকে পুলকেশ নিজের ভেতর প্রফুল্ল স্যারের গলা শুনতে পায় যিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন। ‘রসায়নের রস’ শীর্ষক অংশ থেকে আখ্যানকারকে চিনে নেওয়া সম্ভব। বই-এর ব্লার্ব থেকে জানতে পারি, উপন্যাসের লেখক শাশ্বত কর বিজ্ঞানের শিক্ষক। প্রাণরসায়নে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পেয়েছেন জাতীয় বৃত্তি। বারো বছরের বেশি স্কুলে শিক্ষকতা জীবনে তিনি নিশ্চয়ই চিনতে পেরেছেন শৈশবের স্বপ্নকে। আবার সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তিনি গল্পের মধ্যে চারিয়ে দিয়েছেন মূল্যবোধের সহজপাঠ। শিল্পী মনের কথা লিখে ফেলেন অনায়াসে- “…কী-ই বা করব বলুন? পরিবারের আশা থাকে, সমাজের আশা থাকে, নিজের চাহিদা থাকে, কিছু একটা এমন করতেই হবে যাতে কিনা পাঁচজনে চেনে জানে। খানিক মানেও। সে করতে গিয়ে সব সময়গুলো চলে যায়। ধরা দেয় না!’’ (পৃ: ৪০) স্বপ্নের সঙ্গে বিজ্ঞানের আবিষ্কারের কথা উঠে আসে। ঋষি আর বিজ্ঞানীর চেতনায় কোনো ফারাক নেই কিংবা তন্ত্র সাধনাও যে উচ্চমার্গের রসায়ন- এই কথাগুলির মধ্য থেকে এক অন্য দর্শন উঠে আসে। এই অধ্যায়ের শেষেই আমরা দেখছি পুলকেশ গুগলে সার্চ করেন ‘অ্যালকেমি’ লিখে। আমাদের পাওলো কোয়েলহো-র বিখ্যাত উপন্যাসের কথা মনে পড়ে। লোহাকে সোনা করবার পদ্ধতি পাবার নেশায় এক আশ্চর্য ভ্রমণ, জীবনদর্শন! যাহোক জমিদার কুলদারঞ্জন ফিরে এসেছেন আটচল্লিশ বছর পর। তাঁর নাম এখন সংকটমোচন।
গ্রামের মানুষদের ঘোর বিপদ। কদম্বরা গ্রামের মানুষদের সুপ্রবৃত্তিগুলি ধ্বংস করতে চায়- “মানুষ যত অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে মাতবে, ততই এদের লাভ। যুদ্ধ বাধাবেও এরা, আবার যুদ্ধের জন্য অস্ত্রও বেচবে ওরা… রোগ ছড়াবে, আবার রোগের ওষুধও বেচবে—মুনাফা আর মুনাফা এ ছাড়া আর কিছু বোঝে না।’’ বুঝতেই পারছেন আখ্যানের অন্দরে কীভাবে ধরা আছে সমকাল। ভূত, মানুষ, স্বপ্ন, ছায়াছবি সব কিছু সুন্দরভাবে মিশিয়ে বার্তা দিতে চেয়েছেন লেখক। গগনের ঝমঝম সেলুন, আশীর্বাদী সিন্দুক, ছড়ার মর্ম উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়ে পরবর্তী অভিযাত্রার ছক চেনা হলেও ভালো লাগে আমাদের। সব সময় যে আখ্যান টানটান ধরে রেখেছে মনোযোগ এমন নয়, আরেকটু নির্মেদ হতেই পারতো কথামালা। তবে আখ্যানের শরীরে বিজ্ঞানকে এমনভাবে আত্মস্থ করেছেন লেখক, সাধুবাদ জানাতেই হয়। গভীর কিছু ভাবনা সুন্দরভাবে উঠে আসে এ লেখায়- “…এক অব্যক্ত ছন্দোবদ্ধতায় আমাদের এই পৃথিবী চলে। আমরাও জ্ঞাতে অজ্ঞাতে সেই ছন্দেই নেচে চলি। একটু ভালো করে যে দিকে খুশি চেয়ো, যে-কোনও বিষয়ে তলিয়ে দেখো, আপাত অলক্ষে থাকা এই ছন্দ তোমার চোখে পড়বেই। সময়ও এর থেকে আলাদা নয়।’’ সময়ের ইচ্ছের প্রসঙ্গ ধরেই টাইমমেশিনে চড়ে সময়ের অন্য পারে চলে যাই আমরা। চরিত্রের মুখে শিখি, বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে আটকে না থেকে প্রমাণের অনুসন্ধানই শ্রেয়। প্রমাণ দেখিয়ে মানুষের ভুল ভাঙানো বিজ্ঞানের কাজ। তেমনই “কিন্তু কিছু না করে, কিছু না বুঝে, কেবল বিশ্বাস করিনা বলাটা কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত একদম নয়, একথা মানো তো তুমি?’’ (পৃ: ১৪৪) এরকম কিছু প্রশ্নের উত্তরে নিজের দিকে মুখ ফেরাতেই হয়। আর তখনই আখ্যানের মোড়কে অনুভবের সত্য উঠে আসে। যে পাঠ আয়না হয়ে ওঠে উপলব্ধির, তাকে অকুন্ঠ অভিনন্দন জানাতেই হয়!
………..
শাশ্বত কর
পত্রভারতী
প্রথম প্রকাশ- ফেব্রুয়ারি ২০১৭
মূল্য- ১৫০ টাকা
Sunday, 23 July 2017
একান্নবর্তী : জয় গোস্বামী
“আমার আগের
সব কবিতার বই যেমন, এই বইও সেরকমই, আমার দিনলিপিই মাত্র। আমার মন কখন কোন অবস্থায়
আছে তারই বৃত্তান্ত—আমার সারাজীবনের কবিতার মতোই- এই বইতেও বলা রইল। এই বইকে একদিক
দিয়ে আমার পারিবারিক কাহিনীও বলা যায়। আমি যাদের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকি তারা শুধু
নয়- মাঠে ঝরে যাওয়া বৃষ্টি বা নদীতে বয়ে যাওয়া জলও আমার পরিবারেরই কেউ।’’-- জয়
গোস্বামী বলেছেন ‘একান্নবর্তী’ বই-এর সূচনায়। জয়ের কবিতায়, ব্যক্তিগত গদ্যে যে
ছোটবেলার ছবি পাই, এই বই সেই ছবিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। জীবন থেকে উঠে আসা
চরিত্রেরা শিল্পের ভুবনে অন্য মাত্রা পেয়ে যায়। আমরা যে সময়ে বাস করছি, সে সময়
মানুষে-মানুষে, পরিবারে- পরিবারে ভাঙনের
জয়গান গাইছে। ‘একান্নবর্তী’ নামকরণের মধ্যে যে যৌথতার ছবি পাই, মনে হতে থাকে
পারিবারিক চালচিত্রের মধ্য দিয়ে এ এক প্রতিবাদ। কিংবা নতুন পথ। কবি পৃথিবী বদলাতে হয়তো
পারেন না, কিন্তু দেখার চোখকেই বদলে দেন। নব নব বেদনার মধ্য দিয়ে কবির স্বর পাঠকের
মনে সঙ্গোপনে থাকা মানুষদের জীবন্ত করে তোলে। ব্যক্তিগত জীবনের সূত্র ধরেই এবার
তবে কবিতার কাছে আসি।
আকাশে তাকাতে ভয় হয়—
যদি ভেঙে পড়ে?
ভয় করে মাটিতে দাঁড়াতে,
ফেটে যায় যদি?
তাই শূন্যে উঠে ভাসি
আমার পায়ের নীচে মাটি নেই আটান্ন বছরে
কাবেরী বুকুনকে নিয়ে তাই আমি উঠে যাই আজ
এক ভাড়াবাড়ি ছেড়ে অন্য এক ভাড়া করা ঘরে... (ভাড়ার বাসিন্দা)
আমরাও ভাড়া
বাড়িতে থাকতাম। আমার বাবাও আটান্ন বছর বয়সেও বাড়ি করতে পারেননি। বাড়িওয়ালা ঘর ছেড়ে
দিতে বললে কোনোদিন রাগ করে, শুয়ে শুয়ে মা বলত-- বুকের ওপর সিলিং নেমে আসছে। যে ঘর
মুছি তা আমার নয়, যে রান্নাঘর পরিষ্কার করি, তা আমার নয়। এই ঘরের আকাশ, মাটি,
বাতাস সব ভাড়ার! পৃথিবীতে এত মানুষের ঘর আছে, আমাদের কেন নেই- ঠাকুরকে অনেকবার
জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু উত্তর পাইনি। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাবার পথ খুব
মসৃণ ছিল না। দেওয়ালের গায়ের ক্যালেন্ডার নিলেও সেই দাগ থেকে যেত। ঘরে যাপন থেকে
যেতো স্পর্শ, মায়াসমেত। বিষণ্ণতার কবচকুণ্ডল দেওয়া যায় না কাউকে। আর যাব বললেই
যাওয়া যায় নাকি? ভাদ্র মাসে কুকুর বেড়ালকেও মানুষ তাড়ায় না, আমরা তবু চলে
গিয়েছিলাম। বাসিন্দার পরিচয় যখন ভাড়ার, অপর হয়ে ওঠে সে। আত্মপরিচয় নির্মাণের সে
অভিঘাত ভুলিনি, ভুলতে পারিনি। এই কবিতার মধ্য দিয়ে যেন আমার বাবার কথাগুলিকে উঠে
আসতে দেখি। আজ যে শরণার্থী, কাল সে বিশ্বনাগরিক-- ভাড়ার বাসিন্দারা কীভাবে
একান্নবর্তী হয়ে ওঠে? অস্তিত্বের সংগ্রামে প্রতিদিন নতুন নতুন সম্পর্কে জড়ায়? জানে
তারা নয় কেউ এই পরিবারের, তবু...ভালো কিছু রান্না হলে বাটি চলে যায় এক ঘর থেকে
অন্য ঘরে। সুখ দুঃখের ভাগে আরও কিছু জুটে যায়। নিয়তি বদলে চলে নতুন ঠিকানা!
হাওয়া হয়ে গিয়েছে জ্যাঠারা। চল্লিশ বছর আগে। আজ
বর্ষাকালে ভারী মেঘ ফিরে এলে বৃষ্টির কণায়
তারা উড়ে আসে। পুরনো বাড়ির মোটা গরাদের
ফাঁক দিয়ে ঢোকে। পুনরায় বাস করতে চায়।
নতুন বৃষ্টির ঝাপটা সবেগে এ-জানলা দিয়ে ঢুকে
ওই জানলা দিয়ে ফের তাদের বার করে নিয়ে যায়... (বসত)
চল্লিশ বছর
আগে জ্যাঠাদের চলে যাওয়ার বার্তা দিয়ে এই কবিতার শুরু। তারপর পুরো কবিতাই গড়ে
উঠেছে মেঘ, জলের কণা, হাওয়া দিয়ে। জলের ঝাপটা আসলে স্মৃতির। চেনা জানলায় মুখের আদল
ধরা পড়ে কি? কবিতার নাম ‘বসত’। আমার ভেতর বাস করে ক’জন আমি জানি না। শক্তির কবিতায়
মত আপন মনে থাকতে চেয়েই ভেসে ওঠে চেনা দুঃখ, চেনা সুখ, চেনা চেনা হাসিমুখেরা।
আমাদের বসতভিটের কথা মনে পড়ে। সেই যেবার জোর বন্যা এসেছিল, সেবারেও বড়ঘর জলে
ডোবেনি। ডোবেনি শিবঠাকুরের থান। বট গাছের নীচে ত্রিশূলের মাথায় যখন পাখি এসে বসতো,
আমি ভাবতাম কী ভাবতাম, ত্রিশূল আর অস্ত্র নয়, গাছের ডাল হয়ে গেছে। এই সেই বাড়ি
ঠাকুরদার পেনশন না পাওয়া অভাবের একচালা। ঠাকুরদার মৃত্যুর পর বাবার ঠোঙা বিক্রির
জীবন, কেরানির চাকরি জুটিয়ে চোদ্দ জনের গ্রাস আচ্ছাদন। এই সেই বাড়ি দোল,
দুর্গোৎসবের নয়, মঙ্গলচণ্ডী-সত্যনারায়ণের। অভাবের, তাড়নার, স্বপ্নের, যন্ত্রণার,
বেঁচে থাকার। ঘরের থেকে আকাশ দেখা ফুটিফাটা চাল যখন সিমেন্টের ছাদ হল, তখনও
পেয়ারাতলার সামনে পুরনো রান্নাঘর ছুঁয়ে রইল বসত ভিটের এক চিলতে স্মৃতি। লোহার
শিকের জং-এ লেগে থাকা সময় মাঝেমধ্যে ঝরে পড়ে। এমন সময় ভিজে যায় ক্রমশ ছোট হতে থাকা
উঠোন। মাটির বুকের থেকে গন্ধ আসে। সে গন্ধে মাটির মানুষেরা। হাওয়া হাওয়ায় যাপনের
ইতিহাস কথা বলে। বৃষ্টি হয়। হতেই থাকে।
(২)
এখন
দু’মাত্রা করে বেশি-কম রাখি। থাকুক না ছন্দে একটু ফাঁক।
আজকাল দেখতে পাই ওই ফাঁক দিয়ে
একটা গাছের ডাল বেরিয়ে এসেছে।...
বাবা, একটা নিড়ানি হাতে, রাজেনকে নিয়ে
কেবলই গাছের গোড়া খুঁচিয়ে যাচ্ছেন
ধুতি-শার্ট মাটি মাখামাখি...
এমন সকাল যাতে কখনও না ফুরোয় সেজন্য আমি
সকালের পথে
দুটো একটা ভুল ফেলে রাখি। (ভুল)
জয়ের লেখায়
বারেবারে তাঁর বাবার কথা আসে। ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ লেখায় রবীন্দ্রসৃষ্টির অনুষঙ্গে
বাবার স্মৃতি এসেছিল--- ‘আমাদের ছোটো ওই সংসারের মধ্যে বাবা ছিল একটা আনন্দের
উৎস।’ ‘আনন্দের উৎস’-তে মনোযোগ দিয়ে ফেলি। কেবলই মনে হয় কত সামান্য অপরূপ সকাল
এমনিভাবে আমরাও তো হারিয়ে ফেলেছি। আমার বাবা রোজ সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন,
আধশোয়া হয়ে ধরিয়ে নেন চারমিনার। আমি দেখি ধোঁয়া কেমন মশারির ভেতর ঘোঁট পাকায়।
জুড়িয়ে আসে লিকার চা, মা এসে দেখে যায় বাবা ঘুম ভাঙার কোন সিঁড়িতে... আয়নার সামনে
যখন মা এসে সিঁদুর ছোঁয়ায়, বাবা তড়াক করে উঠে পড়ে। সারা ঘর জুড়ে আলো থইথই। কীভাবে
ভুল ফেলে রাখা যায়? যেভাবে অফিসের ঘড়ির কাঁটার তাগাদায় মা প্রতিদিন ভুলে যায় পাতে
নুন দিতে, বাবা ভাত ভাঙতে ভাঙতে বলে খাবার পাতে নুন দিতে হয় জানো না, মা এক চিমটে
নুন দিতে দিতেই বলে- হলো তো এবার! বাবা পঞ্চদেবতাকে ভাত দিয়ে জলের বেড়ি কাটছে, আর
ঐ জলের গণ্ডি বাঁচিয়ে অন্ন নিয়ে যাচ্ছে পিঁপড়ের দল, অজানা এক অনিবার্য উদ্দেশ্যে।
এই কবিতায় আছে এরকম একটি লাইন—‘দেখি, যেখানে এসেছি তার/ চারিদিকে কেবলই সকালবেলা
ঘিরে আছে।’ আমাদের মাঝেমাঝে এরকম হয়, স্রোতের মধ্যে ভেসে যাচ্ছে কাল, আশ্চর্যময়ী
এক অনন্ত সকাল!
দিদি,
কাকিমা, কাকদাদু, আঁখিদিদিমা, গুজুপিসি, উমেশমামা- কবিতার নামগুলি থেকেই আঁচ করা
যাচ্ছে এই বইটি এক অন্য জীবনচরিত। কবির পৃথিবী আত্মস্থ করে নেয় পাখির বাসা, পাড়া-পড়শি,
রোদ বৃষ্টি থেকে বাড়ির গোপালকে। বাল্যকালের বাক্স থেকে ঝরতে থাকে শিউলি ফুল, বাবা
বিশ্বকর্মা যেন স্বয়ং তাঁর লাটাই থেকে সুতো ছাড়ছেন, উড়ে যাচ্ছে নীল ঘুড়ি আর ‘ঘুড়ির
পিছনে ছুটছে আকাশে কাশফুলের ঝাঁক’ (ঘুড়ি)। এই বই পাঠককে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে
বাধ্য করে। কত কত মানুষ এক জীবনে কাছে আসে, চলে যায়। শিল্প সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষদের,
পাখিদের, ঘুড়িদের-- স্মৃতিদের ফিরিয়ে দিতে সক্ষম। এই বই জয় গোস্বামীর কবিতাসমগ্রকে
বুঝতে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।
কিছু লেখা
ফুরোয় না। থেমে যেতে হয় কেবলমাত্র। শেষ করছি কবির ‘গোঁসাইবাগান’- এর এই কথাগুলি
উদ্ধৃত করে-- “যে জীবন চোখের সামনে দিয়ে প্রতিদিন চলে যাচ্ছে, কিন্তু তুচ্ছ হাজার
কাজের চাপে সেদিকে তাকাচ্ছি না, সেই জীবনকে, যত্ন করে কবিতার মধ্যে তুলে রাখছেন
কবি। বলছেন, যদি অবসর পাও খুলে দেখ, তোমারই দেখা অভিজ্ঞতা, দেখতে পাবে আমার কাছে।
তফাত এই যে, তুমি ভুলে গিয়েছিলে, আর আমি মনে রেখেছি।’’
.............................
একান্নবর্তী
জয় গোস্বামী
সিগনেট প্রেস
প্রচ্ছদ- সুব্রত চৌধুরী
প্রথম সংস্করণ- নভেম্বর ২০১২
