Wednesday, 22 November 2017
কোচবিহারের দুর্গাপূজা: নতুন তথ্য নতুন আলো
Tuesday, 15 August 2017
ঝমঝম : আখ্যানের আলেখ্যে অনুভবের সত্য
গল্পেরা নিছক গল্প নয়, এ কথা আমাদের জানা। কাহিনির মোড়কে আমাদের সমাজ-ইতিহাস- ইচ্ছে-স্বপ্ন পুরাণ কীভাবে সত্য হয়ে থাকে, সে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং হবে। কিন্তু আমরা যখন কিছু পড়ি তখন বোধহয় পড়ার আনন্দে পড়ি এবং পথ চলতে চলতে বুঝতে পারি এ বই পড়ার আগের আমি এবং পরের আমি-র মধ্যে কিছুটা ফারাক হয়ে গেছে। শাশ্বত কর-এর ‘ঝমঝম’ উপন্যাসটি শুরুর আগে চোখ আটকে যাবে লেখকের ‘গপ্প শুরুর আগে’ অংশে। তিনি বলছেন- “আমি লক্ষ করে দেখেছি জানো, তোমার মনের সুতোয় যেখানে যেখানে টান পড়ে, আমারও তাই। এই যে ধরো তুমি ড্রাগন ভালোবাসো, মনস্টার ভালোবাসো, কল্পবিজ্ঞান ভালোবাসো, টেলিপ্যাথি, টেলিকিনেসিস, টেলিপোর্ট ভালোবাসো, বিশ্বাস করো আমিও তাই। সে জন্যেই তো এই বইটা লিখে ফেলা।’’ লেখা আসলে কথা বলা। এই বই-তে পাঠক সব সময় অফুরন্ত উদ্দীপনার খোঁজ পাবেন। বাচনের মধ্যেই তা নিহিত রয়েছে। আখ্যানকার পাঠকের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেন প্রস্তাবনা অংশেই- “এই বইতে কী আছে জানো? মজা আছে, অদ্ভুত আছে, সময়ের অন্য পারের হোমড়া-চোমড়া শক্তিশালী দুষ্টুলোক আছে, আর সরল মনের নিরাল গ্রাম আছে, গ্রামের সহজ মানুষেরা আছেন, তোমার মতো ছোট্ট ছেলে আছে, সিনেমা, শুটিং, ভালোবাসা, একসঙ্গে থাকা, শ্রদ্ধা—সর্বোপরি টাইম ট্রাভেল আছে।... সেই তো অন্যতম মূল বিষয়।’’ যে সারল্যের স্বর্গ থেকে আমরা নির্বাসিত হয়েছি, সেখানে ফিরিয়ে নিতে চান লেখক। শুধুমাত্র ছোটদের কথা ভেবে এ উপন্যাস লেখা হয়েছে এমন নয়, সবাই পড়তে পারেন। মনের ঘরে আমাদের প্রত্যেকরই যে অফুরন্ত শৈশব! এবার কাহিনির পরত খোলার পালা…
রসায়নের কৃতি ছাত্র পুলকেশ আইচ অধ্যাপনা কিংবা গবেষণার জগতে না গিয়ে ‘চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন ফিল্ম করাটাকে’। মাথায় এ ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন পুলকেশের গ্রামের ইস্কুলের কেমিস্ট্রির স্যার প্রফুল্ল নিয়োগী। তিনি বলতেন- “ম্যাজিক আর কী! ম্যাজিক মানে প্রকৃতি আর রং মানে কেমিস্ট্রি।’’ (পৃ: ৩৬) ছায়াছবির লোকেশন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে একটি গ্রাম। তার নাম গাংবেহালি। সাড়ে নয় বছরের ছোট্ট বাবিন এই সিনেমায় অভিনয় করবে। বাবিনের মা, বাবা নেই হয়ে গেছেন। কাকামের কাছেই মানুষ। কাকামকে ছেড়ে পুলকেশ আঙ্কেলের সঙ্গে যেতে মন খারাপ লাগছিল কিন্তু হাওড়া স্টেশনে বড় ঘড়ির নিচে গোটা ইউনিটের সঙ্গ পেয়ে বাবিনের মনখারাপ উধাও। যে গ্রামে তারা গেছে সেখানে একটা বড় জমিদার বাড়িতেই ফিল্মের মূল কাজ। সেখানে আছেন গাংবেহালির গিন্নিমা কৃষ্ণকামিনী দেবী। তাঁর স্বামী কুলদারঞ্জন ঘর ছেড়েছেন অনেকদিন। এদিকে পেটরোগা রতন রায়ের এক চড়েই মুচ্ছো গেল গগন পরামাণিক। চোখ মেলে দেখলো একমুখ তিনরঙা দাড়ির লোক। গোঁসাই নাকি! উপন্যাসে স্বপ্ন ও বাস্তব এমনভাবে মিশে থাকে যে আলাদা করা মুশকিল হয়ে পড়ে। এদিকে পুলকেশ নিজের ভেতর প্রফুল্ল স্যারের গলা শুনতে পায় যিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন। ‘রসায়নের রস’ শীর্ষক অংশ থেকে আখ্যানকারকে চিনে নেওয়া সম্ভব। বই-এর ব্লার্ব থেকে জানতে পারি, উপন্যাসের লেখক শাশ্বত কর বিজ্ঞানের শিক্ষক। প্রাণরসায়নে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পেয়েছেন জাতীয় বৃত্তি। বারো বছরের বেশি স্কুলে শিক্ষকতা জীবনে তিনি নিশ্চয়ই চিনতে পেরেছেন শৈশবের স্বপ্নকে। আবার সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তিনি গল্পের মধ্যে চারিয়ে দিয়েছেন মূল্যবোধের সহজপাঠ। শিল্পী মনের কথা লিখে ফেলেন অনায়াসে- “…কী-ই বা করব বলুন? পরিবারের আশা থাকে, সমাজের আশা থাকে, নিজের চাহিদা থাকে, কিছু একটা এমন করতেই হবে যাতে কিনা পাঁচজনে চেনে জানে। খানিক মানেও। সে করতে গিয়ে সব সময়গুলো চলে যায়। ধরা দেয় না!’’ (পৃ: ৪০) স্বপ্নের সঙ্গে বিজ্ঞানের আবিষ্কারের কথা উঠে আসে। ঋষি আর বিজ্ঞানীর চেতনায় কোনো ফারাক নেই কিংবা তন্ত্র সাধনাও যে উচ্চমার্গের রসায়ন- এই কথাগুলির মধ্য থেকে এক অন্য দর্শন উঠে আসে। এই অধ্যায়ের শেষেই আমরা দেখছি পুলকেশ গুগলে সার্চ করেন ‘অ্যালকেমি’ লিখে। আমাদের পাওলো কোয়েলহো-র বিখ্যাত উপন্যাসের কথা মনে পড়ে। লোহাকে সোনা করবার পদ্ধতি পাবার নেশায় এক আশ্চর্য ভ্রমণ, জীবনদর্শন! যাহোক জমিদার কুলদারঞ্জন ফিরে এসেছেন আটচল্লিশ বছর পর। তাঁর নাম এখন সংকটমোচন।
গ্রামের মানুষদের ঘোর বিপদ। কদম্বরা গ্রামের মানুষদের সুপ্রবৃত্তিগুলি ধ্বংস করতে চায়- “মানুষ যত অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে মাতবে, ততই এদের লাভ। যুদ্ধ বাধাবেও এরা, আবার যুদ্ধের জন্য অস্ত্রও বেচবে ওরা… রোগ ছড়াবে, আবার রোগের ওষুধও বেচবে—মুনাফা আর মুনাফা এ ছাড়া আর কিছু বোঝে না।’’ বুঝতেই পারছেন আখ্যানের অন্দরে কীভাবে ধরা আছে সমকাল। ভূত, মানুষ, স্বপ্ন, ছায়াছবি সব কিছু সুন্দরভাবে মিশিয়ে বার্তা দিতে চেয়েছেন লেখক। গগনের ঝমঝম সেলুন, আশীর্বাদী সিন্দুক, ছড়ার মর্ম উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়ে পরবর্তী অভিযাত্রার ছক চেনা হলেও ভালো লাগে আমাদের। সব সময় যে আখ্যান টানটান ধরে রেখেছে মনোযোগ এমন নয়, আরেকটু নির্মেদ হতেই পারতো কথামালা। তবে আখ্যানের শরীরে বিজ্ঞানকে এমনভাবে আত্মস্থ করেছেন লেখক, সাধুবাদ জানাতেই হয়। গভীর কিছু ভাবনা সুন্দরভাবে উঠে আসে এ লেখায়- “…এক অব্যক্ত ছন্দোবদ্ধতায় আমাদের এই পৃথিবী চলে। আমরাও জ্ঞাতে অজ্ঞাতে সেই ছন্দেই নেচে চলি। একটু ভালো করে যে দিকে খুশি চেয়ো, যে-কোনও বিষয়ে তলিয়ে দেখো, আপাত অলক্ষে থাকা এই ছন্দ তোমার চোখে পড়বেই। সময়ও এর থেকে আলাদা নয়।’’ সময়ের ইচ্ছের প্রসঙ্গ ধরেই টাইমমেশিনে চড়ে সময়ের অন্য পারে চলে যাই আমরা। চরিত্রের মুখে শিখি, বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে আটকে না থেকে প্রমাণের অনুসন্ধানই শ্রেয়। প্রমাণ দেখিয়ে মানুষের ভুল ভাঙানো বিজ্ঞানের কাজ। তেমনই “কিন্তু কিছু না করে, কিছু না বুঝে, কেবল বিশ্বাস করিনা বলাটা কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত একদম নয়, একথা মানো তো তুমি?’’ (পৃ: ১৪৪) এরকম কিছু প্রশ্নের উত্তরে নিজের দিকে মুখ ফেরাতেই হয়। আর তখনই আখ্যানের মোড়কে অনুভবের সত্য উঠে আসে। যে পাঠ আয়না হয়ে ওঠে উপলব্ধির, তাকে অকুন্ঠ অভিনন্দন জানাতেই হয়!
………..
শাশ্বত কর
পত্রভারতী
প্রথম প্রকাশ- ফেব্রুয়ারি ২০১৭
মূল্য- ১৫০ টাকা
Sunday, 23 July 2017
একান্নবর্তী : জয় গোস্বামী
“আমার আগের
সব কবিতার বই যেমন, এই বইও সেরকমই, আমার দিনলিপিই মাত্র। আমার মন কখন কোন অবস্থায়
আছে তারই বৃত্তান্ত—আমার সারাজীবনের কবিতার মতোই- এই বইতেও বলা রইল। এই বইকে একদিক
দিয়ে আমার পারিবারিক কাহিনীও বলা যায়। আমি যাদের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকি তারা শুধু
নয়- মাঠে ঝরে যাওয়া বৃষ্টি বা নদীতে বয়ে যাওয়া জলও আমার পরিবারেরই কেউ।’’-- জয়
গোস্বামী বলেছেন ‘একান্নবর্তী’ বই-এর সূচনায়। জয়ের কবিতায়, ব্যক্তিগত গদ্যে যে
ছোটবেলার ছবি পাই, এই বই সেই ছবিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। জীবন থেকে উঠে আসা
চরিত্রেরা শিল্পের ভুবনে অন্য মাত্রা পেয়ে যায়। আমরা যে সময়ে বাস করছি, সে সময়
মানুষে-মানুষে, পরিবারে- পরিবারে ভাঙনের
জয়গান গাইছে। ‘একান্নবর্তী’ নামকরণের মধ্যে যে যৌথতার ছবি পাই, মনে হতে থাকে
পারিবারিক চালচিত্রের মধ্য দিয়ে এ এক প্রতিবাদ। কিংবা নতুন পথ। কবি পৃথিবী বদলাতে হয়তো
পারেন না, কিন্তু দেখার চোখকেই বদলে দেন। নব নব বেদনার মধ্য দিয়ে কবির স্বর পাঠকের
মনে সঙ্গোপনে থাকা মানুষদের জীবন্ত করে তোলে। ব্যক্তিগত জীবনের সূত্র ধরেই এবার
তবে কবিতার কাছে আসি।
আকাশে তাকাতে ভয় হয়—
যদি ভেঙে পড়ে?
ভয় করে মাটিতে দাঁড়াতে,
ফেটে যায় যদি?
তাই শূন্যে উঠে ভাসি
আমার পায়ের নীচে মাটি নেই আটান্ন বছরে
কাবেরী বুকুনকে নিয়ে তাই আমি উঠে যাই আজ
এক ভাড়াবাড়ি ছেড়ে অন্য এক ভাড়া করা ঘরে... (ভাড়ার বাসিন্দা)
আমরাও ভাড়া
বাড়িতে থাকতাম। আমার বাবাও আটান্ন বছর বয়সেও বাড়ি করতে পারেননি। বাড়িওয়ালা ঘর ছেড়ে
দিতে বললে কোনোদিন রাগ করে, শুয়ে শুয়ে মা বলত-- বুকের ওপর সিলিং নেমে আসছে। যে ঘর
মুছি তা আমার নয়, যে রান্নাঘর পরিষ্কার করি, তা আমার নয়। এই ঘরের আকাশ, মাটি,
বাতাস সব ভাড়ার! পৃথিবীতে এত মানুষের ঘর আছে, আমাদের কেন নেই- ঠাকুরকে অনেকবার
জিজ্ঞেস করেছিলাম। কিন্তু উত্তর পাইনি। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাবার পথ খুব
মসৃণ ছিল না। দেওয়ালের গায়ের ক্যালেন্ডার নিলেও সেই দাগ থেকে যেত। ঘরে যাপন থেকে
যেতো স্পর্শ, মায়াসমেত। বিষণ্ণতার কবচকুণ্ডল দেওয়া যায় না কাউকে। আর যাব বললেই
যাওয়া যায় নাকি? ভাদ্র মাসে কুকুর বেড়ালকেও মানুষ তাড়ায় না, আমরা তবু চলে
গিয়েছিলাম। বাসিন্দার পরিচয় যখন ভাড়ার, অপর হয়ে ওঠে সে। আত্মপরিচয় নির্মাণের সে
অভিঘাত ভুলিনি, ভুলতে পারিনি। এই কবিতার মধ্য দিয়ে যেন আমার বাবার কথাগুলিকে উঠে
আসতে দেখি। আজ যে শরণার্থী, কাল সে বিশ্বনাগরিক-- ভাড়ার বাসিন্দারা কীভাবে
একান্নবর্তী হয়ে ওঠে? অস্তিত্বের সংগ্রামে প্রতিদিন নতুন নতুন সম্পর্কে জড়ায়? জানে
তারা নয় কেউ এই পরিবারের, তবু...ভালো কিছু রান্না হলে বাটি চলে যায় এক ঘর থেকে
অন্য ঘরে। সুখ দুঃখের ভাগে আরও কিছু জুটে যায়। নিয়তি বদলে চলে নতুন ঠিকানা!
হাওয়া হয়ে গিয়েছে জ্যাঠারা। চল্লিশ বছর আগে। আজ
বর্ষাকালে ভারী মেঘ ফিরে এলে বৃষ্টির কণায়
তারা উড়ে আসে। পুরনো বাড়ির মোটা গরাদের
ফাঁক দিয়ে ঢোকে। পুনরায় বাস করতে চায়।
নতুন বৃষ্টির ঝাপটা সবেগে এ-জানলা দিয়ে ঢুকে
ওই জানলা দিয়ে ফের তাদের বার করে নিয়ে যায়... (বসত)
চল্লিশ বছর
আগে জ্যাঠাদের চলে যাওয়ার বার্তা দিয়ে এই কবিতার শুরু। তারপর পুরো কবিতাই গড়ে
উঠেছে মেঘ, জলের কণা, হাওয়া দিয়ে। জলের ঝাপটা আসলে স্মৃতির। চেনা জানলায় মুখের আদল
ধরা পড়ে কি? কবিতার নাম ‘বসত’। আমার ভেতর বাস করে ক’জন আমি জানি না। শক্তির কবিতায়
মত আপন মনে থাকতে চেয়েই ভেসে ওঠে চেনা দুঃখ, চেনা সুখ, চেনা চেনা হাসিমুখেরা।
আমাদের বসতভিটের কথা মনে পড়ে। সেই যেবার জোর বন্যা এসেছিল, সেবারেও বড়ঘর জলে
ডোবেনি। ডোবেনি শিবঠাকুরের থান। বট গাছের নীচে ত্রিশূলের মাথায় যখন পাখি এসে বসতো,
আমি ভাবতাম কী ভাবতাম, ত্রিশূল আর অস্ত্র নয়, গাছের ডাল হয়ে গেছে। এই সেই বাড়ি
ঠাকুরদার পেনশন না পাওয়া অভাবের একচালা। ঠাকুরদার মৃত্যুর পর বাবার ঠোঙা বিক্রির
জীবন, কেরানির চাকরি জুটিয়ে চোদ্দ জনের গ্রাস আচ্ছাদন। এই সেই বাড়ি দোল,
দুর্গোৎসবের নয়, মঙ্গলচণ্ডী-সত্যনারায়ণের। অভাবের, তাড়নার, স্বপ্নের, যন্ত্রণার,
বেঁচে থাকার। ঘরের থেকে আকাশ দেখা ফুটিফাটা চাল যখন সিমেন্টের ছাদ হল, তখনও
পেয়ারাতলার সামনে পুরনো রান্নাঘর ছুঁয়ে রইল বসত ভিটের এক চিলতে স্মৃতি। লোহার
শিকের জং-এ লেগে থাকা সময় মাঝেমধ্যে ঝরে পড়ে। এমন সময় ভিজে যায় ক্রমশ ছোট হতে থাকা
উঠোন। মাটির বুকের থেকে গন্ধ আসে। সে গন্ধে মাটির মানুষেরা। হাওয়া হাওয়ায় যাপনের
ইতিহাস কথা বলে। বৃষ্টি হয়। হতেই থাকে।
(২)
এখন
দু’মাত্রা করে বেশি-কম রাখি। থাকুক না ছন্দে একটু ফাঁক।
আজকাল দেখতে পাই ওই ফাঁক দিয়ে
একটা গাছের ডাল বেরিয়ে এসেছে।...
বাবা, একটা নিড়ানি হাতে, রাজেনকে নিয়ে
কেবলই গাছের গোড়া খুঁচিয়ে যাচ্ছেন
ধুতি-শার্ট মাটি মাখামাখি...
এমন সকাল যাতে কখনও না ফুরোয় সেজন্য আমি
সকালের পথে
দুটো একটা ভুল ফেলে রাখি। (ভুল)
জয়ের লেখায়
বারেবারে তাঁর বাবার কথা আসে। ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ লেখায় রবীন্দ্রসৃষ্টির অনুষঙ্গে
বাবার স্মৃতি এসেছিল--- ‘আমাদের ছোটো ওই সংসারের মধ্যে বাবা ছিল একটা আনন্দের
উৎস।’ ‘আনন্দের উৎস’-তে মনোযোগ দিয়ে ফেলি। কেবলই মনে হয় কত সামান্য অপরূপ সকাল
এমনিভাবে আমরাও তো হারিয়ে ফেলেছি। আমার বাবা রোজ সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন,
আধশোয়া হয়ে ধরিয়ে নেন চারমিনার। আমি দেখি ধোঁয়া কেমন মশারির ভেতর ঘোঁট পাকায়।
জুড়িয়ে আসে লিকার চা, মা এসে দেখে যায় বাবা ঘুম ভাঙার কোন সিঁড়িতে... আয়নার সামনে
যখন মা এসে সিঁদুর ছোঁয়ায়, বাবা তড়াক করে উঠে পড়ে। সারা ঘর জুড়ে আলো থইথই। কীভাবে
ভুল ফেলে রাখা যায়? যেভাবে অফিসের ঘড়ির কাঁটার তাগাদায় মা প্রতিদিন ভুলে যায় পাতে
নুন দিতে, বাবা ভাত ভাঙতে ভাঙতে বলে খাবার পাতে নুন দিতে হয় জানো না, মা এক চিমটে
নুন দিতে দিতেই বলে- হলো তো এবার! বাবা পঞ্চদেবতাকে ভাত দিয়ে জলের বেড়ি কাটছে, আর
ঐ জলের গণ্ডি বাঁচিয়ে অন্ন নিয়ে যাচ্ছে পিঁপড়ের দল, অজানা এক অনিবার্য উদ্দেশ্যে।
এই কবিতায় আছে এরকম একটি লাইন—‘দেখি, যেখানে এসেছি তার/ চারিদিকে কেবলই সকালবেলা
ঘিরে আছে।’ আমাদের মাঝেমাঝে এরকম হয়, স্রোতের মধ্যে ভেসে যাচ্ছে কাল, আশ্চর্যময়ী
এক অনন্ত সকাল!
দিদি,
কাকিমা, কাকদাদু, আঁখিদিদিমা, গুজুপিসি, উমেশমামা- কবিতার নামগুলি থেকেই আঁচ করা
যাচ্ছে এই বইটি এক অন্য জীবনচরিত। কবির পৃথিবী আত্মস্থ করে নেয় পাখির বাসা, পাড়া-পড়শি,
রোদ বৃষ্টি থেকে বাড়ির গোপালকে। বাল্যকালের বাক্স থেকে ঝরতে থাকে শিউলি ফুল, বাবা
বিশ্বকর্মা যেন স্বয়ং তাঁর লাটাই থেকে সুতো ছাড়ছেন, উড়ে যাচ্ছে নীল ঘুড়ি আর ‘ঘুড়ির
পিছনে ছুটছে আকাশে কাশফুলের ঝাঁক’ (ঘুড়ি)। এই বই পাঠককে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে
বাধ্য করে। কত কত মানুষ এক জীবনে কাছে আসে, চলে যায়। শিল্প সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষদের,
পাখিদের, ঘুড়িদের-- স্মৃতিদের ফিরিয়ে দিতে সক্ষম। এই বই জয় গোস্বামীর কবিতাসমগ্রকে
বুঝতে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।
কিছু লেখা
ফুরোয় না। থেমে যেতে হয় কেবলমাত্র। শেষ করছি কবির ‘গোঁসাইবাগান’- এর এই কথাগুলি
উদ্ধৃত করে-- “যে জীবন চোখের সামনে দিয়ে প্রতিদিন চলে যাচ্ছে, কিন্তু তুচ্ছ হাজার
কাজের চাপে সেদিকে তাকাচ্ছি না, সেই জীবনকে, যত্ন করে কবিতার মধ্যে তুলে রাখছেন
কবি। বলছেন, যদি অবসর পাও খুলে দেখ, তোমারই দেখা অভিজ্ঞতা, দেখতে পাবে আমার কাছে।
তফাত এই যে, তুমি ভুলে গিয়েছিলে, আর আমি মনে রেখেছি।’’
.............................
একান্নবর্তী
জয় গোস্বামী
সিগনেট প্রেস
প্রচ্ছদ- সুব্রত চৌধুরী
প্রথম সংস্করণ- নভেম্বর ২০১২
Saturday, 22 July 2017
নিজের রবীন্দ্রনাথ : জয় গোস্বামী
রৌদ্র নিয়ে বৃষ্টি নিয়ে, প্রতি বছর
সবার চোখ আড়াল
দিয়ে, প্রতি বছর
কে জন্মায়, হে
বৈশাখ,
কে জন্মায়?
কবি জয় গোস্বামীর লেখা ‘নিজের
রবীন্দ্রনাথ’ বই নিয়েই আমাদের এবারের সহজপাঠ। আলোচ্য বইটি দুটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে রয়েছে
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা পাঁচটি কবিতা। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে দুটি গদ্য। ভূমিকায়
লেখক জানিয়েছেন-- “আমার নিজের কাছে কীভাবে এলেন রবীন্দ্রনাথ, আমার বালকবয়সে—কীভাবে
একটা সম্পর্ক হল তাঁর সঙ্গে—তারপর কৈশোর তারুণ্য পার হয়ে মধ্যজীবনে পৌঁছোতে কেমন
দাঁড়াল সেই সম্পর্কের চেহারা—এখনও নিজের কবিতা লিখতে গেলে কীভাবে উদ্দীপনা পাই
রবীন্দ্রনাথের গান নাটক ছবি থেকে—এসবেরই কিছু কিছু স্মৃতি বিবরণ নিয়ে এই বই।’’ এই
বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথের নবীন সাধক রাহুল মিত্রকে।’
‘কে
জন্মায়, হে বৈশাখ’ কবিতা পাওয়া যাবে এই বই-এর শুরুতেই। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো এই
কবিতাটি পাওয়া যায় ‘ পাগলী, তোমার সঙ্গে’ কাব্যগ্রন্থে। এই বই-এর আরেকটি কবিতা
গৃহীত হয়েছে- ‘ঋণ’। ‘পাতার পোশাক’ কাব্যগ্রন্থের ‘শ্রাবণ মেঘের আধেক দুয়ার’, ‘আলো’
কবিতার সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে ‘তোমার সুরের ধারা’ কবিতাটি। এছাড়াও জয়ের আরো অনেক
কবিতাই আছে যেখানে রবীন্দ্রনাথ আছেন ভীষণভাবে, সেই কবিতাগুলি এই বই-এ স্থান পেতে
পারতো কিনা এই কথায় না গিয়ে আমরা বরং একটি কবিতার অংশবিশেষ পড়ি--
যে মেঘ তোমার কাছে সূর্যাস্ত চেয়েছে
সত্যি তুমি জানো তার মন? ’’
...
তোমার কী মেঘ দেখেও মনে পড়ল না
আজ ছিল বাইশে শ্রাবণ ?
‘শ্রাবণ মেঘের আধেক দুয়ার’ কবিতায় এক বিকেলে দুঃখ আসার কথা
বলছেন কবি। আর ‘পাগল যে তুই’ নামে অসামান্য গদ্যে লিখছেন-- “ রবীন্দ্রনাথের কাছে
যেতে হলে কষ্টের ভেতর দিয়ে যাওয়া ছাড়া পথ নেই।” অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির ওপর কবির
নিরুপায় নির্ভরতার কথা জয় ব্যক্ত করেছিলেন ‘ নিজের জীবন, বীজের জীবন’ গদ্যে।
অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়েই জয়ের নিজের রবীন্দ্রনাথ। স্মৃতির পিঠে এসে যায় বাবা, মা,
পারিবারিক জীবন। অভাবের সংসারে ‘আনন্দে কষ্টে’ মিশে থাকা ‘পরিবারের একজন’ যেন
রবীন্দ্রনাথ! ‘ নিজের রবীন্দ্রনাথ’ গদ্যে অকালপ্রয়াত বাবার কথা আসে, সোনার তরী
কবিতাটি পাঠকের কাছে নিয়ে আসে এক অনন্য অর্থ- “ প্রায় কালো হয়ে আসা আকাশের নীচে,
গাছপালা যখন সারা দিনের বৃষ্টিতে ভেজা, তখন সেই কবিতার শেষ লাইনগুলো শুনতে শুনতে
আমার মনে হয়েছিল, এই কবিতাটি আমার বাবার মৃত্যু নিয়েই লেখা। শ্রাবণ গগন ঘিরে / ঘন
মেঘ ঘুরে ফিরে/ শূন্য নদীর তীরে / রহিনু পড়ি/ যাহা ছিল নিয়ে গেল/ সোনার তরী! ’’
আমাদের প্রত্যেক পাঠকের স্মৃতির সিন্দুকে লাগে টান। সন্ধেবেলা, মফস্সল,
গলিরাস্তায় ভেসে আসে কিশোরীর গান। ভাঙা হারমোনিয়ামকে ছাপিয়ে সেই সব অপরাজিত সুর।
এই যে মনে থেকে যাওয়া কোনো মানুষ দেখা-না দেখায় মেশা, তার মূলে যে রবীন্দ্রনাথ- “
...আমার মতো শুকনো মানুষের মধ্যেও যে ভালোবাসা একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি—সে
রবীন্দ্রনাথের জন্যই। তাঁর গান আমাকে স্পর্শ করা মাত্রই তা বুঝতে পারি আজও।’’
আত্মমগ্ন উচ্চারণে নিতান্ত ব্যক্তিগত কথা বলতে বলতেই কবির
গদ্যে নতুন আলো এসে পড়ে। রবীন্দ্রনাথকে দেখার, পড়ার প্রচলিত পথের বাইরে জয়ের
চলাচল। শঙ্খ ঘোষের ‘ এ আমির আবরণ’ এবং ‘
নির্মাণ আর সৃষ্টি’ বইদুটি ধর্ম গ্রন্থের মর্যাদা নিয়ে উচ্চারিত হয় তাঁর গদ্যে। আর
কবিজীবনে বুদ্ধদেব বসুর প্রভাবের কথা জয় বহুবার বলেছেন। রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করতে গিয়ে এঁদের
সশ্রদ্ধ উল্লেখ জয়ের ভাবনা বুঝতে সাহায্য করতে পারে। ‘পাগল যে তুই’ লেখায় জয়
লিখছেন- “ গানে কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বারবার পাগলকে ডাকেন। ... সে-পাগল গান গায়।
সে-পাগল ভালবাসে। সে পাগল শিল্পী। ... সেই পাগলের রবীন্দ্রনাথ আছেন। রবীন্দ্রনাথ
তাকে বলেছেন- তুই যে পাগল সেটাই তুই জানিয়ে দিবি। ব্যস্।
আজ ও কেউ কেউ পাগল থাকতে সাহস পায়, সে রবীন্দ্রনাথের জন্য।”
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা দু’ একটি কবিতার কাছে ফিরে আসি আবার সৃজনছন্দে। ‘আলো’
কবিতার ‘ তিন’ সংখ্যক কবিতার প্রথমেই লেখা হয়েছে রক্তকরবীর কিশোরের উক্তি-- “ ওদের
মারের মুখের উপর দিয়ে রোজ তোমাকে ফুল এনে দেব।’’ এরপর কবিতার শেষ স্তবক উদ্ধৃত
করছি- “ সামলে চলো সামলে চলো/ বার্তা দিচ্ছে প্রহরীজন/ সামলে চলার প্রশ্নই নেই/
প্রেমের কাছে শাসন তুচ্ছ/ এনে দিচ্ছি প্রহরীদের / মারের মুখের ওপর দিয়ে/ তোমাকে এই
ফুলের গুচ্ছ!’’ রবীন্দ্রনাটকের কোনো একটি চরিত্রের সংলাপ জন্ম দিল নতুন একটি
কবিতার। ‘আলো’-র বারো সংখ্যক কবিতায় প্রথমেই এসেছে নন্দিনী, বিশু পাগলের সংলাপ।
কবিতার শেষটুকু উল্লেখ করছি--“ সেই যে রত্নাকর ছিল, দস্যুতা জীবিকা ছিল তার।/ আমার
জীবিকা শব্দ। ‘প্রেম’ ছাড়া শব্দ আছে আর?/ সে-প্রেমে দু-চার পংক্তি-এর বেশি অন্যায়
করিনি।/ রঞ্জন তোমার, জানি, এ-লেখাও তোমারই, নন্দিনী!’ এরপর মুগ্ধতা গ্রাস করে
আমাদের। কবিতা এখানে কবিপ্রণাম।
শুভেচ্ছা, অপরাজিত আলো
ভোর এসে জানলায় দাঁড়াল
...
দেহ পেতে রেখেছে খোয়াই
ঘাটে ঘাটে আঙুল ছোঁয়াই
শরীর আনন্দে পুড়ে খাক্
কাল ভোরে পঁচিশে বৈশাখ
এই কবিতার প্রাণ আমাকে প্রচণ্ড টানে। প্রাণবন্ত হয় কবিজন্ম।
জয় ‘আপন আর অজানা’ নিয়ে নিজের রবীন্দ্রনাথের কথা লিখে চলেন কবিতায়, গদ্যে। তার
মধ্যে আমরা নিজেকে পেয়ে যাই। মনে হয় এ যে আমাদের মনের কথা। মনের মানুষ হয়ে থাকেন
প্রাণের ঠাকুর। শুধু একটি কথাই সবিনয়ে মনে করিয়ে দেবার, আমরা যেন মনে রাখি ‘নিজের
রবীন্দ্রনাথ’ বইটি লিখছেন কবি জয় গোস্বামী। আমাদের প্রত্যেকের অনুভবের রবীন্দ্রনাথ
আছেন এটা খুব সত্য, কিন্তু সে পাঠ প্রতিক্রিয়া নিজেই শিল্প হয়ে না সবসময়।
রবীন্দ্রনাথকে নিজের করে তোলবার যে মন, অনুশীলন তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি থাকুক
আমাদের। আর সেই শক্তি আমরা পাব রবীন্দ্রনাথ থেকেই। শেষ করছি জয় গোস্বামীর ‘পাগল যে
তুই’ গদ্যের অব্যর্থ উচ্চারণ দিয়ে-- “আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ চিরকালীন সেই গাছেরই
মতো। যতদিন সভ্যতা থাকবে- থাকবেন রবীন্দ্রনাথ।’’
.........
নিজের রবীন্দ্রনাথ
জয় গোস্বামী
প্রতিভাস
প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০০৮
মূল্য- ৫০
টাকা
Friday, 21 July 2017
সুখের মুহূর্তগুলি : তারেক কাজীর কবিতা
‘অদৃশ্যে নিজেকে রেখে যেন রেওয়াজে বসেছ।’- তারেক কাজীর
‘বিপন্ন মেঘের দল’ কাব্যগ্রন্থের ‘বসন্ত’
কবিতার এই উচ্চারণকে তাঁর কবিতা সম্বন্ধেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। ‘সুখের
মুহূর্তগুলি’ কবিতার বই-এর প্রথম কবিতা ‘শ্রাবণ’, শেষ হচ্ছে এই ভাবে- “আরও একটা
বরষা শুরু হল, মাঠে মাঠে লাঙল পড়ল... ধান ছাড়া রোয়া হল...কালসিটে মানুষগুলো বগলে
সন্তান আঁকড়ে দেখতে শুরু করল ডালভাতের স্বপ্ন... ’’ কালসিটে শব্দটির ব্যবহার নিয়ে
ভাবতে ভাবতেই মনে হতে থাকে যে, এই সামান্য ডালভাতের স্বপ্নই বুঝি অসামান্য।
চিরন্তন। বাংলা কবিতার ভূগোলে গ্রামজীবনের ছবি আরও বেশি করে উঠে আসা দরকার। যেমন
দরকার সংখ্যালঘু মানুষের দিনযাপনের সঙ্গে আন্তরিক পরিচয়। ‘আহাদ্’ কবিতায় কবি
বলছেন- ‘হাদিস বর্ণিত নির্মম দোজখ কিংবা খুশবুময় জান্নাত- দুটিই আমার কাছে পাহাড়
চূড়ায় ফুটে থাকা বসন্তের অচেনা ফুলের মতো।... জানতে ইচ্ছে করে কোন রহস্যে এখনও ওই
আট জান্নাত এবং সাতদোজখের মাঝে আমাদের ছেড়ে দিয়ে নির্বিকার তুমি... ’’ এই পৃথিবীর
দিনযাপনের আনন্দই জান্নাত, আর দারুণ যন্ত্রণারা দোজখের আযাবের মতো- এই ভাবনা তার
ভেতরে ভেতরে এক অন্য জীবনের খোঁজ করতে থাকে। “খোদার মর্জির খামখেয়ালি রূপের কথা
ভাতে ভাবতে এঁটো থালাবাটি জড়ো করি। ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করি লাবণ্যময়ী কার্পেট আর
দিল- কলবেতে লেগে থাকা দাগ... ’’ কবিতার নাম ‘দলছুট’। কবিও এক অর্থে তাই।
“কত রাত্রি পার হল, জমা কথা শেষ হয়ে এল। তোমাদের আজকাল আর
একত্রে দেখা যায় না। তোমাদের ভিতর এখন বাক্যালাপ তেমন কিছু হয় না। তোমরা দুজন
নিজেদের মতো একই চালার নীচে গড়ে নিয়েছ ভিন্ন ভিন্ন পৃথিবী।... অনিদ্রায় শীতের
পাহাড় রাত্রি কাবার হয়ে যায়। মনের ভিতর
আবার আশ্রয় নিতে চায় প্রাচীন, প্রাচীন খেলাধূলা। দেহ নড়েচড়ে সাড়া দিয়ে ওঠে।
নিজেকে সামলে নিতে নিতে দু-একটা উপদেশ দাও। ঘ্যাগ ঘ্যাগ করে কাশো- ছেলেবউ বিরক্ত
হয়... ’’ শেষের লাইনটি পড়ে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ঘ্যাগ ঘ্যাগ শব্দের
বিরক্তির মধ্যে এত মায়া ভর্তি হয়ে থাকে, পাঠক হিসেবে ভাবতে থাকি। জীবনের দিকে মুখ
ফেরাই। এক পুরুষের চোখ দিয়ে দাম্পত্য দেখা এবং দেখানোর অভিনবত্ব মন কেড়ে নেয়।
এতক্ষণ ধরে আমরা বিভিন্ন কবিতার থেকে যে অংশগুলি উদ্ধৃত করছি, তা থেকে কিছুটা হলেও
কাব্যভাষা নিয়ে ধারণা জন্মেছে। এই কাব্যগ্রন্থের সব কবিতাই গদ্যে। ছন্দ কি নেই এর
মধ্যে কোথাও? আছে। তবে প্রচলিত ছন্দকাঠামোয় তাকে ধরা মুশকিল। এই যেমন-- “ এখন
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় সম্মুখে নেই। এখন আঘাত সহ্য করা ছাড়া আর কিছু করণীয়
নেই।... তোমার অব্যক্ত মননের ওই ভাষা, রেশমী সুতোর গিঁট। একান্ত যাপন... সামান্য
হলেও আমি বুঝি। যেমন গাছেরা বোঝে গাছের ইশারা। পাখিরা পাখির...’’ ( হেমন্ত) কবির
কারও প্রতি উচ্চকিত অভিযোগ নেই। বেদনার ভারে স্মরণ করা কেবল মাত্র। কবি নিজের
সঙ্গে নিজেই কথা বলে চলেন। ভেতরের দিকে মুখ ফেরানো এই কবিতারা দহনের মধ্য দিয়ে
শুদ্ধ হয়ে ওঠার কথা বলে। আঘাত উপেক্ষা করে সকলের ভালো চায়। ব্যক্তিগত ঈশ্বরের
সঙ্গে সংলাপের মধ্য দিয়ে সান্ত্বনা দিতে থাকেন নিজেই নিজেকে-- “ একটু ধৈর্য ধরো,
ওই উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকাও, ওই দৃশ্যের কাছে তোমার হু- হুতাশ বড় বেশি বেমানান।
’’
শিল্প যদি বেঁচে থাকাকে আরেকটু সহনীয় করে তোলে, জীবনকে
সমস্ত অপ্রাপ্তির উর্দ্ধে নতুন ইতিবাচক এক অর্থ দান করে; তবে মানবজাতির ঋণ বেড়ে
যায় স্রষ্টার প্রতি। ‘স্বপ্ন’, ‘বিরহ’, ‘বার্ধক্য’, ‘পরামর্শ’, ‘দ্বন্দ্ব’, ‘স্বীকারোক্তি’,
‘জবাবদিহি’, ‘অনুতাপ’, ‘অবসাদ’,’সান্ত্বনা’, ‘অহিংসা’- কবিতার নামগুলিকে যদি
অনুধাবন করি, প্রতিটি কবিতাকে বিচ্ছিন্ন একক বলে মনে হয় না আর। মনে হয় আসলে একটি দীর্ঘ
কবিতাকেই কবি খন্ডে খন্ডে লিখছেন। আর সেই কবিতা ‘যাযাবর’- এর- “ আমার ঢাল নেই,
তরোয়ালও নেই, তবুও বারবার রণাঙ্গনে গেছি... ’’
‘সুখের মুহূর্তগুলি’ কাব্যগ্রন্থে পেয়ে যাই কিছু কিছু চরিত্রের হদিশ। যেমন ‘অনার
কিলিং’ কবিতার মাধবকাকা যিনি একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন। ছেলের নাম রাজু। ‘হাসিনা
প্রেমিক ছিল তার’। ফেরি পারাপার করতে থাকা যাত্রীদের দিকে চেয়ে থাকেন আর বিড়বিড় করেন।
ছেলের খুনিকে কোনোদিন চিহ্নিত করতে পারবেন কি? কবিতার নামটির মধ্যেই আখ্যানের খোঁজ
পাই আমরা। ‘বঙ্গবাসী’ কবিতায় পাই দুখুদাদুর কথা। যিনি এক কালে পালাগান গাইতেন। নিঃসন্তান
রেবানানী গত হওয়ার পর দুখু দাদুর জীবন পাল্টে গেছে। এর ওর কাছে হাত পেতে নিরাশ্রয় জীবন
অশত্থতলায়। গাছ ডালপালা নাড়ে। মশামাছি যেন না বসে- “যেন দুখুদাদু তাঁকে ছেড়ে কোনওদিন
কোথাও না চলে যায়।’’ কবির সুখ দুঃখের সাথী মানুষগুলোর কথা পড়তে পড়তে উৎপলকুমার বসুর
কবিতা মনে পড়ে। ‘অহিংসা’ কবিতার বুড়োর কোনো নাম নেই। যিনি বলতে পারেন- “ কবিতা পড়ি
না আমরা। আর তার কোনও প্রয়োজন নেই। … আমাদের
জীবনযাপনই তোমাদের এক একটা স্বয়ং সম্পূর্ণ কবিতা।’’ ভোর বেলা যার প্রথম লাইন শুরু।
কবিতাটি লেখা হতে থাকে জীবন যাপনের পরিচয় দিয়ে। দিন আনি দিন খাই এই মানুষ কাজ না জুটলে
ছিপ হাতে মাছের সন্ধান করেন। কবিতাটি বুড়োর জবানিতে এই ভাবে শেষ হচ্ছে- “যদি কিছু মিলে
যায় ভালো, তবে কোনোদিন দোষারোপ করিনি ঈশ্বরকে…’’ বুড়োর সংলাপে কবির স্বর চিনে নিতে
অসুবিধা হয় না আমাদের। পারস্পরিক বিদ্বেষ যখন আমাদের জীবনের অন্যতম অঙ্গ হয়ে উঠেছে,
তখন যেকোনো সঙ্কীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে উদার অনুভব, সহিষ্ণুতার শিক্ষা প্রাসঙ্গিক হয়ে
ওঠে। নিরাভরণ, শান্ত, নম্র, আত্মগত উচ্চারণে তারেক কাজী যে সুখের মুহূর্তগুলি লিখে
ফেলেন, তা আসলে কবিতার মুহূর্ত। দুঃখ যেখানে কাছের সম্বল। কান্না হাসির দোল দোলানো
জীবন আরেকবার কবিতার কাছে এসে জীবিত হয়- “ বলো বন্ধু বলো- সুখের মুহূর্তগুলি বলো- সেগুলি
তো আজও ক্ষণস্থায়ী বড়…’’
…………………
সুখের মুহূর্তগুলি
তারেক কাজী
প্রচ্ছদ- শোভন পাত্র
ছোঁয়া
প্রথম প্রকাশ- জানুয়ারি ২০১৭
মূল্য- একশো টাকা
